বৃহস্পতিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » বিদেশ » রোহিঙ্গা যুবকরা ‘মুক্তিযুদ্ধে’: নারী-শিশু-বৃদ্ধরা আসছে বাংলাদেশে
বিশেষ নিউজ

রোহিঙ্গা যুবকরা ‘মুক্তিযুদ্ধে’: নারী-শিশু-বৃদ্ধরা আসছে বাংলাদেশে


NEWSWORLDBD.COM - August 30, 2017

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, টেকনাফ সীমান্ত থেকে:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এতোদিনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে সেখানকার যুবকরা। এতোদিন পালিয়ে বেড়ালেও এখন অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়াচ্ছেন রোহিঙ্গারা।

সেনা অভিযানে অন্তত ৮০ বিদ্রোহীসহ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা রোহিঙ্গা নির্যাতনের পর এবার মিলছে প্রতিরোধের আভাস। ২৫ আগস্ট ভোরে বিদ্রোহীরা অন্তত ৩০টি পুলিশ ও সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালায়। আইনশৃংখলা বাহিনীর অন্তত ১২ জন সদস্য তাতে নিহত হন। এরপর থেকে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় নিপীড়ণ ও নির্যাতন।

সীমানা পেরিয়ে আবারো দলে দলে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন রোহিঙ্গারা। তবে বরাবরের মতোই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ফেরত পাঠাচ্ছে রোহিঙ্গাদের। ফলে নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছেন শত শত রোহিঙ্গা।

তবে এবার শরণার্থীদের ঢলে একটু পরিবর্তন দেখছেন বিজিবি সদস্যরাও। অন্যান্যবার পুরো পরিবারসহ রোহিঙ্গারা পালিয়ে এলেও এবার শরণার্থীদের দলে পুরুষদের সংখ্যা একেবারেই কম বলে জানিয়েছেন বিজিবি কর্মকর্তারা।

‘‘পুরুষদের কী হয়েছে, আমরা তাদের (রোহিঙ্গা নারীদের) জিজ্ঞেস করেছিলাম৷ আমাদের জানানো হয়েছে লড়াই করার জন্য পুরুষরা রয়ে গেছে,” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সীমান্তে আসা রোহিঙ্গা নেতা শাহ আলম জানান, আশেপাশের তিন গ্রাম থেকে অন্তত ৩০ জন যুবক ‘স্বাধীনতার যুদ্ধে’ যোগ দিয়েছে এআরএসএতে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘তাদের কীই বা করার ছিল! পশুর মতো খুন হওয়ার চেয়ে লড়াই করে মারা যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন তাঁরা।”

সাজিদা বেগম (২১)। মিয়ানমারের মংডুর রাচিডং এর আনাফ্রা গ্রামের বাসিন্দা এই নারী স্বামী নুর হোসেনকে রেখে চার বছরের শিশুপুত্র নুর হোসেনকে নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে উখিয়ার বালুখালি সীমান্ত হয়ে প্রবেশ করেন বাংলাদেশে। এরপর থেকে আছেন কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পে সংলগ্ন আমতলি এলাকায়। সেখানে কথা হয় সাজিদার সঙ্গে।

সাজিদা বেগম এই প্রতিনিধিকে অকপটে বলেন, ‘আমার স্বামী মায়ানমারের পুলিশ-মিলিটারির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আলেকিন গ্রুপ আমার স্বামীকে লড়াইয়ে অংশ নিতে নিয়ে যায়। আমাকে ও আমার ছেলেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। স্বামী বেঁচে থাকলে দেখা হবে।’

সাজিদার সাথে মায়ানমান থেকে আসেন হামিদা বেগম, তাহেরা বেগম, আমিনা খাতুন, সফিয়া বেগম, নুরুন্নাহার, আয়েশা খাতুন, রহিমা বেগমসহ শতাধিক নারী। তারা সবাই তাদের স্বামীদের মায়ানমারে রেখে শিশু সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন।

মায়ানমারের ঢেকুবনিয়া থেকে আসা হামিদা বেগম বলেন, মায়ানমারের ঢেকুবনিয়া, রাইমংখালী, মেদি, কুমিরখালি, উইংচিপ্রং এলাকায় আরাকানি যুবক মুসলিমরা মায়ানমারের পুলিশ-মিলিটারির সাথে লড়াই করছে। লড়াইয়ে নিয়োজিত যুবকদের স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ মা বাবাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে।

