English
মঙ্গলবার ২৫ এপ্রিল ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » » রামপাল নিয়ে অসত্য তথ্যে সরকারি বিজ্ঞাপনে প্রপাগান্ডা
বিশেষ নিউজ

রামপাল নিয়ে অসত্য তথ্যে সরকারি বিজ্ঞাপনে প্রপাগান্ডা


নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম - ১৩.০৯.২০১৬

sundarban_rampal_projectগোলাম মোর্তোজা

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে অসত্য তথ্যের একটা সম্পর্ক সব সময়ই থাকে। তারকারা বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে যে সব পণ্যের গুণগান করেন, তাদের প্রায় কেউ-ই সে সব পণ্য কোনও দিন ব্যবহার করেন না। যা সারা পৃথিবীর প্রেক্ষিতেই সত্যি। বিজ্ঞাপন চিত্রে মানহীন পণ্য, মানসম্পন্ন হিসেবে প্রচার করা এক ধরনের প্রতারণা হলেও তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তা মেনে নেওয়া হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসার উদ্দেশে অর্থ খরচ করে বিজ্ঞাপন করে। পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞাপনই মানুষ পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করেন না। ‘যা বলছে তা ঠিক কিনা বা কতটা ঠিক’- অধিকাংশ মানুষই কম -বেশি সন্দেহ করেন। যেমন, রঙ ফর্সাকারী একটি ক্রিমের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন। মানুষের জন্যে অসম্মানজনক, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন।

কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান জনসচেতনতার জন্যেও বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিয়ে থাকে। সেই প্রচারণার বিজ্ঞাপনে কোনও অসত্য তথ্য থাকে না। সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, এমন কোনও তথ্য সে সব বিজ্ঞাপনে থাকে না। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের ‘ওরস্যালাইন ‘ একটি জনহিতকর বিজ্ঞাপন।

সরকারও জনসচেতনতার জন্যে বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিয়ে থাকে। যেমন ‘জন্মনিয়ন্ত্রণে’ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে বিজ্ঞাপণের আশ্রয় নিয়ে থাকে সরকার।

প্রশ্ন হলো, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো অসত্য তথ্যের বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিয়ে, সরকার দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে কিনা? বলছি রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা। কোনও যুক্তি দিয়ে রামপালের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে না পেরে, এখন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।

এই বিজ্ঞাপনে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, দেখা যাক বাস্তবের সঙ্গে তা কতটা সঙ্গতিপূর্ণ।

১. রামপাল নিয়ে বানানো বিজ্ঞাপন প্রকল্পে খরচের পরিমাণ নিশ্চয়ই কয়েক কোটি টাকা। খরচ আরও বাড়বে। বিজ্ঞাপনে রামপাল বিরোধী আন্দোলন করছে এমন একজন তরুণকে দেখানো হয়েছে, যে তরুণ কোনও কিছু না জেনে না বুঝে রামপালের বিরোধিতা করছে। যা সম্পূর্ণরূপে অসত্য, প্রতারণামূলক এবং তরুণদের জন্যে অসম্মানজনক বক্তব্য। সারা দেশের যত তরুণ রামপাল বিরোধী এবং সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে, তারা নিরক্ষর বা অবুঝ নয়। তারা শিক্ষিত, অধিকাংশই প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ, জেনে -বুঝে আন্দোলন করছে। তাদেরকে বুঝিয়ে বা লোভ দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে আন্দোলনে আনা হয়নি। তারা অসৎ রাজনীতিবিদ-আমলা এবং ভাড়াটে বিশেষজ্ঞদের অসত্য তত্ত্ব বিশ্বাস করে না। তারা প্রযুক্তির সহায়তায় নিজস্ব পদ্ধতিতে তথ্য জানে, যাচাই -বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়। এসব তরুণরা রামপালের ক্ষেত্রেও তাই করছে। বিজ্ঞাপনের মডেল বাবা, রাজনীতিবিদ -আমলাদের ভূমিকা পালন করছেন। যাদের বক্তব্য এই তরুণরা বিশ্বাস করে না।

২. বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে পৃথিবীর ‘সর্বোচ্চ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রামপালে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রথমত: কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ‘সর্বোচ্চ ‘ প্রযুক্তি বলতে কোনও প্রযুক্তি নেই। এটা একটি ভুল-বিভ্রান্তিকর বক্তব্য।

ধরে নিলাম ‘সর্বোচ্চ ‘ প্রযুক্তি বলতে ‘সর্বাধুনিক বা অত্যাধুনিক ‘ প্রযুক্তি বোঝাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের এনটিপিসি কোম্পানি বলছে, রামপালে ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তাদের ওয়েবসাইটেও তা লেখা আছে, আমাদের মন্ত্রীরা তো অহরহ-ই বলছেন। যদিও যথেষ্ট সন্দেহ আছে শেষ পর্যন্ত আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হবে কিনা! তারপরও ধরে নিলাম ব্যবহার করবে।

তো? এটা তো বর্তমান পৃথিবীর ‘সর্বাধুনিক ‘ প্রযুক্তি নয়! আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির পর ‘অ্যাডভান্স ‘ আলট্রা সপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে।  ‘সর্বোচ্চ ‘ প্রযুক্তি বলতে যদি ‘অ্যাডভান্স ‘ প্রযুক্তিও বুঝিয়ে থাকা হয়, তবুও বিজ্ঞাপনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

এই অসত্য বক্তব্য বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার দরকার আছে বলে মনে করি না।

শুধু একটি তথ্য জানিয়ে রাখি, বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক কয়লা ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আমেরিকা নির্মাণ করছে মিশিগানে। যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোনও দূষণ হবে না। তিন বছর পর, সময় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। বাজেট বেড়ে গেছে বিলিয়ন ডলার। নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়ে উৎপাদনে না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে ‘কোনও দূষণ ‘ হবে না।

