English
মঙ্গলবার ২৪ জানুয়ারী ২০১৭
বিশেষ নিউজ

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ইউনেসকোর আপত্তি


নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম - ২০.০৯.২০১৬

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ইউনেসকোর আপত্তিরামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারের অবস্থান এবং এর বিরোধিতা করে দেশে-বিদেশে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনসহ সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক সে সময় এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানাল ইউনেসকো।

এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে ৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাটি।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তারা বলেছে, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান ও সর্ববৃহৎ শ্বাসমূলীয় জলাবন (ম্যানগ্রোভ) সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারকে পরামর্শও দিয়েছে তারা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার যে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করেছে, সেটিকেও অসম্পূর্ণ বলে অভিহিত করেছে ইউনেসকো। প্রতিবেদনের বিষয়ে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারের মতামত চেয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক ম্যাকটিল্ড রোসলার। গত ১১ আগস্ট এটি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে নির্মাণ হতে যাওয়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগামী মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪০তম অধিবেশনে আলোচনা হবে। ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর ওই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। এ কমিটি গত বছর জুলাইয়ে তাদের ৩৯তম অধিবেশনেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, সে সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিল ইউনেসকো। ইউনেসকোর আগে জাতিসংঘের আরেক সংস্থা রামসার সেক্রেটারিয়েটের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া গত মাসে বিশ্বের ১৭৭টি সংস্থা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করতে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিল। সুন্দরবনের পাশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন হয়েছে।

তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনড় অবস্থানে আছে সরকার। এরই মধ্যে এ প্রকল্পে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিও করে ফেলেছে সরকার।

সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থান হিসেবে ঘোষণা দেওয়ারও আভাস মিলেছে ইউনেসকোর প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নামের একটি সংস্থাকে দিয়ে। কিন্তু ওই ইআইএ আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। তাতে সঠিক চিত্র উঠে আসেনি।

ইউনেসকো মনে করে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সেখানকার ইকোসিস্টেমের ওপর ব্যাপক হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রামপালে প্রস্তাবিত স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার পক্ষে মত দিয়ে সংস্থাটি কেন্দ্রটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে বলেছে। ইউনেসকোর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে ভবিষ্যতে আশপাশে আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে ভাটিতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে সমস্যায় পড়ছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে ভারত থেকে পানির প্রবাহ আরো কমে যাবে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতার মাধ্যমে পানির প্রবাহ বাড়াতে সুপারিশ করেছে ইউনেসকো।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবেদনটির বিষয়ে সরকারের কোনো মতামত আছে কি না—তা এক মাসের মধ্যে জানানোর অনুরোধ জানিয়েছিল ইউনেসকো। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত আসতে দেরি হওয়ায় আরো এক মাস সময় চায় সরকার। সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ইউনেসকো। সরকারের মতামত পাওয়ার পরপরই প্রতিবেদনটি নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে সংস্থাটি।

তবে এ বিষয়ে জানতে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ও মুখ্য সচিবকে ফোন করা হলে দুজনের মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশের বাইরে থাকায় তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুল করিম বলেন, ‘ইউনেসকো থেকে একটি প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে আমরা আমাদের জবাব তাদের জানাব। এখনো সময় আছে।’ তিনি আরো বলেন, ইউনেসকো যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে সেটি খসড়া, চূড়ান্ত নয়। সেটি আরো সংশোধন হতে পারে।

জানতে চাইলে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ইউনেসকো থেকে যখন প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসেছিল, তখন সরকার তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক করতে দেয়নি। পরবর্তীতে আমরা তাদের সঙ্গে স্কাইপ ও ই-মেইলে যোগাযোগ করেছি। তাদের রামপাল বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেছি, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আমরা তাদের কাছে সেটি প্রমাণ করেছি।’ অবশ্য পরে আর ইউনেসকোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান তিনি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধী পক্ষের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে নদীর পাশাপাশি বায়ুদূষণ হবে। নদী নাব্যতা হারাবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য পশুর নদের পানি ব্যবহার করা হবে। নদী থেকে পানি নেওয়া ও ব্যবহারের পর এর অংশবিশেষ গরম অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া, দুটিই পরিবেশের ক্ষতি করবে। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই পরিবহন করা হবে। সমুদ্রপথে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা প্রথমে বড় জাহাজে করে সুন্দরবনের ভেতরে আক্রাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, এরপর সেখান থেকে ছোট ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা পরিবহন করে প্রকল্প এলাকায় কয়লা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হবে।

তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রামপালে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নদী দিয়ে কয়লা আনা-নেওয়া হলেও তাতে নদীদূষণ হবে না। সুন্দরবনেরও কোনো ক্ষতি হবে না।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...







Editor: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.