English
রবিবার ২৬ মার্চ ২০১৭
বিশেষ নিউজ

স্মৃতির পাতায় ৪ নভেম্বর


নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম - ০৩.১১.২০১৬

স্মৃতির পাতায় ৪ নভেম্বর পঁচাত্তরমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহোলম থেকে

পঁচাত্তরের ২৩ জানুয়ারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। যার সংক্ষিপ্ত নাম বাকশাল। এই সময় বাকশালের অধীনে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নামও পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল জাতীয় ছাত্রলীগ।

প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনের আহ্বায়কের নামও ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। জাতীয় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক হিসেবে শেখ শহিদুল ইসলাম এর নাম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর জাতীয় ছাত্রলীগ কমিটির নামও ঘোষণা করা হয় যার আহ্বায়ক ছিলেন সৈয়দ নুরুল ইসলাম। ১৩ সদস্য বিশিষ্ট এই আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমাকে ঢাকা মহানগরের সকল কলেজ ও স্কুল সংগঠনগুলো দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি ছাড়াও এই দায়িত্ব পালন করেন সাবেক সচিব খন্দকার মোহাম্মদ জুলিয়াস ও বর্তমানে ঢাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় আব্দুর রউফ শিকদার। একইসাথে ঢাকা মহানগর জাতীয় ছাত্রলীগের সীমানা সাভার থেকে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয় এবং সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ছাত্রলীগকে মহানগরের অধীনে নিয়ে আসা হয়।

এদিকে নুতন এই ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিকে সামনে রেখে কচিকাঁচার মেলাকে সংযুক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় বাকশালের আদর্শ প্রচারে মহানগর জাতীয় ছাত্রলীগ মাঠে নামে। এই উপলক্ষে ঢাকার মোহাম্মদপুরে প্রথম সভায় শেখ শহিদুল ইসলামকে প্রধান অতিথি ও কচিকাঁচার দাদা ভাইকে বিশেষ অতিথি করা হয়। মোহাম্মদপুরে প্রতিষ্ঠিত এই কচিকাঁচা সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে কর্মরত কার্জন। এই সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সেদিন শেখ শহিদুল বলেছিলেন, একনায়কতন্ত্র অবশ্যই ভালো যদি তা শোষিত মানুষের পক্ষে থাকে, তা না হলে একনায়কতন্ত্র ফেসিবাদী রূপ ধারণ করতে পারে। বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছেন শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে, শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর লক্ষে। এভাবেই প্রতিদিন এক কলেজ থেকে আরেক কলেজ এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় সভা ও সংগঠনের নুতন শাখা খোলা নিয়ে আমরা সকলেই তখন খুবই বেস্ত। আমরা মূলত এইসময় বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন, শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা সর্বত্র প্রচার করেছি।

এমনি একটি সভা নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে আয়োজন করা হয়েছিল। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কর্ণধার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাথী শামসুস জোহা এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা মহানগর জাতীয় ছাত্রলীগের আহবায়ক সৈয়দ নুরুল ইসলাম। সভায় উপস্থিত ছিলেন জোহাপরিবারের সন্তান ছাত্রলীগ নেতা নাসিম ওসমান সেলিম ওসমান সহ আরো অনেকে। নারায়ণগঞ্জে ছাত্র লীগের নেতৃত্বে ছিলেন তারা। সব সভাগুলোতেই সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে চিলির সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভেদর আলেন্দি হত্যার মতো চেষ্টা বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদের দালালরা করতে পারে বলে আমরা জাতীয় ছাত্রলীগের কর্মীদের হুশিয়ার থাকার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু সেদিন কখনো কোনো সময়ই আমরা ভাবিনি ১৫ আগস্ট এমনি একটা মর্মান্তিক হত্যাকান্ড ঘটতে পারে।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলায় নিযুক্ত গভর্নরদের ঢাকায় ডেকে এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে সকলেই যার যার জেলায় ফিরে যান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শুরুতেই সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানের দালালরা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে এই মহান নেতাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। আমি তখন ঢাকার সোবানবাগ সরকারি কলোনীতে ছিলাম। ১৫ আগস্ট শুক্রবার সকালেই বাসা থেকে গা ঢাকা দিলাম। চলে এলাম মোহাম্মদপুর। এখান থেকেই গোপনে সকলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। এই সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনি খন্দকার মোশতাক দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সকল এমপিদের এক সভা আহবান করলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ এমপিদের একত্রিতভাবে সাক্ষাত করার জন্য মোশতাকের এই উদ্দেস্য যাতে সফল না হতে পারে এজন্য গোপনে সভা করে ঢাকায় অবস্থানরত সকল এমপিদের কাছে হুমকি চিঠি বিলি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