উখিয়ার অনিবন্ধিত বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জামাল হোসেন ওরফে লালু মাঝি বলেন, ২৯ আগস্ট ভোর থেকে এখানে প্রায় দুই হাজার নতুন রোহিঙ্গা ঢুকেছে।যুবকরা লড়াই করছে মায়ানমারে, বাংলাদেশে ঢুকছে নারী-শিশুরা

এদের একজন মংডুর ছালিয়াপাড়া থেকে আসা জাফর আলমের পুত্র শামসুল আলম। তিনি জানান, তার চার ভাই নুরুল আলম, সলিম উদ্দিন, মাহমদুল হক ও নুরুল আমিন মায়ানমারের পুলিশ-মিলিটারি বাহিনীর সাথে লড়াই করছে। বৃদ্ধ মা বাবা আর নারী শিশুদের বাঁচাতে তাদের সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন সেও লড়াই করতে মায়ানমারে যাবেন।

মংডুর গৌরি পাড়া থেকে আসা নুরুল আলম (৬৫) জানান, মায়ানমারে মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করার সময় আলেকিন’র সদস্য সাইফুল আমিন নামে এক ‍যুবক গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ সাইফুলকে বালুখালি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়। তাকে কক্সবাজারের এক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বৃদ্ধ নুরুল আলমের ছেলে নুরু আমিন মিয়ানমারের আবু ওমর পার্টির হয়ে আবু বক্করের নেতৃত্বে লড়াই করছে।

খবর নিয়ে জানা যায়, ঘুমধুমের তমরু পাথরকাটা ও বালুখালী রহমতে বিল সীমান্তের জিরো পয়েন্টে দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এদের অধিকাংশ হচ্ছে নারী, বৃদ্ধ ও শিশু। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে বিজিবির চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা।

বালূখালির রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সহযোগী মাঝি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এবারে মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কঠোর মনোবল লক্ষ্য করা গেছে। মিয়ানমারে এবার তাদের জয় হবে এমন প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা।’

টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক মেজর শরিফুল ইসলাম জমাদ্দার বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জোরদার করা হয়েছে টহল। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য। সীমান্তে সর্বদা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। গত দুই দিনে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ১ হাজার ৪৪ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত অক্টোবর হামলার দায় স্বীকারের পর থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠেছে আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি আর্মি (এআরএসএ)। দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত নির্যাতনের শিকার হলেও সাধারণ রোহিঙ্গারা এতদিন সহিংসতা এড়িয়ে চলছিল৷ কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে এবং চলমান সেনা অভিযানের পর সাধারণ রোহিঙ্গারাও হাতে তুলে নিচ্ছেন অস্ত্র।

মিয়ানমারের নেতা অং সান সুচি এআরএসএকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন বলে উল্লেখ করেছেন৷ সংগঠনটির বিরুদ্ধে শিশু যোদ্ধা ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তিনি৷ তবে এআরএসএ এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে৷

আনুষ্ঠানিকভাবেই এখন বিশ্বজুড়ে এআরএসএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিয়েছে মিয়ানমার সরকার৷ কঠোর বিবৃতি এবং এআরএসএর গুলিতে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের ছবি প্রকাশ করে বিশ্বে জনমত গড়ে তোলারও চেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমার৷

কিন্তু পালটা প্রচার চালাচ্ছে এআরএসএ-ও৷ শুধু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছেও পৌঁছে গেছে যুদ্ধের ডাক৷

এআরএসএ বিদ্রোহীদের ভারী অস্ত্র বলতে কিছুই নেই৷ এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে ছুরি, ঘরে তৈরি বোমা এবং আগ্নেয়াস্ত্র৷ ফলে মিয়ানমারের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে কতটুকু টিকতে পারবে বিদ্রোহীরা, সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে৷

কিন্তু তাতে দমছেন না রোহিঙ্গারা৷ ‘‘আমাদের শত শত যোদ্ধা পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে৷ আমরা আরাকানকে রক্ষায় শপথ নিয়েছি, সেটা চাকু এবং লাঠি দিয়ে হলেও আমরা করবো,” সীমান্তে এএফপিকে জানিয়েছেন এক রোহিঙ্গা যোদ্ধা।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Chief Editor & Publisher: A. K. RAJU

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: 9635272, 01787506342

©Titir Media Ltd.
39, Mymensingh Lane (2nd Floor), Banglamotor
Dhaka, Bangladesh.