মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন জঙ্গির পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি হলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একাধিক বাহিনী ও সংস্থার একাধিক সূত্র তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
নিহত ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান গত রাতে বলেন, নিহত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে তাঁর নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। নাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, পিতা মো. নুরুল ইসলাম, মাতা জেবুন্নাহার ইসলাম। বাড়ি কুমিল্লার সদর থানার পাঁচথুবী গ্রামে। জন্মতারিখ ১৬.০৯.১৯৭৯।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর নাগাদ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিহত ব্যক্তির পরিচয় জেনেছে। তিনি মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) ৪৩ লং কোর্সে প্রশিক্ষণ শেষে ২০০০ সালের নভেম্বরে সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। পদাতিক বাহিনীর এই কর্মকর্তা গত বছরের মাঝামাঝি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন।
গতকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবারের সদস্যদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
রূপনগরে নিহত ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম কি না—জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশিদুল হাসান গত রাতে বলেন, ‘জাহাঙ্গীর বা মুরাদ নামের কেউ সেনাবাহিনীতে নেই বা ছিলেন না। জাহাঙ্গীর বা মুরাদ নামে কেউ অবসরও গ্রহণ করেননি। তারপরও সেনাবাহিনী আরও ভালোভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।’
প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে রূপনগরে অভিযানের পর সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, নিহত ব্যক্তি জেএমবির কথিত মেজর মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর।
গতকাল পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, নিহত ব্যক্তি সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সৈনিক এবং জেএমবির সামরিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় অংশগ্রহণকারীদের এই ব্যক্তি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে পুলিশ সন্দেহ করে। তিনি জানান, গাইবান্ধার চরে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের সূত্রগুলো কয়েক দিন আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবিতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন কথিত এই মুরাদ ওরফে মেজর মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর।
যেভাবে অভিযান: পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাত পৌনে নয়টায় পুলিশের একটি দল রূপনগরের একটি বাড়িতে হানা দেয়। সেখানে ‘মেজর মুরাদ’ নামে কথিত জেএমবির এই নেতা লুকিয়ে ছিলেন বলে তাদের কাছে খবর ছিল। পুলিশ সেখানে অভিযানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে এক ব্যক্তি পিস্তল ও ছুরি হাতে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ছুরির আঘাতে ও পিস্তলের গুলিতে পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। পুলিশের পাল্টা গুলিতে ওই ব্যক্তি নিহত হন।
গতকালও বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ঘটনাস্থল রূপনগরের ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাড়িটি পুলিশ পাহারা দিয়ে রেখেছিল। এমনকি বাড়ির সামনের সড়কেও বাইরের কাউকে যাতায়াত করতে দেওয়া হয়নি। সাড়ে তিনটার পর সড়কটি খুলে দেওয়া হয়। তবে ওই ছয়তলা বাড়িটিতে বাসিন্দা ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ বলছে, ১ জুলাই থেকে বাড়িটির ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন ওই জঙ্গি।
শুক্রবার রাতে অভিযানে থাকা রূপনগর থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বলেন, ষষ্ঠ তলায় ওই জঙ্গি তাঁর ফ্ল্যাটে ঢোকার পর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক বাইরে থেকে তালা মেরে দেন। এরপর রূপনগর থানার পুলিশকে খবর দিলে তাঁরা আসেন। প্রথম দফায় রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ সহিদ আলম, পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীন ফকির, ছয়জন উপপরিদর্শক (এসআই) মমিনুর রহমান, আল মামুন, মেহেদী হাসান, আব্দুল বোখারী, রাসেল রনি, আসিফ করিম এবং এএসআই রাশেদুল ইসলাম অভিযান শুরু করেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা বাইরে থেকে তালা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ওই জঙ্গি ধাক্কা দিয়ে বের হয়েই সিঁড়ির দিকে দৌড় দেন। এ সময় তাঁকে জাপটে ধরেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবু ওই জঙ্গি ঠেলে এগোতে থাকেন। তখন তাঁকে সামনের দিক থেকে ধরতে যান ওসি সহিদ আলম। এ সময় জঙ্গির ছুরিকাঘাতে ও গুলিতে ওসি সহিদ আলম, পরিদর্শক শাহীন ফকির, এসআই মমিনুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হন। এরপর জঙ্গি দৌড়ে নিচে নামতে থাকেন। পুলিশও তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে নিচে নামে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা এরপর আর ঘটনার বর্ণনা দিতে চাননি। তিনি বলেন, ‘ভাই, থাক; আর বলতে পারব না। স্যাররা আপনাদের এমনিতেই জানাবেন। ওনাদের কাছ থেকে জেনে নিয়েন।’
ঘটনার সময় পাশের একটি বাড়ি থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন, এমন একজন বলেন, জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে তিনি নিচের পুরো ঘটনাটি দেখেছেন। তিনি বলেন, প্রথমে সাত-আটজন পুলিশ ওই বাড়িতে ঢোকে। এ সময় তারা আশপাশের সবাইকে দরজা-জানালা লাগিয়ে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান নিতে বলে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এক ব্যক্তিকে কোমর পেঁচিয়ে ধরে ধস্তাধস্তি করে নিচে নামছিল। ওই ব্যক্তির এক হাতে ছুরি ও অন্য হাতে অস্ত্র, সেগুলো নাড়ছিল এবং ‘আমাকে ছাড়’ বলে চিৎকার দেয়। ততক্ষণে আরও পুলিশ এসে সেখানে জড়ো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যক্তি বলেন, ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান এবং গা ঝাড়া দিয়ে ওই ব্যক্তি সামনের দিকে দৌড় দেন। পুলিশও আবার তাঁকে জাপটে ধরে। একপর্যায়ে পুলিশের কেউ একজন বলছেন, ‘ওর সঙ্গে পারা যাচ্ছে না। ফায়ার করো।’ এরপর চার-পাঁচটি গুলির শব্দ হয়। ওই লোকটাকে পড়ে যেতে দেখলাম। দু-তিন মিনিট পর আরও দুটি গুলির শব্দ শুনি। পুলিশ এরপর আশপাশের সব বাসার বাতি নিভিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়।
রাত পৌনে তিনটার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিহত জঙ্গির লাশ নিয়ে যায় পুলিশ। এই প্রতিবেদক তখন ঘটনাস্থলেই ছিলেন। পুলিশের পল্লবী অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) জাকির হোসেন বলেন, এই জঙ্গি পুলিশের দেওয়া ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ করেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর নাম জাহাঙ্গীর বলে উল্লেখ করেন। এটি তাঁর আসল নাম নয়। তথ্য ফরমে আর কী কী তথ্য উল্লেখ করেছিলেন, এর জবাব দেননি পুলিশের এই কর্মকর্তা।