আমাদের এই হুমকি চিঠিতে উপকার হয়েছিল। সেদিন মোশতাকের ডাকে অনেকেই সারা দেননি। এই সময় আমাদের জাতীয় নেতারা সকলেই বলতে গেলে কারাগারে। ছাত্রলীগের যারা সেদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে সংগ্রামে নেমেছিলেন তাদের অনেকেই হয়তো এখন আর বেচে নেই কিংবা রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ এরা সকলেই দলের দু:সময়ের পরীক্ষিত সৈনিক। আমাদের সেদিনের সেই গোপনীয় ঐক্য ও আন্দোলনের কথা আজ হয়তো অনেকেই অবগত নয়। জানিনা বঙ্গবন্ধু কন্যা এবিষয়ে কতটুকু অবহিত আছেন।

এমনিভাবে ১৫ আগস্টের পর খুনিদের চক্ষুর আড়ালে গোপনে বিভিন্ন স্থানে মিলিত হয়ে গোপনে ঢাকায় ছাত্র লীগের সংগঠনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়। এভাবেই একদিন ৪ নভেম্বর মৌন মিছিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। তখন বঙ্গভবনে খুনিরা টেংক ও অস্ত্র শস্ত্র হাতে মোস্তাককে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দেশ পরিচালনা করছিলো। জুনিয়ার এই কয়েকজন অফিসার তখন জেনারেল জিয়াকে সামরিক বাহিনী প্রধান করলেও ক্ষমতা তাদের হাতেই ধরে রেখেছিলো। কিন্তু তাদের সেই হিংস্রতা আমাদের থামাতে পারেনি। ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে প্রচারপত্র বিলির সিদ্ধান্ত হলো। আমার উপর দায়িত্ব দেওয়া হলো সকল কলেজে কলেজে ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে এসকল প্রচারপত্রগুলো পৌছে দেওয়ার। যদিও জানি এই সময় এধরনের কাজ কত বিপদজনক তবুও সেদিন আমাদের অনেকেই ভয়কে ভয় মনে করি নাই, জীবনকে জীবন মনে করি নাই। ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে যে মৌন মিছিলটি বের হয়েছিল তার সিদ্ধান্ত হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এই সময় আমরা ৩ নভেম্বরের অভুত্থান সম্পর্কে কিছুই অবহিত ছিলাম না।

প্রচার পত্রগুলো নিয়ে আসতে একদিন রিক্সা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে এসে হাজির হলাম। এখানে মুকুল দার কাছে ছিল প্রচারপত্র। অত্যন্ত লুকিয়ে পেকেটে করে মুকুল দা আমার হাতে প্রচারপত্রগুলো তুলে দিলেন। আমার সাথে ছিল বন্ধু হেলাল। হেলাল রাজনীতির সাথে জড়িত না হলেও সেদিন আমার সাথে এই ভয়ংকর কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। আমাদের সবসময়ই ভয় ছিল টিকটিকির (ডি বি পুলিশ)। আমি প্রচারপত্রের পেকেট রিক্সার সিট্ উঠিয়ে নিচে রেখে দিলাম। তারপর বাসায় এসে একটি বেগে ঢুকিয়ে ঢাকার বিভিন্ন কলেজের নেতাদের কাছে বিলি করার জন্য পৌছে দিয়েছিলাম। নিজেও চলন্ত বাসের পেছন থেকে ছুড়ে মেরেছিলাম। এছাড়া বলাকা সিনেমা হল ও নিউমার্কেটের আসে পাসেও বিলি করা এই প্রচারপত্র। প্রচারপত্রে পরিষ্কার করে লেখা হয়েছিল ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগের মৌন মিছিলের কথা। ঢাকা সহ সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন আতঙ্ককে অপেক্ষা করছে। ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগ আসলে মিছিল করবে কিভাবে?। সকলের ঘরে ঘরে শুধু মাত্র একটি কথা, এ কি করে সম্ভব? এই সময় মিছিল বের হলেতো মিলেটারীরা চুপ করে বসে থাকবে না। কি হবে ৪ নভেম্বর, পারবে কি ছাত্ররা মিছিল করতে?

