বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

এশিয়ার জৌলুসপূর্ণ চলচিত্র উৎসব টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

আরমান হোসেন টুটুল।।

টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রা আজ থেকে ৩২ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে। সেদিক থেকে এটি হচ্ছে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর একটি। তবে উৎসবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলচ্চিত্রানুরাগীদের কাছ থেকে যে উৎসাহ ও সাড়া মিলেছে, তাতে সন্দেহাতীতভাবেই এটি হয়ে উঠেছে এশিয়ার নেতৃস্থানীয় চলচ্চিত্র উৎসব। পুসান ও হংকং চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে আজকাল সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট আলোচনা হলেও সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্যায়ে উঠে আসতে আরও কিছুটা সময় মনে হয় প্রয়োজন।

১৯৮৫ সালে প্রথম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উন্মোচিত হয়েছিল তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উৎসাহিত করার মহৎ এক উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রথম সেই আয়োজনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের বদলে একটি মাত্র বিভাগে প্রতিযোগিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই বিভাগটি হলো ‘ইয়ং সিনেমা কম্পিটিশন’ বা ‘তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা পুরস্কার’। তবে দুই বছর পরের দ্বিতীয় আয়োজন থেকে আয়োজকদের দৃষ্টি অনেকটা সরে আসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার দিকে। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে এটি দ্বিবার্ষিক আয়োজনের বদলে বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসবে রূপান্তরিত হয়, যা উৎসবের আবেদনকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। বছর গণনার হিসাবে এ চলচ্চিত্র উৎসবের বয়স ৩২ বছর হলেও তৃতীয় উৎসব থেকে এটা বার্ষিক উৎসবে পরিণত হওয়ায় এবার ছিল এর ৩০তম আয়োজন।

মূল প্রতিযোগিতা বিভাগই হচ্ছে চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান আকর্ষণ এবং এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সুদূর মেক্সিকো থেকে শুরু করে বরফঢাকা দেশ আইসল্যান্ড হয়ে চীন ও জাপান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড থেকে ১৫টি ছবি বাছাই করা হয়েছিল উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা পর্বের জন্য। এসব ছবির মধ্য থেকে চার সদস্যের বিচারকমণ্ডলী সুইডিশ পরিচালক লুকাস মুডিসনের ছবি উই আর দ্য বেস্টকে সাকুরা গ্রাঁ প্রি পুরস্কারের জন্য বেছে নেয়। সমস্যাকবলিত তিনিটি পরিবারের স্কুলছাত্রী তিন বালিকার রক সংগীতের জগতে প্রবেশ হচ্ছে—এই হলো ছবির মূল বিষয়। পরিচালক লুকাস মুডিসনের নিজের ভাষায়, তাঁর এই ছবি হচ্ছে সেই রকম বাস্তবতা প্রকাশ করার ক্ষুদ্র এক প্রয়াস, যেটাকে তিনি বলেছেন ‘জীবন বিষ্ঠাময় হওয়া সত্ত্বেও একই সঙ্গে তা হচ্ছে উদ্ভট’।

কেন সেই ছবিকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের জন্য বেছে নেওয়া হয়, তার ব্যাখ্যা দিয়ে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতি বিচারক বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের জন্য এমন এক ছবির সন্ধানে আমরা ছিলাম, যা কিনা এক কথায় চমৎকার, সে রকম ছবি, যেখানে আছে শক্তির প্রকাশ, আবেগ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের চমৎকার এক প্রতিফলন। এই ছবি যে সে রকম সব কয়টি গুণের সঠিক এক সমন্বয়, সে বিষয়ে আমাদের মধ্যে কোনো রকম দ্বিমত ছিল না।’