আমেরিকার মতো দেশ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে। নিশ্চয়ই এনটিপিসি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রামপালে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না। যদিও তাদের ‘সর্বোচ্চ বা সর্বাধুনিক ‘ প্রযুক্তি বলতে, এই প্রযুক্তিকেই বোঝায়। আবারও বলি, সুপারের চেয়ে আলট্রা সুপারে, সর্বশেষ অ্যাডভান্স আলট্রা সুপারে -দূষণের মাত্রা শুধু কিছুটা কমে। যে দূষণ হয়, তাতে পরিবেশের ক্ষতি হয়, সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর ক্ষতি হবে।

৩. বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রামপালে ৯২৫ মিটার উচ্চতার চিমনি ব্যবহার করা হবে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তো এমন চুল্লিই ব্যবহার করা হয়!এর সঙ্গে তো দূষণ না হওয়ার সম্পর্ক নেই। এত জোর দিয়ে এই তথ্য প্রচার করছেন কেন? এটা তো অভিনব কোনও কিছু নয়!

আর একটি চিত্র দেখানো হয়েছে, কয়লা আসবে সম্পূর্ণ ঢাকা অবস্থায়। ভাওতাবাজি হলো যা দেখানো হয়নি বা বলা হয়নি। বড় জাহাজে কয়লা আসবে গভীর সমুদ্রে। সেই কয়লা ছোট জাহাজে তুলে মংলা বন্দরে আনা হবে। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তোলা, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মংলায় এনে খালাস -এই পুরো প্রক্রিয়ায় বেশ ভালো পরিমাণ কয়লা সমুদ্র -নদীতে মানে সুন্দরবনের ভেতরে পড়বেই এবং তাতে পানি দূষণ হবেই।

‘পুরোটা ঢেকে ‘ আনা হবে -এটা একটা উদ্ভট কথা। এনটিপিসি তার নিজের দেশ ভারতে এভাবে ঢেকে কয়লা পরিবহন করে না, নৌকা -রেল -সড়ক কোনও পথেই।
ইউরোপের অনেক দেশ জাহাজে খোলা অবস্থায় কয়লা পরিবহন করে। ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তারা আরও অনেক কিছু করে, আমরা তার কিছুই করি না।

পুরো কয়লা ঢেকে পরিবহন করতে হলে, খরচ অনেক বেড়ে যায়। যা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পোষায় না। তাছাড়া সম্পূর্ণ ঢেকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কয়লা পরিবহন করা সম্ভবও না। এখানে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তোলার ব্যাপার আছে।

৪. ‘সুন্দরবনের ক্ষতি হোক, এমন কিছু কি সরকার করবে ‘-এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছে বিজ্ঞাপনে। যেখানে যুক্তি থাকে না, সেখানে-ই এমন প্রশ্নের অবতারণা করা হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে ‘সরকার ‘ জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা সহজে অর্জন করতে পারে না। শেয়ার বাজার -ব্যাংক লুট থেকে কুইক রেন্টালের দায় মুক্তি, কোনও ক্ষেত্রেই সরকারকে বিশ্বাস করা যায়নি। বিএনপি -আওয়ামী লীগ দুই সরকারই, কূখ্যাত এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ি কয়লা ক্ষেত্রের মালিকানা দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ‘বিশ্বাস ‘ করলে ‘সরকার ‘ জনগণের সম্পদ এশিয়া এনার্জিকে দিয়ে দিত। বাংলাদেশ পাবে ৬% এশিয়া এনার্জির ৯৪%, এই ছিল চুক্তি!

বিশ্বাস না করে জনগণ প্রতিরোধ করেছিল বলে, সরকার সম্পদ পাচার করতে পারেনি। বাপেস্কের আবিষ্কার করা কূপ, নাইকোকে প্রতিবাদি জনগণ দেয়নি -সরকারগুলোই দিয়েছে। জনগণের ১৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস সম্পদ ধ্বংস করা অক্সিডেন্টালের থেকে সময় মতো ক্ষতি পূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেয়নি বিএনপি -আওয়ামী লীগ সরকার। এরশাদ সরকার সিমিটারের কাছে কিভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছিল, তা তো অজানা নয়। জনগণ আন্দোলন করে তা প্রতিরোধ করেছিল। আন্দোলন করেই গ্যাস রফতানি ঠেকানো হয়েছিল, সরকারকে বিশ্বাস করে নয়।  কাফকোকে প্রায় বিনা মূল্যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় কোনও লাভ হয়নি, ক্ষতি হয়েছে বিশাল। জনস্বার্থ বিরোধী একাজ ‘সরকার ‘-ই করেছে।

সরকারের এসব কাজের পক্ষে সেই সময়ও কিছু মানুষ -তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা কথা বলেছিলেন, এখনও বলছেন। এরা কেন বলেন, তা মানুষের অজানা নয়।

সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজেদের সততা -গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বারবার দিয়েছে জাতীয় কমিটি। তাই জনগণ তাদের সঙ্গে থাকেন, বিশ্বাস করেন।

তথ্য-প্রমাণ ছাড়া ‘সরকার ‘কে বিশ্বাস করতে হবে, এটা কোনও গ্রহণযোগ্য বক্তব্য হতে পারে না।

বাংলাদেশ- বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ, বহুজাতিক কোম্পানির কোনও পণ্য নয় যে, অসত্য তথ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে তা বিক্রি করতে হবে।

জনগণের অর্থ খরচ করে, জনগণের কাছে অসত্য-বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা নিশ্চয়ই সংবিধান সমর্থন করে না।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...







Editor: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.