বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন করেছে বিশ্বব্যাংক। নিজেদের প্রকল্পের কারণে সাধারণ মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন প্রতিরোধে নতুন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তিত নীতিমালার অনুমোদন দেয়, যা নিয়ে রীতিমতো সমালোচনা হচ্ছে।
সমালোচকরা বলছেন, ঋণ নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে দরিদ্র দেশের নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এক কথায় প্রতারণা করেছে বিশ্বব্যাংক। খবর ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, এএফপি ও সিনহুয়া।
আশির দশকের দিকে ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে পরিচিত নীতিমালা গ্রহণ করে বিশ্বব্যাংক। এগুলো পরিবর্তন বা হালনাগাদে চার বছর ধরে আলোচনা করছে বিশ্বব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার দেশগুলো; যা সর্বসম্মতিক্রমে বৃহস্পতিবার অনুমোদন দেয় সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ। একে সংস্থাটির প্রধান জিম ইয়ং কিমের বড় ধরনের বিজয় বলা যায়।
তিনি এ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংককে আরো কর্মতত্পর ও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিল প্রক্রিয়ার একটি সহজ সমাধান করতে চাইছেন। উল্লেখ্য, চীনের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো নতুন প্রতিষ্ঠানের কারণে বিশ্বব্যাংকও প্রতিযোগিতার সামনে পড়ছে। এ অবস্থায় সংস্থাটি মনে করছে, তাদের নীতিমালাতেও এবার পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন।
এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম বলেন, সর্বপ্রথম আমরা যখন এই রক্ষাকবচ গ্রহণ করি, সে সময় থেকে বিশ্বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের নীতিমালাতেও এখন এর একটি প্রতিফলন প্রয়োজন। আর এ কারণেই নতুন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, বৈষম্য দূরীকরণ, সামাজিক সমন্বয়, জনগণের অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মতো বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এই প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে যেসব প্রকল্প পরিচালিত হবে সেখানকার শ্রম ও কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তনে কেমন ভূমিকা রাখবে, তা ঋণগ্রহীতাকে অবশ্যই হিসাব করে দেখতে হবে। পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। ২০১৮ সাল থেকে এই নতুন নীতিমালা কার্যকর হবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে, এ নীতিমালা এখন আগের তুলনায় অনেক নমনীয়। ফলে ঋণগ্রহীতা দেশের হাতে আগের তুলনায় বেশি ক্ষমতা থাকবে। প্রকল্পের মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে স্থানীয় পরিবেশ ও অন্য নীতিমালা আগের তুলনায় বেশি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, নীতিমালায় এসব পরিবর্তনের ফলে ঋণ অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন আটকে থাকবে।
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রধান নাদিয়া দার বলেন, পরিবর্তনের ফলে বেশির ভাগ ব্যাংক ঋণের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ নিয়ে খুব একটা সামনে এগোতে চাইবে না। ফলে পুরো বিষয়টিই আমার কাছে হতাশাজনক।
বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে অব্যাহতভাবে সমস্যায় পড়ে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। উদাহরণ হিসেবে উগান্ডায় গত বছরের একটি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যায়। বিশ্বব্যাংকের অনুমোদিত একটি প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারদের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে। মানবাধিকার কর্মীরা এসব অভিযোগের প্রমাণপত্র দাখিলের পর ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয় বিশ্বব্যাংক।
ব্যাংক ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক জেফ হল জানান, সবকিছুই যে ভালোর জন্য হচ্ছে, তা বোঝাতে পারছে না বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম বলেন, নতুন নীতিমালার সমালোচনা ব্যাংকের জন্যই মর্যাদাহানিকর। কয়েক বছর ধরে আলোচনার পরেই দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তার লক্ষ্যে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা স্কট মরিস বলেন, নীতিমালা পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাংক যেসব দেশে কাজ করছে, সেখানে প্রকল্পের পরিবর্তে স্থানীয় আইন উন্নয়নে জোর দেয়া হবে।