গত বছরের চলচ্চিত্র উৎসবে চীনের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। চীনা প্রতিনিধিরা চীন-জাপান সম্পর্কের অবনতির কারণে উৎসবে যোগ দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। সেদিক থেকে এবারের উৎসব যেন ছিল দুই দেশের মৈত্রীর বন্ধন পুনরায় গড়ে ওঠার বার্তাবাহক। উল্লেখ্য, উৎসবের সভাপতি বিচারকও ছিলেন চীনের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক চেন কাইগে। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দেওয়া সংক্ষিপ্ত ভাষণের শেষে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘চলচ্চিত্র যে শান্তি আর ভালোবাসার প্রতিনিধিত্ব করে, আমার মনের সেই বিশ্বাসকে এই উৎসব আরও গভীর করে তুলেছে।’

অক্টোবরের ২৫ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ৩০তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ৩ নভেম্বর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এবারের উৎসবের জন্য ৯৩টি দেশ ও ভূখণ্ড থেকে রেকর্ডসংখ্যক এক হাজার ৪৬৩টি ছবি জমা পড়েছিল। এর মধ্য থেকে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৩০০ ছবি উৎসব চলাকালে প্রদর্শন করা হয়। ছায়াছবির প্রদর্শন ছাড়াও চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত কন্টেন্ট শিল্পের ভিন্ন এক প্রদর্শনীও উৎসব চলাকালে অনুষ্ঠিত হয়, জাপান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কন্টেন্ট ব্যবসায় জড়িত প্রতিষ্ঠান এখানে অংশ নিয়েছে।

এবারের উৎসবের জন্য ছবি জমা পড়েছিল ৮৮টি দেশ ও ভূখণ্ড থেকে ১৫০০টির বেশি। এর মধ্য থেকে যে ১৫টি ছবি আয়োজকেরা মূল প্রতিযোগিতার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলোর সব কটিতে কঠিন পরিস্থিতি পার হওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া মানুষের সাফল্য-ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেই সংগ্রামের শেষে সুখকর বিজয়ের দেখা মানুষ সব সময় পেয়েছে, তা অবশ্য নয়। মানুষের সংগ্রামকেই বরং এসব ছবিতে দেখানো হয়েছে পরাজয় মেনে নিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে বরং অনিশ্চিত সাগরে নৌকা ভাসানোর বলদর্পী বাসনার প্রতীক হিসেবে। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে আরও দুটি প্রতিযোগিতামূলক বিভাগ—এশিয়ান ফিউচার এবং জাপানি ছবির বেলাতেও কমবেশি একই ধারার প্রতিফলন দেখা গেছে।

এবারের উৎসবে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের টোকিও গ্রাঁ প্রি পুরস্কার পেয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন ও কাতারের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত তুরস্কের ছায়াছবি গ্রেইন। পরিচালক সেমি কাপলানোগ্লুর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ছোঁয়া থাকা বাস্তবধর্মী এই ছবি হচ্ছে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে খাদ্যসংকট থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার মহান ব্রত নিয়ে জিনগতভাবে রূপান্তর করে নেওয়া শস্যবীজের তল্লাশে থাকা এক বিজ্ঞানীর জীবনের নানা রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শরণার্থী সংকট থেকে শুরু করে পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো বৈশ্বিক সমস্যার প্রাণবন্ত এক বর্ণনা। পুরস্কার গ্রহণের জন্য মঞ্চে উপস্থিত হয়ে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পরিচালক বলেছেন, বহুমুখী যেসব জটিল সমস্যার মুখে আমাদের পড়তে হচ্ছে, সেগুলো সমাধান করে নিতে হলে যে প্রশ্ন নিজেদের করা দরকার তা হলো, কোথা থেকে আমরা এসেছি এবং কোথায় আমরা যাচ্ছি। ছায়াছবির শক্তি সেই সব প্রশ্ন করতে আমাদের সাহায্য করে এবং এটাই তাঁর ছবিতে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।

বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে ইতালির ছবি ক্রেটার। পরিচালক সিলভিয়া লুজি এবং লুকা বেলিনোর দ্বৈত পরিচালনার এই ছবি নাপোলির এক দরিদ্র পরিবারের দারিদ্র্যের নাগপাশ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টার গল্প। কন্যার সংগীতপ্রতিভা কাজে লাগাতে পিতার চালানো প্রচেষ্টা এবং পিতা-কন্যার সম্পর্কের চমৎকার এক বর্ণনা। শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক নির্দেশনার পুরস্কার পেয়েছে চীনের ছবি দ্য লুমিং স্টোর্ম।

