শুক্রবার ২৩ জুন ২০১৭
বিশেষ নিউজ

এমপি লিটনকে মারল কারা


NEWSWORLDBD.COM - January 2, 2017

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগদলীয় এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যায় জড়িত কাউকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেন, কী কারণে বা কারাই ক্ষমতাসীন দলের এ এমপিকে হত্যা করেছে- তার সন্দেহাতীত স্পষ্ট কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক ২৫ জনের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। লিটন হত্যার ঘটনায় অন্তত পাঁচটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত শুরু করেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। রোববার রাত ৮টার দিকে নিহতের বোন তাহমিদা বুলবুল কাকলী সুন্দরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত তিন-চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা জামায়াতকে সন্দেহ করছেন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগদলীয় তৎকালীন এমপি শাহ এএমএস কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এর এক দশক পর ২০১৬ সালের শেষ দিন গত শনিবার বাসার ভেতরে ফিল্মি কায়দায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর খুনিদের শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এমপি হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করলেও ঢাকা থেকে তাদের সব ধরনের প্রযুুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহভাজন তিনটি মোবাইল নম্বরের কললিস্টও পরীক্ষা করা হচ্ছে। রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজিকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

এমপি লিটন হত্যার ঘটনাকে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের এ কর্মসূচিতে সুন্দরগঞ্জের সব ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ঘটনার পর থেকেই উপজেলায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দিনভর বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুন্দরগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, লিটনের হত্যাকারীদের শিগগির ধরা হবে। খুনিদের কী পরিকল্পনা ছিল তা জানতে অনুসন্ধান চলছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে এসব করা হচ্ছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডটি সন্ত্রাসীদের আতঙ্ক সৃষ্টির নতুন কৌশলও হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকের বলেন, লিটনকে হত্যার পেছনে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাত রয়েছে। পরিকল্পিতভাবেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক রংপুরে সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াত-বিএনপির জঙ্গিরা লিটনকে হত্যা করেছে। কারণ তিনি তাদের অরাজকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করেছিলেন।

র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছেন। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক।

তদন্তে যেসব হিসাব মেলানো হচ্ছে:
হত্যার তদন্তে যে পাঁচটি বিষয় সামনে রাখা হয়েছে তা হলো- জঙ্গিদের হাত আছে কি-না, জামায়াত-শিবির, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, পারিবারিক বা আর্থিক বিরোধ ও সর্বশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব। সংশ্লিষ্টরা জানান, গাইবান্ধা জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকা হিসেবেই পরিচিত। বিগত দুই বছরে জেলায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় তাদের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া গাইবান্ধায় নব্য জেএমবিসহ অন্যান্য উগ্রপন্থি সংগঠনের প্রভাব রয়েছে। গাইবান্ধার বাসিন্দা একাধিক দুর্ধর্ষ জঙ্গি বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হয়েছে। এমপি লিটন কট্টর জামায়াত-শিবিরবিরোধী নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সভায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করতেন। তাই তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কোন্দল রয়েছে কি-না তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। সর্বশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী শামসুল আলম হিরুর প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন লিটন। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক মণ্ডলের পক্ষ নেন।

