বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বোরকা-হিজাব আপনাকেও পরতে হবে: শেখ হাসিনাকে অজয় রায়

হেফাজতে ইসলামের চাওয়া অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ে ‘সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন’ আনা হয়েছে মন্তব্য করে এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন অধ্যাপক অজয় রায়। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় প্রধানমন্ত্রীকেও বোরকা, হিজাব পরে বেরোতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

রোববার বিকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন আয়োজিত ‘সংকটের আবর্তে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর’ শিরোনামের আলোচনা সভায় একথা বলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, “সরকারকে আমরা সমুচিতভাবে বলতে চাই, আপনাদের মধ্যে যারা হেফাজতি আছে তাদের চিহ্নিত করুন, শাস্তি বিধান করুন এবং জনসমক্ষে দাঁড় করান। নইলে বাংলাদেশকে আপনারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। একদিন… বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, আপনাকেও বোরকা পরতে হবে, আপনাকেও হেজাব পরতে হবে। এই হেফাজতিরা আপনাকেও ছাড়বে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলে রেহাই দেবে না।”

পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু বা বাঙালি নামের এবং ধর্মনিরপেক্ষ-উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত মুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি। এজন্য দায়ী ব্যক্তি, বোর্ড ও কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান অজয় রায়।

বইয়ে কোনো মুদ্রণজনিত ভুল হলে সেটা মেনে নেওয়া যেত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু যখন সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটবে তখন সেটাকে আমরা রেহাই দিতে পারি না। হেফাজতে ইসলামের নির্দেশমতো সমস্ত বই রচিত হবে, আর আমরা সেটা এখন পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে শিশুরা পড়বে, এটা চলতে পারে না।”

হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “কী দুঃসাহসে তুমি রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রনাথ লাল রায়কে বাদ দাও? এতো ধৃষ্টতা তোমাদের কী করে হল?”

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, “বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বলতে চাই, আমার নাম করে বলতে চাই…অজয় রায় বলছি, আপনি হেফাজতিকরণ বন্ধ করুন এবং হেফাজতিকরণের মাধ্যমে যেসব পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো প্রকাশ বন্ধ করুন এবং এর আর্থিক ক্ষতি হেফাজতের কর্ণধারদের কাছ থেকে আদায় করুন।”

আলোচনা সভায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “এবারের বইয়ে প্রথমত দেখলাম ভুল-ত্রুটিগুলো থেকে গেছে, তারপরে যেটা আমাদের নজরে আসল তাতে মনে হয়েছে রাতের অন্ধকারে সুনামি ঘটে গেছে। সেই সুনামি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। সেই জায়গায় আমরা শুধু হতভম্ব নই, একেবারে হতবাক হয়ে গেছি… কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে.. কী জন্য ঘটল? এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করা হল, কেউ দায় নিচ্ছেন না। এ পরিবর্তনগুলো কী করে ঘটল? এই যে ১৭টি লেখা বাদ দেওয়া হল, তার মধ্যে ১৫ জন লেখক মূলধারার সম্প্রদায়ের না হওয়ায় বাদ দেওয়া হল।”

এই আদর্শিক বিচ্যুতি কোনোভাবে গ্রহণ করা যায় না মন্তব্য করে গণসাক্ষরতা অভিযানের  নির্বাহী পরিচালক বলেন, “এটার দায় নিচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল একটি চক্র, যারা যুদ্ধাপরাধীদের দোসর, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্বীকার করেনি, তারা দায় নিচ্ছে।”

এই প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে হেফাজত নেতার বক্তব্য তুলে ধরেন রাশেদা কে চৌধুরী। “তারা দায় নিচ্ছে, গর্ব করে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছে যে, এগুলো অনৈসলামিক।”

কওমী মাদরাসাগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে না আনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পৃথিবীর কোনো দেশে সরকারি আইনি কাঠামোর আওতায় আনা যাবে না, এমন কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা নাই। কিন্তু আমাদের নীতি-নির্ধারকরা বলেন, ওখানে হাত দেওয়া যাবে না। তাহলে সংবিধান কী জন্য? ”

ভোটের জন্য পাঠ্যপুস্তকে এই পরিবর্তন আনা হলে তা আওয়ামী লীগকে কোনো সুবিধা দেবে না বলে মনে করেন রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল কীভাবে বিশ্বাস করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলের দোসররা তাদের ভোট দেবে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতাকারীরা তাদের ভোট দেবে? এটা যদি তারা বিশ্বাস করেন, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।”