তুরস্কের ছবি গ্রাঁ প্রি জিতে নিলেও এবারের উৎসবে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে মালয়েশিয়ার পরিচালক এডমন্ড ইয়োকে মানব পাচারের ওপর নির্মিত তাঁর কাব্যিক ছবি উই দ্য ডেড-এর জন্য। মালয়েশিয়া আর থাইল্যান্ডে আশ্রয়ের খোঁজে আসা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশার মর্মস্পর্শী বর্ণনা তুলে ধরা কাব্যিক এই ছবি একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বর্তমান দুরবস্থার পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝে উঠতে দর্শকদের সাহায্য করছে। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে রাখা বক্তব্যে পরিচালক এডমন্ড ইয়ো বলেছেন, ইতিহাসের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে নয়, বরং কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসার জন্যই এ রকম একটি কঠিন ও মর্মান্তিক বিষয়ের ওপর ছবি তিনি তৈরি করেছেন এবং তিনি আশা করছেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সম্পর্কে আরও বেশি জেনে নিতে তাঁর এই ছবি দর্শকদের অনুপ্রাণিত করবে।

উৎসব চলাকালে প্রতিবেদকের সুযোগ হয়েছিল মালয়েশিয়ার পরিচালক এডমন্ড ইয়োর মুখোমুখি হওয়ার। তাঁর কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, বিশেষ কোনো ঘটনা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে এই কাহিনিচিত্র নির্মাণে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে কি না। প্রশ্নের উত্তরে এডমন্ড ইয়ো বছর তিনেক আগে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিগৃহীত হওয়া এবং সেই এলাকাটিতে নিহত বেশ কিছু শরণার্থীর গণকবরের সন্ধান পাওয়ার সংবাদের উল্লেখ করে বলেছেন, তখন থেকেই তিনি মিয়ানমারের এই ভাগ্যহত জনগোষ্ঠীর ওপর ছবি তৈরি করার চিন্তা করে আসছেন। ছবিটি মিয়ানমারে দেখানোর ইচ্ছা তাঁর আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক বলেছেন, তিনি অবশ্যই তা চাইছেন, তবে মিয়ানমার সরকার সেই অনুমতি দেবে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

এবারে এশিয়ান ফিউচার বিভাগে পুরস্কার পাওয়া ছবিতেও মিয়ানমারের একটি শরণার্থী পরিবারের জীবনের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তবে সেই পরিবারটি হচ্ছে জাপানে আশ্রয় নেওয়া একটি বর্মি পরিবার। প্যাসেজ অব লাইফ নামের সেই ছবিতে জাপানি পরিচালক আকিও ফুজিমোতো চার সদস্যের একটি পরিবারের জীবনে অপ্রত্যাশিত কিছু প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়া ভালোবাসার বর্ণনা দিয়েছেন।

৩০তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে তৈরি প্রামাণ্য ছবি এন ইনকনভেনিয়েন্ট সিকুয়েল দেখানোর মধ্যে। সমাপনী অনুষ্ঠানে আল গোর নিজেও উপস্থিত ছিলেন।

এবারের উৎসবে পুরস্কার না পেলেও দর্শক-মন জয় করতে পারা একটি ছবি ছিল তরুণ ভারতীয় পরিচালক দেব মাধেকারের বায়োস্কোপওয়ালা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প কাবুলিওয়ালার কাহিনিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে তৈরি এই ছবিতে সময়ের বিবর্তনে রহমত কাবুলিওয়ালাকে দেখা যায় বায়োস্কোপওয়ালা হিসেবে আবির্ভাব হতে, কালের হিংস্র থাবা থেকে যে মুক্ত থাকতে পারেনি।

আরও পড়ুন