দেশে শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে কমেনি বেকারত্বের সংকট। বরং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ছে ক্রমেই। চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতিমালার লক্ষ্যগত দূরত্ব। শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের লক্ষ্যের সমন্বয়ের দিক থেকে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এরও পরে। সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মানবসম্পদ-বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন। আর মানবসম্পদ গড়ে ওঠে শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার, এর গুণগত মান ও পরবর্তীতে শিক্ষিতদের চাকরির সুযোগের নিশ্চয়তার মাধ্যমে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে লক্ষ্যগত অভিন্নতা রয়েছে। ফলে সেসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চাকরির বাজারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। চাকরির বাজার ও শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ের দিক থেকে সারা বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ফিনল্যান্ড, জাপান, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও ডেনমার্ক। অথচ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০টি দেশেরও পরে। আর এটিই প্রচলিত কাঠামোয় শিক্ষিতদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টির পথে প্রধান অন্তরায়। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর বণিক বার্তাকে বলেন, শিক্ষিতদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বাধা তিনটি। এগুলো হলো— শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যগত অসঙ্গতি, মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি ও প্রবৃদ্ধির হার অনুযায়ী মানসম্মত কর্মসংস্থান গড়ে না ওঠা। এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বয় প্রয়োজন।
কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যগত অমিলের এ সমস্যা বাংলাদেশে প্রকট। যেমন চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু বিভাগে অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। আবার চাহিদা থাকলেও বিজ্ঞান, চিকিত্সা ও প্রকৌশলের মতো বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ানো হচ্ছে না আসন সংখ্যা।
বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সেক্টর: অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব স্কিলস ইন দ্য ফরমাল সেক্টর লেবার মার্কেট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ কলা ও মানবিকে রয়েছে। অথচ চাকরির বাজারে এসব বিষয়ের চাহিদা মাত্র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাত্ এ শাখায় প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। আবার চাকরির বাজারে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের চাহিদা রয়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী রয়েছে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর। চিকিত্সায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ চাহিদা থাকলেও এ খাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র দশমিক ২ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টির জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতিমালায় সমন্বয় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বলেন, চীন ও জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি ও কল-কারখানাকেন্দ্রিক শিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। আমাদেরও কারিগরি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালা গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতিমালায় লক্ষ্যগত অমিলের এ প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘দক্ষতা উন্নয়ন: উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শিল্প খাতে বিশেষজ্ঞ, দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকের অভাব রয়েছে। এজন্য নির্ভর করতে হয় বিদেশীদের ওপর। বর্তমানে দেশের শিল্প খাতের মধ্য ও উচ্চপর্যায়ে প্রায় দুই লাখ বিদেশী কর্মী নিয়োজিত। প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিদেশীদের বেতন-ভাতা বাবদ দিতে হচ্ছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী বেড়ে না ওঠায় বড় অঙ্কের এ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার প্রসারে গেল এক দশকে দেশে শিক্ষিতের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। তবে শিক্ষা ও কর্মবাজারের সমন্বয়হীনতায় শিক্ষিতদের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্ব। ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স সম্প্রতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ও আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার মান ও চাকরির বাজারে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অবস্থান বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে দেখানো হয়, শিক্ষিত বেকারের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। স্নাতক পাসের পর দেশের ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পান না।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিক্ষা কারিকুলাম যুগোপযোগী না করায় কর্মোপযোগী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফলাফলকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রেজেন্টেশন, কেস স্টাডিজ, বিশ্লেষণধর্মী অ্যাসাইনমেন্টকে উত্সাহিত করা হয় না। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম পাঁচ বছরেও রিভিউ করা হয় না। এছাড়া শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার অভাবেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। তাদের শিক্ষামূলক ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণেরও অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষার প্রসারের সুফল পেতে কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সঙ্গতি আনতে হবে।