এজন্য দায়ীদের শাস্তির আওতায় না আনা গেলে হলি আর্টিজান ক্যাফেতে জঙ্গি হামলার মতো ঘটনা ঠেকানো যাবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

পাঠ্যপুস্তকে এই পরিবর্তনের জন্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “পাকিস্তান আমলে যে শরীফ খান কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন করে রুখে দিয়েছিল, এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামধারী সরকার হেফাজতের কথায় সেটা বাস্তবায়ন করল।” ধর্মের রাজনীতি কেবল জামায়াত নয়, বামরা ছাড়া ‘বাংলাদেশের সব কটি রাজনৈতিক দল করে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তার একটি প্রমাণ এবারের পাঠ্যপুস্তক।”

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষিত লোক পাননি মন্তব্য করে সৈয়দ আনোয়ার বলেন, “একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন আবুল ফজল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের বেয়াদবির কারণে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। আর কেউ কিন্তু শিক্ষিত নন। এখন বলবেন, শিক্ষিত বলতে আমি কী বুঝাচ্ছি?

এই বক্তব্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বিদ্যা সহজ, শিক্ষা কঠিন। বিদ্যা আবরণে, শিক্ষা আচরণে। এই আচরণ শব্দটা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক কিছু বুঝিয়েছেন। মানুষের মানবিকতাবোধ, মানুষের মনুষ্যত্ববোধ, তার যোগ্যতা-দক্ষতা মিলে আচরণ প্রকাশিত হয়। সেই রকম মন্ত্রী আমরা পাইনি। সবাই রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্বটা পেয়েছেন শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত।”

এ যাবৎ যতগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে, একমাত্র কুদরতে খোদা শিক্ষা কমিশন ছাড়া কোনোটি শিক্ষা কমিশন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, “এর প্রমাণ তার প্রতিবেদনগুলো। এর মধ্যে একটিতে আমিও সম্পৃক্ত ছিলাম ১৯৯৭ সালে। কিন্তু প্রতিবেদনের সঙ্গে আমি একমত হইনি। সর্বশেষ শিক্ষা কমিশনে যারা ছিলেন তাদের সবাই নমস্ব, প্রীতিভাজন, শ্রদ্ধাভাজন। কিন্তু তাদের কেউ কোনোদিন শিক্ষা নিয়ে ভাবেননি, বলেননি, লেখেননি। তাহলে তারা শিক্ষা নিয়ে কী বলবেন?”

সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানা কথা বলা হলেও শিক্ষানীতি অনুপস্থিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষানীতির মধ্যে গুণগত পরিবর্তন আছে সেটা বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের। কিন্তু তারা তা বোঝেন না।”

শিক্ষা ব্যবস্থাপনার রাজনীতিও সংকট তৈরি করছে মন্তব্য করে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, “পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বলা হচ্ছে মেধার বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু ভালো ফল করার শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তখন আমরা দেখি তারা ইংরেজিও জানে না, বাংলাও জানে না। বৈশ্বিক ব্যাপারতো না-ই। কিন্তু আগেতো এমনটি হত না। এখন ভর্তি পরীক্ষায় এভাবে ফেল করছে কেন? ভালো ফল দেখিয়ে আত্মপ্রসাদ পেতে হবে এটাও একটা সঙ্কট।”

তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে সরকার জামায়াত-হেফাজত তোষণ করছে। এক সময় গরম হয়েছিল এখন নরম হয়ে আছে। অর্থাৎ চোখের অন্তরালে হেফাজত তোষণ চলছে। অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তার মধ্যে মুদ্রণ প্রমাদ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সঙ্কটের হচ্ছে আদর্শ বিচ্যুতি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে আমার শিশুদের আমি কী শেখাচ্ছি?”

ঐক্যন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, “বঙ্গবন্ধুকন্যার শাসনামলে আমরা মোশতাকের শাসনামল দেখছি। তাদের সময়ে হেফাজত যা ইচ্ছা তা করার সুযোগ পাচ্ছে। তারা বিনাযুদ্ধে জয়ী হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জাতীয় অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে গেছি আমরা।”

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সদস্যসচিব নূর মোহাম্মদ তালুকদার, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বক্তব্য দেন।

আরও পড়ুন