বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

জামায়াতের ধনকুবের মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকর

kasem-ali-finished একাত্তরের নৃশংস হত্যাকারী বাহিনী আলবদর নেতা ও জামাতের অর্থ জোগানদাতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। শনিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার পাশের গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার-২ এ তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে বলে আইজি প্রিজনস বি. জে. সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জানান। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ষষ্ঠ অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হলো।

মৃত‌্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাকে তওবা পড়ান কাশিমপুর কারা জামে মসজিদের ইমাম মুফতি হেলাল উদ্দীন। ফাঁসির সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

মৃত‌্যুদণ্ড কার্যকরের পর লাশ বের করা হয় অ‌্যাম্বুলেন্সে করে। মীর কাসেমের দাফন হবে তার নিজ গ্রাম মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালাগ্রামের পৈতৃক ভিটায়।

কারাফটকজুড়ে পুলিশ-‌র‌্যাবের বেষ্টনির মধ‌্যে রাত ৯টার ১০ মিনিট আগে তিনটি অ‌্যাম্বুলেন্স কারাগারের ভেতরে ঢুকে।

এদিকে, গাজীপুরের সুরক্ষিত এই কারাগারের ফটকে পুলিশের পাশাপাশি বিপুল সংখ‌্যক র‌্যাব সদস‌্যের সারি বেঁধে অবস্থান একভাবে দণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। জেলার বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয় বিজিবি সদস‌্যদেরও।

র‌্যাব সদস‌্যদের অবস্থানের আগে বিকাল সোয়া ৪টার দিকে কারাগারে ঢোকে ফায়ার সার্ভিসের একটা গাড়ি। পুলিশের একটি জলকামান আগের রাতেই কারাগারের ভেতরে নিয়ে রাখা হয়।

কারাগারের আরপি চেকপোস্ট সংলগ্ন দোকানপাট দুপুরেই বন্ধ করে দেয় পুলিশ। কারাগারে অন‌্য বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাতের নিয়মিত কার্যক্রমও এ দিন ছিল বন্ধ।

এর আগে চার জামায়াত নেতার যে সময়ে ফাঁসি কার্যকর হয়:

* কাদের মোল্লার ফাঁসি রাত ১০টা ১ মিনিটে

* কামারুজ্জামানের ফাঁসি রাত ১০টা ১ মিনিটে

* মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর ফাঁসি রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে

* নিজামীর ফাঁসি রাত ১২টা ১০ মিনিটে

‍যুদ্ধাপরাধীদের মধ‌্যে এই প্রথম কারও সাজা কার্যকর হচ্ছে কাশিমপুরের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর আগের পাঁচজনের দণ্ড কার্যকর হয়েছিল ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কের কারাগারে, যা সম্প্রতি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হয়েছে।

জামায়াতের মজলিসে শূরা সদস‌্য মীর কাসেমকে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৪ সালে মৃত‌্যুদণ্ড দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব‌্যুনাল। চলতি বছর মার্চে আপিল বিভাগেও সেই রায় বহাল থাকায় তিনি রিভিউ আবেদন করেন।

আপিল বিভাগ গত মঙ্গলবার রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিলে কাসেমের মামলার সব বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে।

সংঘ থেকে শিবির: ১৯৫২ সালে জন্ম মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে হলেও বাবার কর্মসূত্রে মীর কাসেমের (মিন্টু) বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি হিসেবে আল বদর বাহিনীর আঞ্চলিক নেতা। ডালিম হোটেল ছিল তার নির্যাতন কেন্দ্র। ১৯৭৫ সালের পর জামায়াত সক্রিয় হয়ে উঠলে ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রথম সভাপতি।

মীর কাসেমের প্রাণ বাঁচানোর শেষ সুযোগ ছিল কৃতকর্মের জন‌্য অনুশোচনা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার।

তিনি সেই সুযোগ নেবেন না বলে শুক্রবার কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

