মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে এখন আর আলোচনা নেই। মাহমুদার স্বামী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার নিজেও এ নিয়ে কিছু বলছেন না। তিনি এখন তৎপর তাঁর চাকরি রক্ষা নিয়ে। স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে দেওয়া এক আবেদনে তিনি বলেছেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি, বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেছেন, বাধ্য করা হয়নি, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
স্ত্রী খুনের ঘটনার পর একজন পুলিশ সুপারকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘বাধ্য করার প্রশ্নই ওঠে না, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। অনেক দিন অপেক্ষা করে সেই পদত্যাগপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
এর আগে তাঁর শ্বশুর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনও দাবি করেছিলেন, বাবুল স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দেননি। তিনি অভিযোগ করেন, বাবুল চাইলেও তাঁকে কাজে যোগ দিতে দেওয়া হচ্ছে না।
আলোচিত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। স্ত্রী হত্যার বিচারের বিষয়ে স্বামী বাবুল আক্তার এখন পর্যন্ত মুখও খোলেননি। তবে চাকরি ফিরে পেতে এখন তিনি তৎপর হয়ে উঠেছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, বাবুলের পদত্যাগপত্র নিয়মানুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। জবাব এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি হয়ে আসার দুই দিন পর গত ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামের ও আর নিজাম রোডে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন বাবুলের স্ত্রী। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে গত ২৪ জুন গভীর রাতে খিলগাঁওয়ের ভূঁইয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর আবার তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। ওই জিজ্ঞাসাবাদের সময় পদত্যাগপত্রে সই করেন বাবুল। প্রায় দেড় মাস সেই পদত্যাগপত্র পুলিশ সদর দপ্তরে থাকার পর কিছুদিন আগে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
এর আগে ৩ আগস্ট বাবুল আক্তার তাঁর কর্মস্থল পুলিশ সদর দপ্তরে গিয়ে লিখিতভাবে কাজে যোগ দিতে চান। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাঁকে জানিয়ে দেন, তাঁকে আর কাজে যোগদান করতে দেওয়া সম্ভব নয়। পরদিন ৪ আগস্ট বাবুল পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি (প্রশাসন) বরাবর লিখিতভাবে যোগদানপত্র জমা দেন। এতে তিনি বলেন, স্ত্রী খুন হওয়ার পর দুই সন্তানের দেখাশোনার জন্য কর্মকর্তাদের পরামর্শমতো তিনি শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে দুই সন্তানকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছেও নেওয়া হচ্ছে। অনুপস্থিতির সময়টা ছুটি হিসেবে নিয়ে তাঁকে কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে অনুরোধ করেন বাবুল।
সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরে যোগদান করতে না পেরে সই করা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য ৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে আবেদন করেন বাবুল। এতে তিনি বলেন, ‘বিগত ২৪ জুন তারিখে পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাধ্য হয়ে আমাকে চাকরির অব্যাহতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। স্ত্রীর মৃত্যুশোক, সদ্য মা-হারা দুটো শিশুর ব্যাকুলতায় প্রতিকূল ও বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে আমি চাকরি হতে অব্যাহতির আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘উক্ত অব্যাহতিপত্রটি প্রত্যাহারের আবেদন জানাচ্ছি, যা আমি স্বেচ্ছায় দাখিল করিনি।’
বাবুলের পদত্যাগপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘আমি তাঁর চিঠি পেয়েছি। তিনি যেসব কথা চিঠিতে লিখেছেন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য নেই, সেটা জানে পুলিশ সদর দপ্তর। আমরা পদত্যাগপত্র নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছি।’
বাবুলের এ দাবির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, ‘জোর করে কাউকে পদত্যাগ করানো যায় নাকি? আর তিনি তো একজন পুলিশ অফিসার। আমার এখনো মনে আছে ওই দিন বাবুল আক্তার বলেছেন, “আমার মানসিক অবস্থা ভালো নয়। আমি অব্যাহতি চাই। আমার দুটি বাচ্চা রেখে আর কাজ করা সম্ভব নয়।”’
আইজিপি বলেন, ‘এরপর মানবিক দিক বিবেচনা করে আমি অপেক্ষা করেছি, তাঁর অব্যাহতিপত্র প্রায় দেড় মাস পর মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। নিয়মানুযায়ী যেদিন পদত্যাগ করবে সেদিনই তা পাঠানোর কথা।’ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন ‘ও অব্যাহতি চায় না, সেটা তো এসে আমাদের জানাতে পারত। আমরা অপেক্ষা করছিলাম, সে তো কখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগই করেনি। এখন এসে সে যা করছে তার কোনো অর্থ নেই। আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারব না।’
পুলিশ সদর দপ্তরের আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মিতু হত্যার তদন্ত চলছে। তদন্তে যদি প্রমাণ মেলে এ ঘটনার সঙ্গে বাবুল আক্তারের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে, তবে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিতু হত্যার তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার গতকাল বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে একাধিকবার বাবুল আক্তারের সঙ্গে আমার ও তদন্ত কর্মকর্তার কথা হয়েছে। আড়াই মাসে বাবুল আক্তার নিজ থেকে মামলার কোনো খোঁজ নেননি। আমরাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’
একই কথা বললেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. কামরুজ্জামান। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে বাদীর (বাবুল আক্তার) সঙ্গে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করা হয়। বাদী বাবুল আক্তার কখনো যোগাযোগ করেননি।


