বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

হাঙ্গেরি থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন

পানি সম্মেলন উপলক্ষে হাঙ্গেরিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার রাত ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে এই সফরে পানি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন শেখ হাসিনা। তাদের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ‌্যে তিনটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং ব‌্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

এর আগে শেখ হাসিনা স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সোয়া তিনটায়) দেশের উদ্দেশে বুদাপেস্ট ফিরেন্স লিজট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এবং হাঙ্গেরীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আবু জাফর বিমানবন্দরে শেখ হাসিনাকে বিদায় জানান।
এর আগে হাঙ্গেরীর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

হাঙ্গেরী সফরকালে শেখ হাসিনা সোমবার দু’দিনব্যাপী বুদাপেস্ট পানি (বিডব্লিউএস-২৯১৬) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।
এ ছাড়াও তিনি হাঙ্গেরীর প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং প্রেসিডেন্ট জানোস এডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

শেখ হাসিনা বুদাপেস্টের সিটি পার্কে হিরোস স্কয়ারে হাঙ্গেরীর জাতীয় বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এবং প্রেসিডেন্ট জানোস এডার আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

একই দিন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-হাঙ্গেরীয়ান বিজনেস অ্যান্ড ইকোনোমিক ফোরামের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর সম্মানে ফোর সিজনস হোটেলে অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা সভায়ও বক্তব্য রাখেন।

গত রোববার সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বিকালে বুদাপেস্টে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণ করতে হয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের।

সেখানে চার ঘণ্টা অনির্ধারিত যাত্রা বিরাতির পর বিমান সারিয়ে নিরাপদে বুদাপেস্টে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরি যাওয়ার সময় ব‌্যবহার করা হয়েছিল বিমান বহরের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ ‘রাঙা প্রভাত’। দুই ইঞ্জিনের একটিতে ‘ফুয়েল প্রেশার’ হঠাৎ কমতে শুরু করায় তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হিসেবে আশখাবাতে বিমানটি জরুরি অবতরণ করানো হয় বলে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সেদিন জানিয়েছিলেন।

এই ঘটনায় দায়িত্বে গাফিলতির কারণে বিমানের ছয় কর্মকর্তাকে এরইমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরি থেকে ফিরেছেন বিমানেরই আরেকটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ, আকাশ প্রদীপে করে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব‌্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, “এটা একদম নতুন বিমান, দুই বছর আগে আনা হয়েছে। সব ধরনের পরীক্ষা সেরেই যাত্রা করেছে।”

বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকাল সোয়া ৩টায় বুদাপেস্টের ফিরেন্স লিজৎ বিমানবন্দর থেকে  প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে যাত্রা করে বিমান।

বিদায়ের সময় হাঙ্গেরির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস‌্যরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সশস্ত্র সালাম জানায়।

বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও হাঙ্গেরিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আবু জাফর বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।

সম্পর্ক পূর্ণতায় পৌঁছানোর আশা
প্রধানমন্ত্রী রোববার বুদাপেস্ট পৌঁছালে বিমানবন্দরে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সফরে তিনি অবস্থান করেন ফোর সিজনস হোটেল গ্রেশাম প্যালেসে।

দানিয়ুব নদীর পাড়ে ওই হোটেলের সামনের রাস্তা, সেতু, হাঙ্গেরির জাতীয় সংসদের সামনের কসুথ স্কয়ার এবং হিরোজ স্কয়ার সাজানো হয় বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরি পতাকা দিয়ে। শেখ হাসিনার নিরাপত্তায় হোটেলে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার প্রধানমন্ত্রী বুদাপেস্ট ওয়াটার সামিটে যোগ দেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বজুড়ে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। ওইদিনই তিনি ‘সাসটেনেইবল ওয়াল্ড এক্সপো’ পরিদর্শন করেন।

রাতে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট হ্যানোস আদেরের দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

সফরের তৃতীয় দিন কর্মব্যস্ত সময় কাটান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দিনের শুরুতে হিরোজ স্কয়ারে হাঙ্গেরির জাতীয় নেতা ও সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কসুথ স্কয়ারে তাকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হয়। হাঙ্গেরির সংসদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন তিনি। পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন দুই নেতা।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি ক্ষেত্রে সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

আগামী বছর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষর্থীদের জন্য চিকিৎসা, কৃষি এবং বিজ্ঞান শিক্ষায় পূর্ণ বৃত্তি দিতেও সম্মত হয়েছে হাঙ্গেরি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল হাঙ্গেরি। ইউরোপের যে দেশগুলো স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের মধ‌্যে হাঙ্গেরি অন‌্যতম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে হাঙ্গেরির দূতাবাস বন্ধ করে দেয় সে দেশের সরকার। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে ২০১৮ সালের মধ্যে ঢাকায় আবারও হাঙ্গেরির দূতাবাস খুলতে পারে বলে ঈঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির পুরনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এই সফরের মধ‌্যে দিয়ে উজ্জীবিত হবে এবং তা সম্ভাবনার পূর্ণতায় পৌঁছাবে বলে বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার দুপুরে শেখ হাসিনা পানি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে হাঙ্গেরির রাষ্ট্রপতির দেওয়া মধ্যাহ্ন ভোজেও যোগ দেন তিনি।

বিকালে হাঙ্গেরি-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। পরে হোটেলে ফিরে সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

আরও পড়ুন