বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭
বিশেষ নিউজ

জেনে নিন ব্রিটিশ এমপিদের জীবন কিভাবে চলে


NEWSWORLDBD.COM - June 6, 2017

মোস্তফা মামুন, লন্ডন থেকে।

সেদিন স্টিভেন টিমসকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতাটা বর্ণনা করেছিলাম। একাকী, ব্যাগ কাঁধে এমপির প্রচারণা চালাতে আসা চমকে দিয়েছিল।

বিদায়ের সময়ের অভিজ্ঞতাও কম চমকের নয়। কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর বললেন, ‘তুমি যাবে কিভাবে?’
‘টিউবে। ’

‘চলো তোমাকে এগিয়ে দিই। ’

‘দরকার নেই। আমি একাই এগিয়ে যেতে পারব।’

কিন্তু একা এগোনো গেল না। সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর এলেন। টিউব স্টেশনের কাছাকাছি এসে সার্কেল লাইন না নর্দান লাইন কোনটা ধরতে হবে, সেই লাইনের গাড়িগুলোর রং কী সেটাও এমন বিস্তারিতভাবে বোঝানো শুরু করলেন যে মাঝেমধ্যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না এই মানুষটি একসময় দেশের দাপুটে মন্ত্রী ছিলেন এবং ৮ তারিখ লেবার পার্টি নির্বাচন জিতলে মন্ত্রী হবেন আবার। স্টিভেন টিমস টিউব নিতে গিয়ে এত কিছু জানেন, এর একটা কারণ তিনি নিজে টিউবে চড়েন। সেদিনও এসেছিলেন টিউবে চড়ে। গাড়ি কোথায় রেখে এসেছেন এই প্রশ্নে বললেন, ‘গাড়ি না। আজ আমি টিউবে চড়ে এসেছি। ’

‘টিউব কেন?’

‘একটা সুবিধা তো আছেই। টিউবে এলে মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। মানুষের সঙ্গে থাকা যায়। তবে হ্যাঁ, সেটা একমাত্র কারণ নয়। গাড়িতে এলে জ্যামে সমস্যা হয়। ’

ও আচ্ছা, এখানে তো আবার এমপি-মন্ত্রীদের গাড়িটাড়ি নিয়ে উল্টা লাইনে আসার সুবিধা নেই। ট্রাফিকও ‘স্যার, স্যার’ বলে সবাইকে আটকে তাঁকে ছেড়ে দেবে না। তাই সাবেক পরিবহনমন্ত্রী গণমানুষের পরিবহনে গণমানুষের সঙ্গে দিব্যি চলাচল করে চলছেন। বিদেশি সাংবাদিককে নির্বিঘ্নে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন নিজের নির্বাচনী এলাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে। মাঝেমধ্যে দুয়েকজন তাঁকে চিনতে পারছে। ‘হাই স্টিভেন’ বলে হাত বাড়াচ্ছে। অনেকে আবার পাত্তাও দিচ্ছে না। একজন একবার এগিয়ে এসে বলল, ‘স্টিভেন, তোমাকে তো এবারও ভোট দিতে চাই। তা ভোটটা যেন কবে?’

‘আগামী সপ্তাহে। বৃহস্পতিবার। ’ এমপিকে ভোটের তারিখটাও জানিয়ে দিতে হয়।

একজন ব্রিটিশ এমপির সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা ছিল শুরু থেকেই। নির্বাচনী হালচাল জানার একটা উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু মূল কৌতূহল আসলে ব্রিটেনের একজন এমপির জীবনটা কেমন সেটা দেখা। অনেকবারের নির্বাচিত এবং গতবারের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া বলে স্টিভেন টিমস সেই হিসাবে আদর্শ মানুষ। কিন্তু সেই আদর্শ মানুষটি যে চমকের পর চমক দিয়ে এমন কাঁপিয়ে দেবেন কল্পনা করিনি। আবার মনে হয়, আসলে তিনি কোনো চমক দেননি। চমকটা আমাদের বাস্তবতা। কিন্তু এটায় আমরা এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে মানুষের ভোটে নির্বাচিত একজন এমপি মানুষের সঙ্গে চলাচল করলে আমাদের কাছে তা বিস্ময়কর। আমরা এত অস্বাভাবিক যে অন্য দেশের স্বাভাবিকতাই আমাদের অন্য রকম লাগে! আমরা খারাপ বলে সাধারণদের মনে হয় খুব বেশি ভালো।

