বৃহস্পতিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৭
বিশেষ নিউজ

সেদিন হাসিনা ও রেহানার পাশে ছিলেন যারা


NEWSWORLDBD.COM - August 15, 2017

বিশেষ প্রতিনিধি: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাও বন্ধুত্বের প্রমাণ পেয়েছিলেন, চিনেছিলেন সুযোগ সন্ধানীদের। কথায় বলে বিপদে মেলে সত্যিকারের বন্ধুর পরিচয়।

১৫ আগস্টের কাল রাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার পরিবারের চিরচেনা মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গিয়েছিলেন। যেসব লোক বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছিলেন তারাও রাতারাতি বদলে গিয়েছিলেন। এদেরই একজন ছিলেন বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। তবে সেই সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে আগলে রেখেছিলেন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, যাকে পরে স্পিকার বানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। প্রয়াত এই কূটনীতিকই পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে ভারতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লেখা স্মৃতিকথা, নিবন্ধ ও ভাষণ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারকে বেলজিয়াম পেয়ে সানাউল হক ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। তার বাসায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ওই দিন রাত ৩টা পর্যন্ত সানাউল হকের স্ত্রী ও মেয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার সঙ্গে আড্ডা দেন।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর সবার আগে পৌঁছেছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে। ওয়াশিংটন সময় বিকেল ৩টা। লন্ডনে তখন রাত ১২টা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর দেশের বাইরে যেসব বাংলাদেশি কূটনীতিক পান তাদের মধ্যে লন্ডন মিশনের কূটনীতিকরা অন্যতম। লন্ডন মিশনের খবর পেয়ে ফারুক চৌধুরী খুব ভোরে এই দুঃসংবাদটি জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানান। তার ধারণা ছিল, ড. ওয়াজেদ মিয়া তার পরিবার নিয়ে এ সময় জার্মানিতে অবস্থান করছেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী খবর পেয়ে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সানাউল হককে ফোন করেন এবং ফারুক চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ তাকে জানান এবং শেখ হাসিনা ও অন্যদের জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী লিখেছেন, সানাউল হক তাতে রাজি হলেন না। তিনি আরও লিখেছেন, সানাউল হকের কথায় মনে হচ্ছিল, তিনি শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের পারলে তখনই বাড়ি থেকে বের করে দেন।

গত বছর জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ওই ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, আমরা যেন তার জন্য বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ শেখ মুজিবই তাকে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়েছিলেন। ওটা একটা রাজনৈতিক নিয়োগ ছিল। ওই খবর পাওয়ার পরে জার্মানি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি দিতেও অস্বীকার করেছিলেন তিনি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহজাবিন চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সেই রাতে সানাউল হক ঘুম থেকে জেগে উঠে তাদের (বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে) বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং দু’বোনকে তার বাসভবন ছেড়ে যেতে বলেন।’

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পুত্র নোমান রশীদ চৌধুরী এক নিবন্ধে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে : পশ্চিম জার্মানিতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত ওয়াই কে পুরীর সঙ্গে আমার বাবার দেখা হয়েছিল একটা কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে। তিনি পুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, ভারত কি শেখ হাসিনা আর তার পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারবে? তিনি খোঁজ নিয়ে জানাবেন বলেছিলেন। পরের দিন পুরী আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে তার দফতরেই চলে আসেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটা অনেক সময়সাপেক্ষ। তিনিই পরামর্শ দিয়েছিলেন, দিল্লিতে তো বাবার নিজেরই অনেক চেনাশোনা, কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সেখানে মিশন প্রধান ছিলেন তিনি। ইন্দিরা গান্ধী আর তার দুই পরামর্শদাতা ডিপি ধর এবং পিএন হাক্সর তো বেশ পছন্দ করেন। তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন পুরী।”

তার সামনেই হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ডিপি ধর এবং পিএস হাক্সরকে ফোন করেন। কিন্তু দু’জনই সে সময় ভারতের বাইরে। সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করতে চৌধুরী একটু ইতস্তত করছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী আর হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের আগে ও পরে কিছু দিন দিল্লিতে বাংলাদেশের মিশন প্রধান ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। সে সময় ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বছর তিনেক তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না। রাজনীতিতে তিন বছর অনেকটা লম্বা সময়। তা ছাড়া ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। ইন্দিরা গান্ধী নিজেই বিপাকে।

নোমান রশীদ চৌধুরী লিখেছেন, যখন কোনো দিক থেকেই কিছু হচ্ছিল না, তখন একরকম শেষ চেষ্টা করে দেখার জন্য বাবা ইন্দিরা গান্ধীর দফতরে একদিন ফোন করেই ফেললেন। ওই নম্বরটা বাবাকে ভারতের রাষ্ট্রদূত মি. পুরী দিয়েছিলেন। বাবা আশা করেননি ফোনটা টেলিফোন অপারেটরের পরে অন্য কারও কাছে যাবে! কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই ফোনটা ইন্দিরা গান্ধী নিজেই তুলে ছিলেন। বাবা ইন্দিরা গান্ধীকে গোটা বিষয়টা খুলে বললেন। তখনই বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছিলেন তিনি।”ইন্দিরা বলেছিলেন, ‘ওদের এখনই আমার কাছে পাঠিয়ে দেন।’

জার্মানিতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত পুরী ১৯ আগস্ট হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানিয়েছিলেন, দিল্লি থেকে নির্দেশ এসেছে শেখ মুজিবের দুই কন্যা এবং তাদের পরিবারকে সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। ২৪ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে শেখ হাসিনা তার পরিবারের বাকিরা দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নেমেছিলেন। ভারতের মন্ত্রিপরিষদের একজন যুগ্ম সচিব তাদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে হাজির ছিলেন। প্রথমে ৫৬ নম্বর রিং রোডের একটি ‘সেফ হাউস’-এ তাদের রাখা হয়েছিল। পরে ডিফেন্স কলোনির একটি বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের।

দশ দিন পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় ইন্দিরা গান্ধীকে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ১৫ আগস্ট ঠিক কী হয়েছিল?” সেখানে উপস্থিত একজন অফিসার শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, তার পরিবারের আর কেউ জীবিত নেই। এটা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার জীবনীকার সিরাজউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ইন্দিরা গান্ধী হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তোমার যা ক্ষতি হয়েছে, তা তো পূরণ করা যাবে না। তোমার তো এক ছেলে, এক মেয়ে আছে। আজ থেকে ছেলেকে নিজের বাবা আর মেয়েকে নিজের মা বলে মনে কোরো।”

সিরাজউদ্দিন আহমেদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকালে ওই একবারই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তবে কেউ কেউ দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল। একপর্যায়ে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং তার পরিবার শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখতেন। শেখ হাসিনার সন্তানদের মাঝে মাঝেই প্রণব মুখার্জির সরকারি বাসভবনে খেলতে দেখা যেত।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Chief Editor & Publisher: A. K. RAJU

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: 9635272, 01787506342

©Titir Media Ltd.
39, Mymensingh Lane (2nd Floor), Banglamotor
Dhaka, Bangladesh.