বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শেভরন বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে কি?

shevronগ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শেভরন। শুধু শেভরনের মাধ্যমেই সরবরাহ হয় দেশের গ্যাসের চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি। কিন্তু এক মাস ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে এমন আলোচনা ঘুরছে ব্যবসায়ী মহলে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে শেভরন। সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে এরই মধ্যে একাধিক দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে সম্পদ বিক্রির ইচ্ছার কথাও জানিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিটি।

পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রায় এক মাস হলো বাংলাদেশে শেভরনের ব্যবসা বিক্রি হয়ে যাওয়ার খবর পাচ্ছেন তারা। এ নিয়ে শেভরনের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। তবে বিক্রি-সংক্রান্ত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করছে না তারা।

পেট্রোবাংলার অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শেভরনের ব্যবসা বিক্রির তথ্য কোনো গুজব বা উড়ো খবর নয়। তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসার অংশ বিক্রি করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শেভরন। এরই অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন নতুন প্রকল্প সম্প্রসারণে তারল্য সংকট নিরসনেই তাদের এ উদ্যোগ। তবে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা পুরোপুরি গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা নেই শেভরনের। স্টেক বা অংশ বিক্রি করে বাংলাদেশেও অপারেটর হিসেবে শেভরন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

যোগাযোগ করা হলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব শেভরনের পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলাকে দেয়া হয়নি।’

জানা গেছে, বাংলাদেশে শেভরনের ব্যবসার সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে জ্বালানি খাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এ খাতের বাংলাদেশী বৃহত্ প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে এরই মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে সম্পদ বিক্রি বাবদ শেভরন ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি দাম চাইছে বলে বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র।

বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার তথ্য নিয়ে জোর আলোচনা চলছে প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ কার্যালয়েও। একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শেভরন বাংলাদেশের সব কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ‘টাউন হল মিটিং’-এ বাংলাদেশ কার্যক্রমের প্রধানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চান কর্মীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেভরন বাংলাদেশের কমিউনিকেশন ম্যানেজার এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, সম্পদ একীভূত, অধিগ্রহণ বা বিক্রি করা-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করার বিষয়ে শেভরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবিকাশমান অর্থনীতিগুলোর প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে শেভরন মনোযোগী। এ অঞ্চলে শেভরনের প্রকল্পগুলোর শক্তিশালী অবস্থান ও কৌশলগত দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে অর্ধেকের বেশি কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। এ অবস্থায় জ্বালানি খাতের বহুজাতিক প্র্রতিষ্ঠান শেভরনের কার্যক্রমও বিশ্বব্যাপী সংকোচন হবে, এমন আভাস আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এর প্রভাব দেখা গেছে বাংলাদেশেও। কর্মী সংখ্যাসহ কমে গেছে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ প্রবাহ। ১৯৯৪ সালে সরকারের সঙ্গে উত্পাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (পিএসসি) পর ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলনে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশে মোট তিনটি ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্বে আছে শেভরন। সম্মিলিতভাবে এ তিনটি ব্লকে এক বছরের ব্যবধানে শেভরনের বিনিয়োগ (মূলধনি ও পরিচালন) কমেছে ১৯ শতাংশ। এ তিন ব্লকে ২০১৪ সালে শেভরনের মোট মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় ছিল ৪১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে। আর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এ হিসাবে দুই বছরে বাংলাদেশে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ২২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার।
গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশে শেভরনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ রয়েছে ১২ নং ব্লক বা বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে। ২০১৩ সালে এ ব্লকে মূলধনি ও পরিচালন ব্যয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগ ছিল ৪১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। ২০১৪ সালে সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৩৫ কোটি ৯২ লাখ ডলারে। ২০১৫ সালে এ বিনিয়োগ আরো কমে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ডলারে নেমে আসে। এ হিসাবে শুধু বিবিয়ানাতেই দুই বছরে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

এদিকে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে বিনিয়োগ কমলেও মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে শেভরনের। যদিও বাংলাদেশে শেভরনের মোট বিনিয়োগের তুলনায় এ দুই গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ খুবই কম। ২০১৫ সাল শেষে মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় ছিল ১ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। একই সময়ে জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করে শেভরন।

বাংলাদেশে শেভরনের কার্যক্রমের সঙ্গে স্থায়ী, অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক পন্থায় প্রায় ৪ হাজার কর্মী যুক্ত আছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত শেভরনের সবগুলো ব্লকের প্লান্ট ও প্রধান কার্যালয়সহ কর্মী সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার। এরা সবাই অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক পন্থায় বাংলাদেশ কার্যালয়ের মাধ্যমে শেভরনের হয়ে গ্যাস উত্তোলন কাজে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শেভরন চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করায় এখন এ ধরনের কর্মী ২০ শতাংশ কমে ৮০০ জনের নিচে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি কাজাখস্তানে প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শেভরন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায়। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ফলে সম্প্রসারণের কাজ শুরু করতে তারল্য সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ব্যবসা বিক্রির পরিকল্পনা করছে শেভরন।

এশিয়া অঞ্চল থেকে শেভরনের ব্যবসা বিক্রির তথ্য জানা যায় গত মাসে। তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিক্রি করবে শেভরন। চীনে শেভরনের তেল প্রকল্প বিক্রির পাশাপাশি জানা যায় ইন্দোনেশিয়ায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের ক্রেতা অনুসন্ধানের বিষয়টি। একই সঙ্গে জানা যায় থাইল্যান্ড প্রকল্প ছেড়ে দেয়ার আভাসও।

আরও পড়ুন