স্টিভেন টিমস বা একজন ব্রিটিশ এমপির রাজনীতি ছাড়া আর কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য নেই বলে সারা দিন এ নিয়েই পড়ে থাকেন। তাঁর একটা দিন বা সপ্তাহ কেমন শুনে নিই তাঁর কাছ থেকেই, ‘পার্লামেন্ট সেশন থাকলে সোম থেকে বৃহস্পতি এই চার দিন পার্লামেন্টেই থাকি। সেখানে আলোচনা, বিতর্ক, নতুন আইন ইত্যাদি নিয়ে মিটিং করতে করতেই সময় চলে যায়। এরপর লাইব্রেরিতে পড়াশোনার ব্যাপার আছে। সংসদে ভালো করার জন্য, বিপক্ষের সঙ্গে বিতর্কে জেতার জন্য সবাইকে এই প্রস্তুতি নিতে হয়। ’ বাকি তিন দিনের মধ্যে শুক্রবার দিনটা তিনি বরাদ্দ রাখেন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে সমস্যা দেখার জন্য। তারপর শনিবার হচ্ছে সার্জারির দিন। ইস্টহাম টাউন হলে বসে অপেক্ষা করেন মানুষের জন্য। সার্জারি নামের এই আয়োজনে মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে আসে। শোনেন। সমাধানের চেষ্টা করেন।

‘কী সমস্যা নিয়ে আসে? চাকরি-বাকরি বা টেন্ডার এগুলো নাকি?’

‘না না। চাকরি-বাকরি তো আমার কাজ না। আর টেন্ডার মানে ঠিক কী?’

‘রাস্তাঘাট করার জন্য কাজ পাওয়া। ’

‘না। সেগুলো তো পুরোপুরি কাউন্সিলের কাজ। আমার কাছে আসে মূলত বাড়ি এবং ইমিগ্রেশন নিয়ে। হাউজিং এখানে একটা বড় সমস্যা। সবাই কাউন্সিলের একটা বাড়ি চায়। ছোট বাড়ি যারা পায় তারা বড় বাড়ি চায়। আর ইমিগ্রেশন একটা বড় সমস্যা। ধর বাংলাদেশি কেউ বিয়ে করেছে, এখন সে তার স্ত্রীকে নিয়ে আসবে। হোম অফিস দেরি করছে। আমার কাছে আসে, যেন আমি একটা ব্যবস্থা করে দেই। ’

‘আপনি ব্যবস্থা করে দিতে পারেন?’

‘ব্যবস্থা করাটা ঠিক নয়, আমার কাজ এর আইনগত ভিত থাকলে সেটা দেখে ওদেরকে পথ বাতলে দেওয়া। যদি দেখা যায় যে কোনো মানুষ আইন অনুযায়ী ওর পাওনাটা পাচ্ছে না তখন সেটা নিয়ে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলি। ’

‘আপনি বা একজন এমপিকে কি প্রশাসনের লোকজন ভয় পায়?’

‘না না, ভয় পাবে কেন? কিন্তু আমি বা কোনো এমপি কিছু রিকমেন্ড করলে সেটার একটা মর্যাদা থাকে। ওরা জানে এমপি তখনই করবে যখন এর আইনগত ভিত আছে। ’

ও। আচ্ছা। ভয় নয় বিশ্বাস। কারণ, ওরা জানে এমপি বা রাজনীতিকরা আইনগত ভিত্তি থাকলেই সুপারিশ করবেন। আমাদের এখানে যেমন এমপিরা যে আইনসভার সদস্য সেটাই আমরা ভুলে যাই। আইন এবং আইনের শাসনের সঙ্গে ঠিক ওদের মেলানোই যায় না! আইনের সঙ্গে তাঁদের বেশির ভাগের একটাই সম্পর্ক। তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে!

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে স্টিভেন টিমসের একাধিকবার দেখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলে থাকার সময় ইস্টহাম টাউন হলে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন সেই স্মৃতি রোমন্থন করলেন খুবই আনন্দ নিয়ে। টিউলিপ সিদ্দিকীর সোনালি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি নিশ্চিত। বাংলাদেশ ভ্রমণও করেছেন বেশ কয়েকবার। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। বাংলাদেশের এমপি-মন্ত্রীরা যে অনেক ধনী, একবার এমপি হলেই অনেক টাকা হয়ে যায় এটা কি তিনি জানেন? প্রশ্নে হাসতে হাসতে বললেন, ‘কিছুটা জানি। ’

‘তোমার কি কখনো মনে হয় এখানেও এ রকম হলে বেশ হতো। অনেক ক্ষমতা-অনেক টাকা। ’

