রবিবার ১৯ নভেম্বর ২০১৭
বিশেষ নিউজ

দক্ষিণ আফ্রিকায় মুশফিকের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি


NEWSWORLDBD.COM - October 16, 2017

স্পোর্টস করেসপন্ডেন্ট: তাঁর সময়টা ছিল দীর্ঘশ্বাসে বড় বেশি ভারাক্রান্ত। তাঁর দুঃখের সাগরে হুহু করে ঢুকছিল নোনা জল। তাঁর মনের মাটি খুব নরম বলে সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে জমে ছিল কাদা।

কিন্তু টেস্ট সিরিজ-পরবর্তী সেই নানা ঘটনাপ্রবাহে যে নিয়তির কপালে কপাট ঠেকিয়ে বসে থাকবেন, মুশফিকুর রহিম তো তেমন কেউ নন! তিনি বরং অদৃষ্টের ভাগ্যলিপি লেখেন নিজ হাতে। কাল এর পুনরাবৃত্তিতে পেছনে পড়ে তাঁর বিবর্ণ বর্তমান। আর আগুনে পোড়ে ইতিহাসের পুরনো পাতাগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান পায় যে বাংলাদেশ!

চাপে ছিলেন মুশফিক। প্রবল চাপে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই টেস্টে দলের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সের কারণে। আবার সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সত্য ভাষণের জন্যও। ওতে ভীষণ রুষ্ট ক্রিকেট কর্তারা।
পরের টেস্টে বাংলাদেশের নতুন অধিনায়ক খোঁজারও চলছে তোড়জোড়। দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া মুশফিক তাই ভীরু কুঁড়ির মতো এতটুকুন হয়ে ছিলেন। কালকের ইনিংসের পর এখন তিনি নতুন বাতাসে ফুটে ওঠা ফুল। আর ইতিহাসের তো সাক্ষ্য আছেই, আহত হলেই বরাবর উদ্দাম হয়ে ওঠে মুশফিকের ব্যাট।

২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটির কথা মনে করুন। ওয়ানডে ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব তাঁর কাছ থেকে নিয়ে দেওয়া হয় মাশরাফি বিন মর্তুজাকে। ব্যাপারটি ভালোভাবে নেননি মুশফিক। এর প্রভাব ব্যাটসম্যান মুশফিকের ওপর পড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা। সেই শঙ্কা তাড়িয়ে দিতে একদমই সময় নেননি তিনি। পাঁচ ম্যাচে ৪২.৬০ গড়ে সর্বোচ্চ ২১৩ রান করে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কারজয় এর প্রমাণ। আবার টেস্ট থেকে উইকেটকিপিং ‘কেড়ে’ নেওয়ার ব্যাপারটি দেখুন। উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যাটিং করে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে পর পর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন। কিন্তু ‘ব্যাটসম্যান মুশফিককে পাওয়ার জন্য’ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে কিপিং থেকে ‘ছুটি’ দেওয়া হয় তাঁকে। মুশফিকের প্রতিক্রিয়া? ৮৫ রানের ইনিংস।

কাল তাই তাঁর সেঞ্চুরিটি চমক হয়ে আসেনি মোটেই।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ব্যাটসম্যান মুশফিককে পাওয়া যায়নি সেভাবে। তাঁর অধিনায়কত্বে টিম ম্যানেজমেন্টের অনাস্থাতেই কিনা ব্যাটিংয়েও ছিল আস্থার অভাব। কাল পুরনো মুশফিক ফেরেন রাজসিক আভিজাত্যে। ১৪ ওভার শেষে ৬৭ রানে ২ উইকেট পড়ার পর ক্রিজে যান। এর পর থেকে তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত দলের ইনিংস। যেমনটা সূর্যকে ঘিরে আবর্তিত সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্ররা। ওই যে ১৫তম ওভারে ব্যাটিংয়ে নামেন মুশফিক, থাকেন ইনিংসের শেষ বলটি পর্যন্ত। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে ৫৯, মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গে ৬৯ এবং সাব্বির রহমানের সঙ্গে ৪২ রানের জুটিতে দলের স্কোর নিয়ে যান ৩০০-এর কাছাকাছি।

