ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে ব্রাহ্মণবড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। ভাঙচুর হয়েছে অন্তত দশটটি মন্দির, ভাংচুর-লুটপাট-অগ্নি সংযোগ হয়েছে হিন্দুদের শতাধিক বাড়ি ঘরে।
রোববার দুপুর বারোটা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত কয়েকশত উত্তেজিত মানুষ এই হামলা চলে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকায় পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
বিকালে জেলা প্রশাসক রেজাওয়ানুর রহমান ও পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গুরুতর আহত গৌর মন্দিরের সেবায়েত শংকর সেনকে নাসিরনগর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণ বেড় গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের যুবক রসরাজ দাস তার ফেসবুকে উসকানিমূলক একটি ছবি পোস্ট করেন। এই ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশ জানায়, শুক্রবার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাস তার ফেসবুক পাতায় ‘কাবা শরিফের উপরে শিবমূর্তি বসিয়ে’ একটি পোস্ট দেন। এ নিয়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ জানালে রসরাজ দাসকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে রোববার সকালে ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের’ নেতারা ‘নাসিরনগর আপামর তৌহিদি জনতার’ নাসিরনগর ডিগ্রি কলেজ মোড়ে বিক্ষোভের ডাক দেন। আর ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের’ নেতারা নাসিরনগর খেলার মাঠে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেন। পৃথক এই সমাবেশ চলার সময় হিন্দুপাড়াগুলোতে হামলা চালানো হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই সমাবেশে যোগ দেওয়া লোকজন এই হামলা চালিয়েছে। তবে দুই সংগঠনের নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হামলার সময় মন্দিরের মূর্তি ভাঙচুর, আসবাব তছনছ ও প্রণামি বাক্স ভাঙচুর করে টাকাপয়সা লুটে নেওয়া হয়। বাড়িঘর ভাঙচুর করে টেলিভিশনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়। এ সময় হিন্দুপাড়ার নারী-পুরুষদেরও বেধড়ক পেটানো হয়। মহাকাল পাড়ার গৌর মন্দিরের পুরোহিত নরেন্দ্র প্রভু জানান, আকস্মিকভাবে একদল যুবক লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে ভাঙচুর শুরু করে। পরে তারা মূর্তিতে আঘাত করে ও লুটপাট চালায়। এ সময় তাঁকেও মারধর করা হয়। একই কায়দায় সদরের পশ্চিম পাড়ার জগন্নাথ মন্দির, নমশূদ্র পাড়ার কালীবাড়ি মন্দির, মহাকাল পাড়ার শিবমন্দির, দুর্গামন্দির, শীলপাড়ার লোকনাথ মন্দির, দত্তপাড়ার দত্তবাড়ি মন্দির, সূত্রধরপাড়ার কালীমন্দিরসহ এসব পাড়ার দুই শতাধিক বসতঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, দুপুরে কয়েকশ লোক সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে দেশি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাসিরনগর সদরের দত্তবাড়ির মন্দির, নমসুদ্রপাড়া মন্দির, জগন্নাথ মন্দির, ঘোষপাড়া মন্দির, গৌরমন্দির গুঁড়িয়ে দেয়। হামলাকারীরা হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ সময় কয়েকজন পূজারী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে এক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। পরে অন্যান্য বাহিনীও আনা হয় বলে জানান এসপি।
একটি ‘সুযোগ সন্ধানী’ মহল সরকারকে বিব্রত করতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে দাবি করে এসপি মিজানুর এর জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেছেন। “এ ঘটনার নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন এসপি মিজানুর। প্রতিটি ভাংচুরের ঘটনায় আলাদা মামলার প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে এসপি মিজানুর বলেন, ইতোমধ্যে ছয় হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক রেজাওয়ানুর রহমান জানান, এলাকায় র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
নাসিরনগর উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক খৈলকদ পোদ্দার অভিযোগ করেন, অন্তত দুই শতাধিক হিন্দু বাড়িঘর ও ১৫টি মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে। পিটিয়ে আহত করা হয়েছে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষকে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নাসিরগর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক রিয়াজুল করিমের দাবি, তাঁদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলাকালে একটি পক্ষ হিন্দুপাড়াগুলোতে হামলা চালায়। তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। এ ধর্ম কখনো সংঘাতকে সমর্থন করে না। যারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে, তিনি তাদের বিচার দাবি করেন। খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নাসিরনগর উপজেলা শাখার প্রচার সম্পাদক মুফতি ইসহাক আল হুসাইন বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছি। এই সমাবেশ থেকে কেউ কোথাও হামলা চালাননি।’
স্থানীয় মহকুমা শাসক (ইউএনও) চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ বলেন, স্থানীয় কওমি মাদ্রাসা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নেতারা উপজেলা সদরে সমাবেশ করার অনুমতি নিয়েছিলেন। সমাবেশ চলার সময়ে এই হামলা হয়েছে।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের উদ্বেগ:
নাসিরনগরে ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাণা দাশগুপ্ত। আজ এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের নীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এই ঘটনা। তিনি সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন। নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব বলেন, বিকালের পর পরিস্থিতি দৃশ্যত শান্ত হলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।