‘না। আমি যা পাই তাতেই চলে। আর টাকার জন্য হলে তো আমি এমপি না হয়ে অন্য কিছু হতাম। আমি বা আমাদের রাজনীতিতে তারাই আসে যারা মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। এমপি হিসেবে আমি যা বেতন পাই সেটা খুব বেশি নয়, আবার খুব কমও নয়। এখানকার সাধারণ মানুষ যা রোজগার করে তার চেয়ে অনেক বেশিই। ব্যস, চলে যায়। ’

শুনতে শুনতে মনে হলো চক্রটা একটু অদ্ভুত। আমাদের এমপি বা জনপ্রতিনিধিরা ঠিক মানুষের সঙ্গে থাকেন না বলে বেশির ভাগেরই নির্বাচনে জেতার বিশ্বাস থাকে না। তাই কর্মী-ক্যাডার লাগে। তাদের জন্য আবার লাগে টাকা। সেই টাকার জন্য করতে হয় দুর্নীতি। আবার ক্ষমতা চলে গেলে দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হবে বলে কেউ ক্ষমতা হারাতে চায় না। তাই একেবারে মরিয়া হয়ে জেতার চেষ্টা। সেটার জন্য আবার বিপক্ষের সঙ্গে লড়াই। অস্ত্রবাজি। এখানকার ওরাও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া কিন্তু ক্ষমতা না পেলে দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে যাবে বলে কেউ মনে করে না। কারণ ক্ষমতা হারানো মানেই সব হারানো নয়। মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো নয়। স্টিভেনের দল লেবার তো সাত বছর ধরে ক্ষমতায় নেই, তিনি তো দিব্যি আছেন। বললেন, ‘অবশ্যই ৮ তারিখ আমরা নির্বাচনে জিততে চাই। আমরা কাজ করছি। কিন্তু মানুষ যা রায় দেবে সেটা মেনে নিতে তো হবে। ’ বিপক্ষ টোরিদের সম্পর্কে মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘ওদের নীতি ভয়ংকর। এবার কী যে জঘন্য একটা মেনিফেস্টো দিয়েছে। আমি তো চাই নির্বাচনে ওদের কয়েকজন মন্ত্রী চরমভাবে বিপর্যস্ত হোক। ঠিক সেটা ওরাও চায়। কিন্তু সেই পর্যায়ের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ আমাদের মধ্যে নেই। ’

এই এত কিছুর মধ্যে স্টিভেন বা ব্রিটিশ এমপিদের একটা জিনিস আছে, যেটা বাংলাদেশের এমপিদের নেই। ওরা প্রত্যেকে নির্বাচনী এলাকায় একটা অফিস পান। ঠিক সরকারি অফিস নয়, তবে একটা বাজেট দেওয়া আছে সেই ব্যয়সীমার মধ্যে কয়েকজন স্টাফসহ একটা অফিস নিতে পারেন তাঁরা। এতক্ষণ কথা বলার সময় এই প্রথম একটা জায়গা পাওয়া গেল যেখানে সুবিধার দিক দিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিকরা এগিয়ে। শুনে মনে হলো, এই জায়গাটা পড়লে আমাদের এমপিদের মনে হবে আরে আমরা কত বঞ্চিত! ঠিকই হয়তো ব্রিটিশ এমপিদের দোহাই দিয়ে শুরু হবে অফিসের আন্দোলন। ‘ওরা পায়। আমরা পাব না কেন? গণতন্ত্রের আদিভূমিতে আছে, আমাদের না থাকলে কিভাবে চলবে!’

চাওয়ার আর পাওয়ার বেলায় সব সময় বিদেশ-বিলাত আমাদের রাজনীতিকদের উদহারণ। দেওয়ার বেলায়? সেখানে ব্রিটেন-বিদেশের প্রশ্ন এলে তাঁদের উত্তর হবে খুব সম্ভব এরকম—ওরা উন্নত দেশ। কত বছরের গণতন্ত্র। আমাদের পক্ষে তো এখনই এসব সম্ভব নয়। একটু ধৈর্য ধরুন। একদিন সব হবে!

আহ! সেই একদিন যে কবে হবে যেদিন আমাদের এমপি-মন্ত্রীরা গণমানুষের বাসে উঠে ধাক্কা খেয়ে বলবেন, এই আমার মানুষ। এদের জন্যই আমি।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Chief Editor & Publisher: Advocate Golzer Hossain

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
Sonartori Tower, Banglamotor
Dhaka-1205, Bangladesh.