আর নিজেও কী অপূর্ব ব্যাটিংই না করেন! পর্বতের অটলতা আর সাগরের উচ্ছলতার যুগলবন্দিতে। আনদিলে ফেলুকওয়ায়োর করা প্রথম বলেই পরাস্ত হন, ওই ওভারেই তাঁর ব্যাটের কানায় লাগে বল। কিন্তু তাতে বিচলিত হন না মুশফিক। ড্যান প্যাটারসনকে তাই কাট করে চার মেরে দেন। একই বোলারের বিপক্ষে স্ট্রেইট ড্রাইভ মনে করিয়ে দেয় শচীন টেন্ডুলকারকে, নন-স্ট্রাইকার সাকিব ও স্টাম্পের মাঝ চিরে বল আছড়ে পড়ে বাউন্ডারির ওপারে। শুরুতে ঝামেলায় ফেলেন যে ফেলুকওয়ায়ো, তাঁকেও বেরিয়ে এসে ফ্ল্যাট ব্যাটে মারেন চার। স্পিনাররা আক্রমণে আসেন, মুশফিকের আসে-যায় না কিছুই। জেপি দুমিনিকে সুইপে আর ইমরান তাহিরকে রিভার্স সুইপে করেন সীমানাছাড়া। আর প্যাটারসনের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে কাভারের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে যেভাবে ফিফটিতে পৌঁছান, সেটি তো চোখজুড়ানো। গত কয়েক দিনের ক্রোধ যেন তাতে মিলেমিশে একাকার।

অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা আগের দিনই বলেছিলেন, থিতু হয়ে গেলে ইনিংস টেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা। অন্য অনেকে হয়তো তা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে বের করে দিতেন অন্য কান দিয়ে। কিন্তু মুশফিক মনে রাখেন। তাই তো ৫২ বলে ফিফটি করেই দায়িত্ব শেষ মনে করেন না। আর ততক্ষণে সাকিব আউট বলে তাঁর দায়িত্বটা যেন আরো বেশি। মাহমুদ, সাব্বিরের সঙ্গে ভীষণ কার্যকর দুটি জুটি গড়েন মুশফিক। আর তাঁর ব্যাটে দুমড়ে-মুচড়ে যেতে থাকে ইতিহাসের পাতাগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান ছিল মোহাম্মদ আশরাফুলের ৭৩। ২০০৮ সালে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে পচেফস্ট্রুমে সেই ইনিংস খেলেন তিনি। মুশফিক ছাড়িয়ে যান তা। তাহিরকে আরেক রিভার্স সুইপে আরো চার মেরে ছাড়িয়ে যান সব ধরনের ফরম্যাটে এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে করা সৌম্য সরকারের ৯০ রানও।

সামনে তখন মোক্ষ একটাই। সেঞ্চুরি!

মুশফিক ভড়কান না। নব্বইয়ের ঘরেও তাই তাহিরকে আবার রিভার্স সুইপ মারেন। তাঁকে ৯৮-তে রেখে সাব্বির আউট হয়ে গেলেও কাগিসো রাবাদার ঠিক পরের বলে দুই রান নিয়ে পৌঁছে যান অবিস্মরণীয় মাইলফলকে। শেষ পর্যন্ত ১১৬ বল খেলে ১১টি চার ও দুই ছক্কায় ১১০ রানে অপরাজিত থাকেন মুশফিক। তাতেই লড়াই করার মতো একটা পুঁজি তো অন্তত পায় বাংলাদেশ।

সব মেঘে বজ থাকে না। কিন্তু কাল মুশফিক আরেকবার প্রমাণ করেছেন, তাঁর মনের মেঘের থরে থরে সাজানো রয়েছে বজে র ঝংকার। যে হুংকার কাল শুনতে পায় কিম্বার্লির ডায়মন্ড ওভাল। ছয় হাজার মাইল দূরের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক মানচিত্রও কি শোনেনি তা?

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Editor-In-Chief & Publisher: AHM Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
43/B/1, East Hazipara, Rampura
Dhaka-1219, Bangladesh.