বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

নিরাপত্তা উদ্বেগেও ব্যবসা বাড়ছে বহুজাতিক কোম্পানির

base_1466449358-L1বিদেশী হত্যা ও জঙ্গি হামলার ঘটনায় বছরের শুরু থেকেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলে আসছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও এর মধ্যেও ভালো ব্যবসা করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১২টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় সবারই চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টার্নওভার ও মুনাফা বেড়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে মুনাফায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধিও দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও কৌশলের কারণেই নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে। কর্মীদের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কও এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির ২৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিএটি বাংলাদেশের টার্নওভার দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২২৬ কোটি টাকা; আগের বছর একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২২৯ কোটি টাকা।

বিএটি বাংলাদেশের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. আজিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বিএটি বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাজারে বেশি সময় দেয়ার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। বিদেশী হত্যাসহ দেশে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো থাকায় ব্যবসায়িক কৌশল বাস্তবায়নে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেড। ২০১৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গ্রামীণফোনের মোট আয় হয়েছে ৫ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এ সময়ে নতুন গ্রাহক ও প্রদত্ত সেবা থেকে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডাটা রাজস্ব বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৬ ও ডাটার ব্যবহার বেড়েছে ১৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এ সময়ে দুই লাখ নতুন গ্রাহকও যোগ করতে পেরেছে কোম্পানিটি। সব মিলিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও এ সময় ব্যবসা বেড়েছে গ্রামীণফোনের।

চলতি বছরের অর্ধবার্ষিকে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করে গ্রামীণফোনের সিইও রাজীব শেঠি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গ্রামীণফোন অত্যন্ত সফলভাবে ২০১৬-এর প্রথমার্ধ পার করেছে। এ সময় ডাটা গ্রাহক এবং এর ব্যবহার দুটোই বেড়েছে। ১০ হাজার থ্রিজি বিটিএস স্থাপন শেষ হয়েছে। ফলে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ থ্রিজির আওতায় এসেছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের ভয়েস থেকে অর্জিত রাজস্ব ও মিনিটের ব্যবহারও বাড়ছে। ভালো করপোরেট নীতি বাস্তবায়নের ফলে প্রতিকূলতার মধ্যেও কোম্পানির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিক্রি ও মুনাফা দুটোই বেড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক বহুজাতিক কোম্পানি বাটা সুর। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০২ কোটি ৯১ লাখ টাকায়। ২০১৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৬৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ২৯ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মুনাফা হয় ৩৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আগের বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

বাটা সুর কোম্পানি সেক্রেটারি মো. হাশিম রেজা বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি না থাকায় দেশের অভ্যন্তরে বিক্রি ও রফতানির হার বেড়েছে। গত কয়েক বছর ব্যবসায়িক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার একটা প্রবণতাও ছিল ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে সম্প্রতি গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় বাটার গুলশান ও বারিধারার আউটলেটে বিক্রি কিছুটা কমেছে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভালো ব্যবসা করেছে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডও। এ সময়ে কোম্পানিটির টার্নওভার বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। জানুয়ারি-জুন সময়ে বার্জার পেইন্টসের টার্নওভার হয় ৭৭০ কোটি ২৫ লাখ টাকা; ২০১৫ সালের একই সময়ে যা ছিল ৬৬১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে নিট মুনাফা হয় ১০৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা; আগের বছর যা ছিল ৭৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্টের টার্নওভার ও মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ২০১৫ সালের প্রথমার্ধে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের ৬১৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা টার্নওভার হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১০৯ কোটি ১ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এ সময়ে ব্যবসায় সবচেয়ে এগিয়েছে লিন্ডে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রয় ও মুনাফায় দ্বিগুণের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে কোম্পানিটির। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে লিন্ডে বাংলাদেশের মোট টার্নওভার হয়েছে ২১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; ২০১৫ সালের একই সময়ে যা ছিল ১০৭ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটি কর-পরবর্তী মুনাফা দেখিয়েছে ৪৭ কোটি ১১ লাখ টাকা; আগের বছর যা ছিল ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
ওষুধ ও রসায়ন খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশের রাজস্ব ও মুনাফা উভয়ই বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির টার্নওভার বেড়েছে ৫ শতাংশ ও কর-পরবর্তী মুনাফা ১২ শতাংশ।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিরামিক কোম্পানি আরএকের বিক্রি চলতি বছরের প্রথমার্ধে বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে কোম্পানিটির টার্নওভার দাঁড়িয়েছে ২৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকায়। আগের বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৫২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির গ্রস প্রফিট বেড়েছে ২ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথমার্ধে মোট মুনাফা হয়েছে ১১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১০৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে পরিচালন ও বিপণন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় কমলেও অগ্রিম আয়কর প্রদানের কারণে আগের বছরের তুলনায় নিট মুনাফা কিছুটা কমেছে। এ সময়ে এর নিট মুনাফা হয় ৪০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা; আগের বছর যা ছিল ৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের মোট বিক্রয় ৫১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা; আগের বছর যা ছিল ৫২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। কোম্পানিটির বিক্রয় আগের বছরের একই সময়ের কাছাকাছি থাকলেও অগ্রিম কর পরিশোধ করে প্রথমার্ধে মুনাফা কম দেখিয়েছে লাফার্জ সুরমা। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৯৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৩৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা শরিফুল আলম বলেন, আমাদের দেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো রাজনৈতিক পরিবেশ। চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ব্যবসায়ীদের অনুকূল ছিল। আগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও ছিল কোম্পানিগুলোর মধ্যে। ফলে বিদেশী নাগরিক হত্যাসহ নিরাপত্তার বিষয়টি খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সাধারণত জরুরি সময়ে তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে। তাদের প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণেও দেশীয় কোম্পানির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে তারা।

আরও পড়ুন