তবে দলীয় কোন্দলের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতোয়ার রহমান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া সুন্দরগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন ঘিরেও দলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। পৌরসভা নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রে পাঁচজনের নামের তালিকা পাঠান লিটন। এর বাইরে আবদুল্লাহ আল মামুনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি নির্বাচিতও হন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন নিয়ে লিটন ও মামুনের মধ্যে আবারও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। গত বছর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সভাপতি পদে লিটন ও মামুন দাঁড়ালে উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কাউন্সিল পণ্ড হয়। এ ছাড়া বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মামুন হিরো ও দপ্তর সম্পাদক চন্দন সরকারের সঙ্গেও দ্বন্দ্ব ছিল লিটনের। এমপির বিরুদ্ধে নামে-বেনামে দুদকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেন চন্দন। এ ছাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুন্নবী সরকারের সঙ্গেও এমপির দ্বন্দ্ব ছিল। লিটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে গত বছর মামলা করেন নুরুন্নবী। ছাত্রলীগ নেতারাও নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। পুলিশের তদন্তে দ্বন্দ্বের এসব খুঁটিনাটি বিষয়ও আসছে। পাশাপাশি লিটনের সহযোগীরাও সন্দেহের বাইরে নেই। তাদের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিরা বড় ধরনের অপারেশন করলে তার দায় স্বীকার করে। তবে লিটন হত্যার পর কেউ দায় স্বীকার করেনি। তবে দায় স্বীকার না করলেও জঙ্গিদের বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, নব্য জেএমবির একটি বার্তায় একজন মন্ত্রীকে হত্যা পরিকল্পনার ছক পাওয়া গিয়েছিল। সেই গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে কি-না তাও দেখা হচ্ছে। রোববার রাত থেকে সুন্দরগঞ্জে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। বর্তমান অবস্থায় মন্ত্রী-এমপিদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বাসার পাশে আগেই ঘোরাঘুরি হত্যা মিশনের ৫ জনের:  
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কিলিং মিশনে পাঁচজন অংশ নিয়েছিল। তারা দুটি মোটরসাইকেলে আসে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে, তারা বহিরাগত। কালো কোট-প্যান্ট পরিহিত সবার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের একজনের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল। পায়ে ছিল কালো জুতা। বিকেল ৪টা থেকে তারা এমপির বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় রেকি করে। পরে বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় এমপি লিটন বাড়ির সামনের গাবগাছের নিচে বসে ক্রিকেট খেলা দেখছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি ও শ্যালক বেতার। দুটি মোটরসাইকেলে পাঁচজন এলেও তিনজন বাইরে মোটরসাইকেলের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। দু’জন এগিয়ে এসে এমপির কাছে জরুরি কথা বলতে চায়। এ সময় এমপি তাদের অপেক্ষা করতে বলে, একটু পরে সাক্ষাৎ দেবেন বলেও জানান।

পরে সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে ওই দু’জনের সঙ্গে কথা বলার জন্য লিটন বাইরের বৈঠকখানায় এলে তার স্ত্রী, শ্যালকও তার সঙ্গে যান। বৈঠকখানায় গিয়ে হত্যাকারীদের একজন এমপির স্ত্রীকে বলে, স্যারের সঙ্গে আমরা একান্তই ব্যক্তিগত কিছু কথা বলব। এ কথা বলার পর স্ত্রী ও শ্যালক পাশের ঘরে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর তারা গুলির শব্দ পেয়ে ছুটে আসেন। এমপি লিটনও ‘গুলি করে মেরে ফেলল’ বলে চিৎকার করে বৈঠকখানার পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরের উঠোনে ছুটে আসেন। এ সময় দু’জন গৃহপরিচারিকা ও স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বেতার ও বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল গুলির শব্দ পেয়ে ছুটে এসে দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে খুনিরা একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে বামনডাঙ্গার দিকে এবং অন্যটি পশ্চিম দিকের রাস্তায় চলে যায়।

এমপি লিটনের গাড়িচালক ফোরকান মিয়া জানান, তিনি গাড়ি নিয়ে খুনিদের পিছু নিয়েছিলেন। টেকানির মোড় চৌরাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আর খেয়াল করতে পারিনি দুর্বৃত্তরা কোন দিকে পালিয়ে গেল। গৃহকর্মী সাজেদুল বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় দেখি স্যারের সঙ্গে বৈঠকখানায় দুই যুবক বসে আছে। সেখানে গেলে তারা আমাকে পান আনতে বলে। পান নিয়ে ফেরার পথে গুলির শব্দ পাই। পরে বুঝেছি হত্যাকারীরাই কৌশলে আমাকে পান আনতে পাঠিয়েছিল।

বাড়িতে নেই সিসিটিভি ক্যামেরা: সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে অন্তত ১৩ কিলোমিটার দূরে সর্বানন্দা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করতেন লিটন। তার বাসার বাইরে ও ভেতরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। খুনিরা পরিকল্পিতভাবে এসব জেনেই কৌশলে বাসায় ঢুকে তাকে গুলি করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, এমপি লিটন থানাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়েছেন; কিন্তু নিজের বাসায়ই তা লাগাননি।

ময়নাতদন্ত: এমপি লিটনের মরদেহের ময়নাতদন্ত গতকাল সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজের (রমেক) হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাংসদের বুকের ডান দিকে একটি গুলি বিদ্ধ হয়ে তা বেরিয়ে যায়। ভেতরে থাকা আরেকটি গুলি বের করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বাঁ হাতে তিনটি গুলি লাগে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন শিগগিরই দেওয়া হবে।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...







Editor: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.