বৃহস্পতিবার ২৯ জুন ২০১৭
বিশেষ নিউজ

বাংলাদেশ সীমান্ত ছাড়িয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক ভারতে


NEWSWORLDBD.COM - December 4, 2016

বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে ব্যাপকভাবে নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক। অনুপ্রবেশ, মানব ও মাদকপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক।

এ সংকট সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি পাঠায় এবং ওই চিঠির একটি অনুলিপি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে দেওয়া হয়। চিঠিতে এই মর্মে বলা হয় যে কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েকটি মোবাইল ফোন অপারেটরের নেটওয়ার্ক এত বিস্তৃত যে তা মিয়ানমারের ভেতরে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মেলে। এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, মাদক বা চোরাকারবারি ও দুষ্কৃতকারীরা অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অনেক স্থানে সীমানা পেরিয়ে যাওয়া মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ে তৈরি হওয়া নানা সংকট দীর্ঘদিন ধরেই বহাল রয়েছে।

রাজশাহী, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জাফলং, আখাউড়া, হিলি—এসব এলাকায় সীমানা পেরিয়ে এসেছে ভারতের ভোডাফোন, রেলিয়েন্স ও এয়ারটেলের নেটওয়ার্ক। ২০০৫ সালের দিকে বিটিআরসি এ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেনি। ওই সময় মোবাইল ফোন অপারেটরদের যুক্তি ছিল, সীমান্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি কমিয়ে আনলে দেশের অনেক গ্রাহক মোবাইল ফোনসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এ ছাড়া সমস্যা সমাধানে ভারতেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তিন বছর আগে মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি বিটিআরসিকে একটি জরিপ প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান এসব সমস্যা সমাধানে বিটিআরসি আজ পর্যন্ত উপযুক্ত কোনো নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারেনি।

সম্প্রতি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও তাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অব্যাহত চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিত্রে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বলা হচ্ছে, এমন বিশেষ পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী।

গত ১৭ অক্টোবর বিটিআরসির সর্বশেষ ২০০তম সভায় এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, এ-সংক্রান্ত খসড়া নির্দেশিকা নিয়ে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান ডিজিএফআই, এনএসআই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে খসড়া নির্দেশিকাটি প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করবে। খসড়া নির্দেশিকা বিটিআরসির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় আগামী সপ্তাহে ওই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এ বিষয়ে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান ব্রি. জে. আহসান হাবিব খান বলেন, বিটিআরসির আগামী সভায়ই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতামত তুলে ধরে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

জানা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিটিএস (বেইস ট্রান্সসিভার স্টেশন বা মোবাইল টাওয়ার) স্থাপনের বিষয়ে কোনো বিধিবিধান ছিল না। এর পরও ওই সময় পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় বিটিএস স্থাপনের  অনুমতি দেওয়া হয়নি। ২০০৩ সালে বিডিআর (বর্তমানে বিজেপি) সীমান্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের অপব্যবহার বিশেষ করে চোরাচালান দমনে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করছে মর্মে জানালে সীমান্ত এলাকার জিরো লাইন থেকে আট কিলোমিটার ভেতরের দিকে কোনো টাওয়ার নির্মাণ করতে হলে বিটিআরসির অনুমতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অনেক স্থানে সীমানা পেরিয়ে যাওয়া মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে বিটিআরসি ২০০৫ সালের দিকে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তখন সফল হতে পারেনি। ওই সময় মোবাইল ফোন অপারেটরদের যুক্তি ছিল, সীমান্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক কমিয়ে আনলে দেশের অনেক গ্রাহক মোবাইল ফোনসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এ ছাড়া সমস্যা সমাধানে ভারতেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। এরপর ২০০৮ সালের ৪ মে সশস্ত্র বাহিনী এবং ডাক ও টেলিযোগোযোগ বিভাগের সম্মতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলার পৌরসভা এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বিস্তৃতির অনুমতি দেওয়া হয়। ওই সময় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের ১০ কিলোমিটার ভেতরে যাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিস্তার না করতে পারে তার ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে পার্বত্য তিন জেলার বরকল ও বাঘাইছড়ি ছাড়া সব উপজেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনে অনাপত্তি জানানো হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ছাড়পত্র গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ২০১০ সালে বরকল ও বাঘাইছড়ি উপজেলায়ও মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনে অনাপত্তি জানায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির ৫৩তম স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভায় বাংলাদেশের যেকোনো  সীমান্তে জিরো লাইন পর্যন্ত নিরাপত্তা ছাড় ছাড়াই কিছু শর্ত পূরণসাপেক্ষ বিটিএস স্থাপনের সুপারিশ করা হয় এবং তা পরের সপ্তাহে বিটিআরসির ১১৯তম সভায় অনুমোদন হয়। একই সঙ্গে সীমান্তে বিটিএস স্থাপনের অনুমতি অবগতির জন্য এনএসআই, ডিজিএফআই ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোরও সিদ্ধান্ত হয়। এর ১০ দিন পর বিটিআরসির ১২০তম সভায় আগের সভার সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার  ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে না মর্মে সংশোধন করা হয়।