জামায়াতের প্রধান অর্থ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত ৬৩ বছর বয়সী মীর কাসেমকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর ৪০ নম্বর কনডেম সেলে।

জেলার নাশির আহমদ শনিবার দুপুরে জানান, কারাগারের চিকিৎসকরা বন্দির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। তাকে স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের আর্থিক মেরুদণ্ড: ইসলামী ব‌্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ভাইস চেয়ারম‌্যান ও পরিচালক; বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; রাবেতা আল ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা; দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান; কেয়ারি গ্রুপের কর্ণধার।

কারাগারের এক কর্মকর্তা জানান, ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি তারা নিয়েছেন। কারাগারের দক্ষিণ পূর্ব কোণের ফাঁসির মঞ্চটি পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। মোম মাখানো দড়িতে আনুমানিক ওজনের বালির বস্তা বেঁধে প্রাথমিক মহড়াও দেওয়া হয়েছে।

চারজন জল্লাদকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান। এই দল এর আগে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করেছিল।

এই তোড়জোড়ের মধ্যে কারা কর্তৃপক্ষের ডাক পেয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় ছয়টি মাইক্রোবাসে করে কাশিমপুরে পৌঁছান মীর কাসেমের পরিবারের সদস‌্যসহ ৪৫ জন আত্মীয়।

তাদের মধ‌্যে মীর কাসেমের স্ত্রী, মেয়ে, পুত্রবধূসহ ৩৮ জনকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় বলে জেলার নাশির আহমেদ জানান। সন্ধ‌্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তারা বেরিয়ে গাড়িতে উঠে চলে যান।

এরপর কারা ফটকে নিরাপত্তা জোরদারের মধ‌্যে সন্ধ‌্যা ৭টায় কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকেন দেশের শীর্ষ কারা কর্মকর্তা ইফতেখার।

এর আগে দুপুরে দণ্ড কার্যকরে সরকারের নির্বাহী আদেশ কাশিমপুরে পৌঁছনোর পর দেড়টার দিকে অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল ইকবাল হাসানকে কারাগারে ঢুকতে দেখা যায়। এরপর বিকাল ৪টায় কারাগারে যান ডিআইজি প্রিজন্স গোলাম হায়দার।

যে অভিযোগে ফাঁসি:
অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

* রিভিউ রায় লিখেছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। এর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের বাকি চার বিচারক।

* আপিলের রায়ে ১১ নম্বর অভিযোগে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে মীর কাসেমের ফাঁসির রায় বহাল থাকে। রিভিউ খারিজ হওয়ায় সেই দণ্ডই এখন তার প্রাপ্য।

* ৪, ৬ ও ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে কাসেমকে খালাস দেয় আপিল বিভাগ। আর ২, ৩, ৭, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মোট ৫৮ বছরের কারাদণ্ড বহাল থাকে। রিভিউ আবেদনে ১১ নম্বর ছাড়া আর কোনো অভিযোগের বিষয়ে যুক্তি দেয়নি আসামিপক্ষ।

* রায়ে বলা হয়, মীর কাসেমের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাকে দোষী সাব‌্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে। রিভিউ আবেদন খারিজ করা হল।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। ২০১২ সালের ১৭ জুন মতিঝিলে নয়া দিগন্ত কার্যালয় থেকে যুদ্ধাপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যুদ্ধাপরাধের বিচার।

মীর কাসেম আলী এ মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মীর কাসেমকে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের খান সেনাদের সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হওয়া ‘বাঙালি খান’ হিসাবে, যিনি সে সময় জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে ট্রাইব‌্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে।
একাত্তরে মীর কাসেমের নির্দেশেই চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিস সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু মালিকানাধীন মহামায়া ভবন দখল করে নাম দেওয়া হয় ডালিম হোটেল। সেখানে গড়ে তোলা হয় বদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘাঁটি এবং বন্দিশিবির। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে সেই ডালিম হোটেলকে বলা হয় ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’।

আরও পড়ুন