বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দুই হাজার দুইশ’ কোটি টাকার হদিস নেই। এসব টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হয়েছে কি-না তাও জানে না অধিদপ্তর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনের ৬২টি কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (এমআরপি) ও যন্ত্রে পাঠযোগ্য ভিসা (এমআরভি) ফি থেকে আদায় করা অর্থ নিয়েই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল অঙ্কের এ টাকা গেল কোথায়_ তা নিয়েই এখন প্রশ্ন। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, দূতাবাসগুলো ফি বাবদ আদায় করা অর্থ আলাদা ব্যাংক হিসাবে রাখেনি। পরিকল্পিতভাবেই দূতাবাসের অন্যান্য উৎসের আয়ের সঙ্গে মিশ্র হিসাবে এসব টাকা রেখে নয়ছয় করা হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, দূতাবাস ও মিশন থেকে ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত অন্তত ২৫ লাখ এমআরপি ও পাঁচ লাখ এমআরভি বিতরণ করা হয়। এতে অন্তত দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা ফি বাবদ আদায় হলেও এক টাকাও জমা হয়নি পাসপোর্ট অধিদপ্তরে। টাকার হিসাব চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কয়েক দফা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তার কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বিপুল অঙ্কের ওই টাকার হদিস মিলছে না। একই সঙ্গে ওই টাকার হিসাব না থাকায় অধিদপ্তর সরকারের কাছে তাদের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারছে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের এপ্রিলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে প্রথমবারের মতো ‘সেবা সপ্তাহ’ পালন করা হয়। ওই সময় অধিদপ্তরের গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়েই দূতাবাস থেকে ফি হিসেবে আদায় হওয়া রাজস্ব পাসপোর্ট অধিদপ্তরের হিসাবে জমা না হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। বাধ্য হয়ে তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আয়-ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব দেওয়া হয়েছিল। এর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিস্তারিত জানিয়ে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার হিসাব চাওয়া হয়। কয়েক দফায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হিসাব চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী পাসপোর্ট ছেপে তা দূতাবাসগুলোয় পাঠানো হয়। এর সব খরচ অধিদপ্তরের হিসাব থেকেই বহন করা হয়। তবে দূতাবাসগুলো থেকে সরবরাহ করা পাসপোর্টের বিপরীতে আদায় করা অর্থ অধিদপ্তরের হিসাবে জমা হয়নি। বিষয়টি জানতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
তবে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, ‘ওই ধরনের চিঠি আমার চোখে পড়েনি। চিঠি পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অধিদপ্তরে অর্থ জমা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের হিসাব শাখা তদারকি করে। তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে এসব রাজস্ব অবশ্যই সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘বিদেশে পাসপোর্ট ও ভিসা ফি বাবদ আদায় হওয়া রাজস্বের কয়েক কোটি টাকা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ব্যাংক হিসাবে আনার জন্য চেষ্টা চলছে। এ জন্য তথ্য-উপাত্তসহ অধিদপ্তরের কাগজপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিপুল অঙ্কের এ রাজস্বের হিসাব পেতে দুই মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।’
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও পরিদর্শন) এ কে সরকার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো থেকে এমআরপি ও এমআরভির ফি বাবদ আদায় হওয়া রাজস্বের পরিমাণ কত, তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানতে অনুরোধ করা হয়। পাশাপাশি এসব রাজস্ব সম্পূর্ণ পৃথক একটি ব্যাংক হিসাবে রাখার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্যও বলা হয়।
এর আগে মার্চ মাসে অপর এক চিঠিতে দূতাবাসগুলোতে পাসপোর্টের ফি বাবদ রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে কি-না তা যাচাই করতে অনুরোধ করা হয়। একই মাসে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আরও একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতেও বলা হয়, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রদান সংক্রান্ত রাজস্ব আদায়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কাছে নেই। এ বিষয়ে বারবার মিশনগুলোকে চিঠি দেওয়া হলেও তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা খাতে সরকারের অর্জিত রাজস্ব আয়ের সঠিক তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো যাচ্ছে না।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বেশিরভাগ মিশন ও দূতাবাসে এমআরপির সাধারণ ফি ১০০ ডলার এবং জরুরি ফি ২০০ ডলার। তবে বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান, মরিশাস, লিবিয়া, সাইপ্রাস, ইরান, ইরাক, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ফি ৩০ ডলার এবং জরুরি ফি ১০০ ডলার। ২০১০ সালে এমআরপি বিতরণ শুরুর পর থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২৫ লাখ ২ হাজার ২৫৪টি এমআরপি বিতরণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এমআরপি বিতরণ শুরুর পর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশ মিশন থেকে দুই লাখ ৮৮ হাজার ৭০৭টি, দুবাইয়ে কনস্যুলেট জেনারেল অফিস থেকে চার লাখ ২৩ হাজার ৭৭৬টি, অস্ট্রেলিয়া মিশন থেকে ১০ হাজার ৫৪৭টি, বাহারাইন মিশন থেকে ৮৪ হাজার ৭৩৪টি, ব্রুনাই থেকে ৮ হাজার ৪৩৭টি, ইতালির রোমে বাংলাদেশ মিশন থেকে ৩৪ হাজার ৫৩০টি, মিলান মিশন থেকে ২৪ হাজার ১৪৫টি, কুয়েত থেকে দেড় লাখ, মালয়েশিয়া থেকে দুই লাখ ১০ হাজার ৫১৪টি, ওমান থেকে এক লাখ ৮৫ হাজার ৪৪টি, কাতার থেকে ৬৬ হাজার ৮৪৩টি, বাংলাদেশ মিশনের সৌদি আররের রিয়াদ অফিস থেকে চার লাখ ৯ হাজার ৯৬৮টি, জেদ্দা কনস্যুলার জেনারেল অফিস থেকে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৮৭৫টি, সিঙ্গাপুর থেকে এক লাখ ৭ হাজার ৫৯টিসহ মোট ৬২টি মিশন থেকে পাঁচ বছরে ২৫ লাখ দুই হাজার ২৫৪টি আবেদনের বিপরীতে এমআরপি বিতরণ করা হয়।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পাসপোর্ট বিতরণ পদ্ধতি পরিদর্শন করে। ওই প্রতিনিধি দলটি দেখতে পায়, পাসপোর্ট ও ভিসা ফি থেকে আদায় করা রাজস্ব পৃথক ব্যাংক হিসাবে না রেখে অন্যান্য খাত থেকে আদায় করা রাজস্বের সঙ্গে একই হিসাবে জমা রাখা হচ্ছে। এতে এ খাতে কত আদায় হলো ও কত ব্যয় হলো তার কোনো হিসাবই থাকছে না।