সেদিন ছাত্রলীগ কর্মীরা গোপনে সভা করে সফল করে ৪ নভেম্বরের মৌন মিছিলকে সফল করে তোলার জন্য শপথ গ্রহণ করেছিল। জীবনের বিনিময়ে হলেও মিছিল সেদিন হবেই। ৩ নভেম্বর হঠাত করেই খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে দেশে সামরিক অভ্যুথান হলো। সকালের দিকে আকাশে উড়ছিল মিগ ২১। খালেদ মোশারফের অভুত্থানকে বিমান বাহিনী আকাশে বিমান উড়িয়ে সমর্থন জানায়। কি থেকে কি হয়ে গেল। এধরনের কিছু একটা ঘটতে পারে তা কখনোও ভাবা হয়নি। নেতৃবর্গের সাথে যোগাযোগে জানতে পারলাম হউক না অভুত্থান, আগামীকাল ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগের মৌন মিছিল তবুও হবে।

৪ নভেম্বর সকালে যথারীতি রিক্সা করে সোবহানবাগ সরকারী কলোনী থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা হলাম। পথে কলাবাগান স্টাফ কওয়াটারের কাছে আসতেই দেখি মিরপুর রোডের রাস্তার দুইপাশে ভারী অস্ত্র হাতে মাথায় হেমলেট পরে সৈনিকরা দাড়িয়ে আছে। দেশ এইসময় কিভাবে চলছে জানিনা। আদৌ কোনো সরকার আছে কি না তাও জানিনা। রিক্সা করে বটতলায় এসে দেখি ইতিমধ্যে অনেকেই এসে জড়ো হয়েছেন। দেখতে দেখতে লোকে লোকারণ্য বটতোলা। একসময় আমাদের মৌন মিছিল বটতোলা থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে রওয়ানা হলো। মিছিলের সামনে একধারে মুক্তিযোদ্ধা নায়ক খসরু ভাই তার মোটর সাইকেল নিয়ে মিছিল নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বড় একটা ছবি মিছিলের একেবারে সামনে হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন দুজন ছাত্রলীগ কর্মী। মিছিলের সন্মুখে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন ভাইসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।

নীলক্ষেত পুলিশ ফাড়ির কাছে আসতেই পুলিশ আমাদের বাধা দিল। পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানালেন মিছিল আর সামনে যেতে পারবে না। উপরের নিষেধ আছে। হঠাত এধরনের বাধা পেয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে পড়লো। একসময় পুলিশের সাথে ধাক্কা ধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি চরম অবস্থা ধারণ করে। আওয়ামী লীগ নেতারা পুলিশের টেলিফোনে সরাসরি যোগাযোগ করলেন স্বরাষ্ট্র সচিব সালাউদ্দিন সাহেবের সাথে। নেতাদের আলাপের মধ্য দিয়ে আমাদের মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হলো। মিছিল ধীরে ধীরে কলাবাগান পর্যন্ত আসলে এখানে মিছিলে এসে যোগদান করেন খালেদ মোশারফের মা ও ভাই আওয়ামী লীগ এম পি রাশেদ মোশারফ। আমাদের মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে এসে দাড়ালো। ভিতরে তখন প্রবেশ নিষেধ। বন্ধ গেটের সামনে বঙ্গবন্ধুর ছবির প্রতিক রেখে হাত তুলে মোনাজাত করা হলো। এখানে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন ভাইসহ অনেকে বক্তব্য রাখলেন। এভাবেই পচাত্তরের ৪ নভেম্বর ছাত্র লীগের মৌন মিছিল সফল হয়েছিল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ঢাকায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই মিছিলটি ছিল সর্বপ্রথম একত্রিত একটি সংগ্রামী প্রতিবাদ।

লেখক: ইলেকটেড কাউন্টি কাউন্সিলার স্টকহোল্ম কাউন্টি কাউন্সিল, সভাপতি- সুইডিশ লেফট পার্টি স্টকহোল্ম হেসেলবি ভেলেংবি ব্রাঞ্চ এবং ঢাকায় সত্তরের দশকের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...







Editor: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.