শুক্রবার ৬ নভেম্বর ২০২৬

পদত্যাগপত্রের ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের পর মুখ খুলবেন এসপি বাবুল

sp-babulপুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তার পদত্যাগপত্র দিয়েছেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন তিনি (বাবুল)। গণমাধ্যমকেও এড়িয়ে চলছেন। এমনকি পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করছেন না তার পরিবারের কেউ। এ ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন বাবুল আক্তার। সিদ্ধান্ত জানার পর মিডিয়ার কাছে মুখ খুলবেন- এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিবারের কয়েকজন সদস্য।

রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার পদত্যাগপত্র দিয়েছেন, যা বিবেচনায় রয়েছে।

৫ জুন বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুন হন। এ ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর বাবুল আক্তার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন- এমন খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ করে বাবুল আক্তার ও তার পরিবারের সদস্য অথবা সরকারের কেউ কোনো মন্তব্য করেননি।

পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলে- বাবুল আক্তারের ভাই সাহাবুল হক সাবু সোমবার টেলিফোনে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি বড় ভাইয়ের (বাবুল) সঙ্গে কথা বলেছি। ভাই বলেছে, দু-একদিন দেখি। এরপর কথা বলব।’

আরও স্পষ্ট হতে বাবুল আক্তারের সেলফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলে কেউ রিসিভ করেননি। যদিও গত শনিবার পর্যন্ত বাবুল আক্তার টেলিফোনে মিডিয়ার সঙ্গে ‘অব দ্য রেকর্ডে’ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। তবে পরিবারের একটি সূত্র বলেছে, এ মুহূর্তে কৌশলগত কারণে বাবুল আক্তার মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন না। তাই ফোন ধরছেন না তিনি।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর মেরাদিয়ার ভুঁইয়াপাড়ায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে জানা যায়- তিনি মতিঝিল এলাকায় এক আত্মীয়র বাসায় গেছেন। তখন তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলেন, বাবুল এসব বিষয় নিয়ে কথা বলবেন না। বলতে চান না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, কবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছে সেই তারিখ তো কেউ বলছে না। আমরা তো জানতে পারলাম না, কোন তারিখে বাবুল পদত্যাগপত্রে সই করল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, তাহলে ভালোই হয়েছে। এতদিন এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কিছুই বলা হয়নি। এখন বলছেন। তাহলে এখন সরকারের সিদ্ধান্ত। তাকে রাখবে নাকি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবে সেটাও সরকারের ব্যাপার। তবে চাকরি গেলে বাবুলের জীবন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেন বাবুলের শ্বশুর।

তিনি বলেন, চাকরি গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন বাবুল আক্তার। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক জঙ্গি আস্তানায় হানা দিয়েছিলেন তিনি (বাবুল)। গ্রেফতার করেছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ অসংখ্য সক্রিয় সদস্যকে। উদ্ধার করেছিলেন অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এছাড়া স্বর্ণ, ইয়াবা ও আমদানি নিষিদ্ধ কেমিক্যালের বড় বড় চালান আটক করেছিলেন তিনি। এসব অভিযানের কারণে তার শত্রু পদে পদে। চাকরি গেলেও তার সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু হতে পারে আবার জেলে গেলেও ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন তিনি। কারণ কারাগারেও তো অনেক আসামি আছে যা তার কারণে জেল খাটছে। তারা কী বাবুলকে ছেড়ে দেবে?

বাবুলের চাকরি নিয়ে এই টালবাহানা কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তার শ্বশুর বলেন, চাকরি কি কেউ ছাড়তে চায়? কি হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে আমি বিশ্বাস করি, বাবুল মিতু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। হত্যাকাণ্ডের আসল ঘটনা বাদ দিয়ে অন্য বিষয় নিয়ে মাতামাতি করা হচ্ছে। বাবুলের চাকরিটাই এখন আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, বাবুল যদি চাকরি ছাড়ে, তাহলে তার দুই সন্তান বড় হয়ে কী জানতে চাইবে না, কেন তিনি চাকরি ছেড়েছেন? তাদের মা নিহত হওয়ার পর কেন চাকরি গেছে? তখন কী জবাব দেবে বাবুল।

গত ৫ জুন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ের অদূরে বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সেদিনই তার লাশ আনা হয় খিলগাঁও মেরদিয়ার ভুঁইয়াপাড়ায় বাবার বাসায়। মেরাদিয়া কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়। সেই থেকে বাবুল দুই সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতেই আছেন। স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ জুন রাতে ভুঁইয়পাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানে তাকে দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

দীর্ঘ এ সময় তাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। গোয়েন্দা কার্যালয়ে একজন উপকমিশনারের কক্ষে তাকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করেন সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহারসহ শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা। পরে তাকে মেরাদিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেয় পুলিশ। তখন থেকে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মেরাদিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে এক প্রকার ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ জীবন কাটাচ্ছেন। আর পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে নিয়ে চলছে নতুন গুঞ্জন। ডালপালা মেলে নানা গল্পের। কেন তাকে এভাবে নেয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে বাবুল আজও গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেননি। তিনি কী কারণে নিশ্চুপ থাকছেন সেটাও রহস্যে ঘেরা। তবে স্ত্রী হত্যার ৫৮ দিনের মাথায় ৩ আগস্ট পুলিশ সদর দফতরে যান তিনি। ৪ আগস্টও গিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী বদলি হয়ে আসা কোনো কর্মকর্তাকে সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট শাখায় (প্রশাসন) যোগদানপত্র দেয়ার কথা। তবে তিনি পুলিশ সদর দফতরে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগদানপত্র জমা দেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় জানায়, তিনি অনেক আগে থেকেই পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত আছেন। তার নির্ধারিত কোনো অফিস কিংবা কাজ নেই। আর যেহেতু পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত আছেন, তাই তিনি চাকরিতে আছেন।

স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের ১৯ দিনের মাথায় (২৪ জুন রাতে) পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে শ্বশুরের বাসা থেকে পুলিশের নিয়ে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ ঢাকা মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ১৫ ঘণ্টা পর বাসায় ফেরত পাঠানোর পর থেকেই তাকে নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়। সেই রহস্য এখনও কাটেনি। সবার মধ্যেই প্রশ্ন জাগে- স্ত্রী হত্যাকাণ্ডে সন্দেহের তীর কী তাহলে বাবুলের দিকে? যদি তাই না হয়, কেন তাকে রাতের আঁধারে এভাবে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। আর চাকরিতে ফেরা অথবা পদত্যাগপত্র নিয়ে কেন এত রহস্য।

আরও পড়ুন