ছাত্রলীগের কয়েক নেতা-কর্মীর হাতে লাঞ্ছিত এক নারী চিকিৎসক প্রতিকার চেয়ে মামলা করার পর তার চরিত্র নিয়ে অপবাদ রটিয়ে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।
সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত উপজেলা শ্যামনগরে শম্পা রানী মণ্ডল নামে ওই চিকিৎসককে রোববার রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারীর বাড়ি থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় থানায়। পরে শম্পার বাবা শ্যামনগরের ধুমঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নগেন্দ্র নাথ সরকার মেয়েকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনেন। তিনি বলেছেন, আগের ঘটনার নিরাপত্তার ঝুঁকি দেখে তিনিই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মী আরিফুজ্জামান পলাশের বাড়িতে মেয়েকে রেখে এসেছিলেন।
তবে শ্যামনগর থানার ওসি এনামুল হক বলেন, ‘আপত্তিকর’ অবস্থায় শম্পা ও পলাশকে আটক করা হয়েছে।
মাতৃ শিশু দুগ্ধ ডি এস এফ কোয়ালিটি ম্যানেজার পলাশ ওসির এই বক্তব্যকে নাকচ করে বলছেন, কয়েকজন যুবক পুলিশ নিয়ে এসে তার পাশে ডা. শম্পাকে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলার পর থানায় নিয়ে যায়।
পলাশের স্ত্রী শারমীন আক্তার সুইটিও স্বামীর বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, ওই যুবকরা তখন তার মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নিয়েছিল।
শম্পা ও তার বাবা নগেন্দ্রনাথের দাবি, লাঞ্ছনার ঘটনার প্রতিকার চেয়ে মামলা এবং তাতে ছাত্রলীগের স্থানীয় তিন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারের পর ওই ঘটনাকে আড়াল করতে রোববারের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এই ঘটনার শুরু দুই সপ্তাহ আগে গত ২৮ অগাস্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক শিশুর মৃত্যুর পর। সেদিন পেটে নাড়ি জড়ানো চার বছরের একটি শিশুকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল।
ওই শিশুটি মারা যাওয়ার পর মৃত্যুসনদ লেখার সময় ডা. শম্পাকে লাঞ্ছিত করা হয়; যদিও শিশুটির চিকিৎসার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিলেন বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. খান হাবিবুর রহমান।
তিনি বলেন, দুপুরে শিশুটিকে আনার পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দীপংকর মন্ডল তাকে একটি স্যালাইন দিয়ে বেডে পাঠিয়ে দেন। কিছু সময় পর বমি করায় তিনি শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তার আগে এক্স-রে করারও পরামর্শ দেন ওই চিকিৎসক। এক্স-রে করার ৫ মিনিটের মধ্যে বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে শিশুটি মারা যায়।
তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসকের অবহেলার কোনো ঘটনা ছিল না বলে দাবি করেন ডা. হাবিবুর; যদিও চিকিৎসায় অবহেলায় অভিযোগ তোলেন স্থানীয়রা।
ডা. হাবিবুর বলেন, “এরপর হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শম্পা রানী মৃত্যুসনদ লেখার প্রস্তুতি নিতেই তাকে লাঞ্ছিত করেন স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। ওই রোগী সম্পর্কে ডা. শম্পা রানী তেমন কিছু জানতেন না। তিনি তার ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করার ব্যবস্থা করছিলেন।”
ওই সময় শ্যামনগর মহসীন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুস সবুর ও রহমতের নেতৃত্বে ছয়-সাতজন যুবক ডা. শম্পাকে লাঞ্ছিত এবং হাসপাতালের আসবাবপত্র ভাংচুর করেন বলে হাবিবুরের অভিযোগ।
ঘটনার পর শম্পা শ্যামনগর থানায় ছাত্রলীগ নেতা সবুর, রহমতসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় ৬/৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয় মণ্ডল, সবুর ও রহমতকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছিলেন শম্পা। ভয়ে এলাকা ছেড়ে খুলনায় এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে যান তিনি। এদিকে কাজে যোগ দিতে হাসপাতাল থেকে তার বাবা নগেন্দ্রনাথকে খবর দেওয়া হয়।
নগেন্দ্রনাথ বলেন, “ডা. খান হাবিবুর রহমানের অনুরোধে রোববার সকালে তিনি মেয়েকে শ্যামনগরের বাড়ি নিয়ে আসেন। তার বাড়ি কাঁচা হওয়ায় নিরাপত্তার বিষয় ভেবে হাসপাতালের মাতৃ শিশু দুগ্ধ ডি এস এফ কোয়ালিটি ম্যানেজার পলাশের বাড়িতে রেখে আসেন। এরপর পুলিশ একেবারে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমার মেয়েকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে থানায় নিয়ে যায়। আমি মেয়ের ফোনে সংবাদ পেয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তাকে মুক্ত করে আনি।”
পলাশ বলেন, “বাড়িতে শম্পাকে রেখে তিনি ও তার স্ত্রী পাশের গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় তাদের পুলিশ ধরে। সাদা পোশাকের পুলিশ আমাকে আটক করে এবং পরে ঘর থেকে দিদিকে (শম্পা) বের করে আনে। ওই সময় কয়েকজন যুবক আমার স্ত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে দিয়ে জোর করে দিদির পাশে আমাকে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলে। পরে পুলিশ আমাদের পুলিশ থানায় নিয়ে যায়।”
পলাশের স্ত্রী সুইটি বলেন, “তারা নিমন্ত্রণ থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তার স্বামী ও শম্পাকে আটক করে। ওই সময় উপস্থিত যুবকরা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি ‘আপত্তিকর’ আচরণও করে।”
শম্পা রানী কে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অনুরোধে শ্যামনগরে ফিরলেও নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে হাসপাতালের কর্মচারী পলাশের বাড়িতে উঠেছিলেন তিনি। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাদা পোশাকের পুলিশ ও কিছু লোক আমাকে ও পলাশ ভাইকে শ্যামনগর থানায় নিয়ে যায়। আমাকে চরিত্রহীন বানানোর চেষ্টাও চালায়। পরে লিখিত বক্তব্য দিয়ে তারা থানা থেকে ছাড়া পান বলে জানান এই নারী চিকিৎসক।
শম্পা ও তার বাবার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। শম্পা ও পলাশকে ‘আপত্তিকর’ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলার বাইরে আর কিছু বলতে চাননি শ্যামনগরের ওসি এনামুল।
সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসাইন সুজন বলেন, ২৮ অগাস্ট ডা. শম্পাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় শ্যামনগর মহসীন কলেজের সভাপতি সবুরকে সংগঠন থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এদিকে শম্পাকে নিয়ে এই ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ডা. মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “এ ঘটনায় ডা. শম্পার সম্মানহানি ঘটেছে। তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে রীতিমতো হেনস্থা করা হয়েছে।”
শম্পার উপর হামলা এবং হাসপাতালে ভাংচুরের ঘটনায় দোষীদের আড়াল করার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে এই চিকিৎসক নেতা মন্তব্য করেন।