এ ছাড়া জানা যায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ০৪-০৫-২০০৮, ৩১-১২-২০০৮ ও ০২-০২-২০১০ তারিখের পত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলার কথা বলা হলেও কক্সবাজার সম্পর্কে কিছু উল্লেখ ছিল না। এ জন্য কক্সবাজার জেলা সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জন্য বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠির উত্তরে জানানো হয়, যেহেতু কক্সবাজার জেলা ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর আওতাভুক্ত নয়, সেহেতু ওই জেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনে কোনো আপত্তি নেই। এরপর ২০১৫ সালের দিকে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সমস্যাটিও বিটিআরসির নজরে আনে। এ বিষয়ে বিটিআরসি ওই বছরের ৮ জুন বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে মোবাইল ফোন অপারেটররা সীমান্তের জিরো লাইন থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বিটিএস স্থাপনের জন্য আবেদন করবে না মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বিটিএস স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিলে বিজিবির অনুমতি নেওয়া হবে। আর সীমান্তের তিন থেকে আট কিলোমিটারের মধ্যে বিটিএস স্থাপনে আগের পদ্ধতিই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। বিটিআরসি ওই সিদ্ধান্তের আলোকে একটি খসড়া নীতিমালাও প্রস্তুত করে; কিন্তু তা আজও চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার মতে, সীমান্তের ওপারে বিটিআরসি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। কিন্তু বিভিন্নমুখী চাহিদার কারণেই সে সক্ষমতা প্রয়োগ করতে বিলম্ব হচ্ছে।

যে খসড়া নির্দেশিকা চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায়:
বিটিআরসি যে খসড়া নির্দেশিকা প্রস্তুত করে রেখেছে, তাতে দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি ভাগে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার সীমান্ত। অন্য ভাগে রয়েছে বাকি সীমান্ত অঞ্চল। এই দুই সীমান্ত এলকাকে আবার সীমান্তের জিরো লাইন থেকে দেশের তিন কিলোমিটার ভেতর এবং সীমান্তের তিন কিলোমিটার থেকে আট কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশের যেকোনো সীমান্তবর্তী এলাকায় বিটিএস স্থাপনের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটররা সরাসরি বিটিআরসিতে আবেদন করবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে ভৌগোলিক তথ্য, অ্যান্টেনা হাইট, অ্যান্টেনা টাইলটিং, ডিরেকশন, টাইমিং অ্যাডভান্স ভ্যালু, সীমান্ত থেকে দূরত্ব, কাভারেজ এরিয়া এবং কাছাকাছি বিটিএসের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিতে হবে। বিটিএসের অবস্থান সীমান্তের তিন কিলোমিটারের মধ্যে হলে আবেদন করা স্থানে বিটিএস স্থাপনের যৌক্তিকতা উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে মতামত জানানোর জন্য বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে চিঠি দেবে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ইতিবাচক মতামত বিটিআরসিকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। জেলা প্রশাসক ৩০ দিনের মধ্যে মতামত না পাঠালে আপত্তি নেই ধরে নেওয়া হবে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ক্ষেত্রে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বিটিএস স্থাপনের আবেদনের ক্ষেত্রে বিটিআরসি নিরাপত্তাবিষয়ক মতামতের জন্য ডিজিএফআই, এনএসআই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি ও পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে চিঠি দেবে। সব নিরাপত্তা সংস্থা থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর বিটিআরসি বিটিএস স্থাপনে অনুমতি দেবে। ওই চার জেলা ছাড়া দেশের অন্যান্য সীমান্তে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বিটিএস স্থাপনের ক্ষেত্রে বিটিআরসি বিজিবি সদর দপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে এর অনুমোদন দেবে এবং অনুমোদনপত্রের অনুলিপি ডিজিএফআই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনএসআইকে পাঠাবে। এ বিষয়ে এসব সংস্থা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো আপত্তি থাকলে তা এক মাসের মধ্যে বিটিআরসিকে জানাতে হবে। এই এক মাস সময় পার হওয়ার পর কারো কোনো আপত্তি না থাকলে বিটিআরসিকে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটর বিটিএস স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারবে। সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামো ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও বিটিআরসির অনুুমতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম বিটিএস স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে অপর কোনো অপারেটর দ্বিতীয় বিটিএস স্থাপনের আবেদন করলে সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ছাড়ের প্রয়োজন হবে না। তবে বিষয়টি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে জানানো হবে।

বিটিআরসি সূত্র জানায়, এই খসড়া নির্দেশিকা সম্পর্কে মতামত নিতে গত ১৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিটিআরসি বৈঠক করে। একই দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দেশের সব মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...







Editor: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: newsworldbd1@gmail.com
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.