বৃহস্পতিবার ১৮ জানুয়ারী ২০১৮
বিশেষ নিউজ

বাংলাদেশে শিক্ষকরা একযোগে আন্দোলনে, নড়ছে না সরকার


NEWSWORLDBD.COM - December 30, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ—এই তিন স্তরে প্রায় ৯ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী আন্দোলন করছেন। তাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও হাসিনা সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই পেশাজীবী গোষ্ঠীকে ঠিকভাবে সামাল দিতে না পারায় কেউই এখন আর খুশি নয়।

বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষকের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো করার কথা বলা হয়। অথচ তা হয়নি। এর মধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন সময় স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো করার কথা বললেও তা আর এগোয়নি। সরকার কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই যখন যেটা সামনে আসছে, তখনই তা বিবেচনা করায় একধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকদের জন্য কিছু জটিলতা সরকারই সৃষ্টি করেছে। আবার শিক্ষকদের কিছু দাবি দীর্ঘদিনের, যা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে চাঙা হয়েছে।
বছরের শেষ সময়ে এখন বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও ভর্তির মৌসুম চলছে। নতুন বছরের শুরুতে বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হবে। এই অবস্থায় বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকেরা আন্দোলনে নামায় এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই আন্দোলন নিয়ে সরকারের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

অতীতেও দেখা গেছে, সরকারের শেষ সময়ে শিক্ষক সংগঠনগুলো মাঠে নেমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে নির্বাচনের আগেভাগে শিক্ষকদের আন্দোলন করে দাবি আদায়ের নজির রয়েছে। ভোটের রাজনীতির কারণেই ওই সময়গুলোতে সরকার নমনীয় হয়েছিল।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এই সরকারের আমলে শিক্ষকদের বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়েছে। সব শিক্ষকের বেতন সরকারি চাকুরেদের মতো দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিক পরিকল্পনা ছাড়াই যখন, যেটি সামনে এসেছে এবং সরকার চাপ অনুভব করেছে, তখনই সেটি মেনে নেওয়া হয়। এর ফলে এক অংশের শিক্ষকদের সঙ্গে আরেক অংশের বিরোধ সৃষ্টির মতো ঘটনাও ঘটছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বিরোধের প্রসঙ্গটি এসেছে। গত শনিবার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা ব্যবধান কমিয়ে বেতন স্কেল প্রধান শিক্ষকের এক ধাপ নিচে রাখার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের বৈঠকে মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড করার উদ্যোগ আপাতত স্থগিত রাখা হবে। এতে প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির ২৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক এবং পাঁচ বা ততোধিক সহকারী শিক্ষক থাকেন। সহকারী শিক্ষকেরা আন্দোলন করতে এসে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষকেরা মনে করছেন, সহকারী শিক্ষকদের কারণেই তাঁদের দশম গ্রেডে যাওয়ার উদ্যোগ থেমে গেল। এ নিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে।

এদিকে সরকারি বেতন-ভাতা বা এমপিওভুক্ত নয়, বাংলাদেশে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৫ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষক-কর্মচারী এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গত মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁরা বলছেন, সরকারের সব শর্ত মেনে তাঁরা শিক্ষকতা করলেও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। গতকাল শুক্রবার চতুর্থ দিনের মতো তাঁরা এই কর্মসূচি পালন করেন। রোববার ৩১ ডিসেম্বর থেকে তারা আমরণ অনশন শুরু করবেন। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী বলেন, আমরণ অনশন ছাড়া আর কোনো বিকল্প তাঁদের সামনে নেই। তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১০ সালে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বেতন-ভাতার অন্তর্ভুক্ত (এমপিওভুক্ত) করা হয়েছিল। এরপর থেকে এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে। সরকারি দলের সাংসদদের অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি চান। কিন্তু অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ায় এবং বছরের পর বছর রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করায় শিক্ষা বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্তি হতে হবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।

এছাড়া এমপিওভুক্তদের দাবি জাতীয়করণ। বাংলাদেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। দেশটিতে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। তাঁদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক বলা হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় সব সংগঠন এখন শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে ধাপে ধাপে আন্দোলন করে আসছে। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির একাংশের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাশেম বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণসহ কয়েকটি দাবি আদায়ে সমমনা ৯টি সংগঠন এক হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা ইঙ্গিত দেন, দাবি পূরণ না হলে কঠোর আন্দোলন শুরু করা হবে। জাতীয়করণের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এ জন্য প্রচুর অর্থ দরকার। এ মুহূর্তে এটা কঠিন। আর এটি সরকারের সার্বিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

এর বাইরে বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৩ হাজার ৬০১টি। সেখানে মোট শিক্ষক প্রায় সোয়া ৩ লাখ। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণি ঘোষণা করে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল করা হয় ১১তম গ্রেডে। আর প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় ১২তম গ্রেড। অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল হয় ১৪তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকদের স্কেল নির্ধারণ হয় ১৫তম গ্রেডে। (বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সচিব ১ম গ্রেড এবং পিয়ন/চাপরাশি ২০তম গ্রেড, দেশটিতে সিভিল সার্ভিসে প্রথম পদের আধিকারিকরা নিযুক্ত হন ৯ম বেতন গ্রেড থেকে)। প্রধান শিক্ষকেরা বলে আসছেন, তাদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণি হলেও বেতন স্কেল করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির। এ জন্য তাঁরা দাবি করে আসছেন, তাদের বেতন স্কেল এক ধাপ বাড়িয়ে দশম গ্রেড করতে হবে।
এদিকে বাংলােদেশে ৩৩৫টি সরকারি কলেজ আছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই, সেগুলোতে একটি করে বেসরকারি কলেজকে সরকারি করা হবে। নতুন করে আরও ২৮৩টি বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আগে থেকে নীতিমালা ছাড়াই এতগুলো বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ করায় সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ঘোষিত মানদণ্ড না থাকায় ভালো ও পুরোনো কলেজ বাদ দিয়ে যেনতেন কিছু কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনও হয়েছে।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের সিভিল সার্ভিসের ক্যাডারভুক্ত করার উদ্যোগ তারা মানবেন না। তাদের নন-ক্যাডার রাখতে হবে। এই দাবিতে ডিসেম্বরের শুরু থেকে তারা আন্দোলন করছেন। গত ২৬ ও ২৭ নভেম্বর সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করেন তাঁরা। একই দাবিতে আগামী ৬, ৭ ও ৮ জানুয়ারি আবারও পূর্ণ দিবস কর্মবিরতির ঘোষণা রয়েছে।

আন্দোলনে পিছিয়ে নেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। টাইম স্কেল ও পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। সারা দেশে ৩৩৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ হাজার শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন প্রায় ৮ হাজার।

এর বাইরে মাদ্রাসার শিক্ষকেরাও আন্দোলনেগেছেন। সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা (দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার সঙ্গে সংযুক্ত) জাতীয়করণ, ওই সব মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন স্কেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো করাসহ কয়েকটি দাবিতে ওই সব মাদ্রাসার শিক্ষকেরাও আন্দোলনে নেমেছেন। বর্তমানে সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা আছে ৯ হাজার ৩৫৫টি। এগুলোর শিক্ষকসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ি শিক্ষক সমিতি ফাউন্ডেশনের ডাকে গত মঙ্গলবার থেকে তিন দিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ওই সব শিক্ষক। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন।

শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষকেরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে আসছেন। শিক্ষকদের পৃথক বেতনকাঠামো করাসহ অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও গত ৭ বছরে শিক্ষানীতির সে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি বলেন, পৃথক বেতনকাঠামো করলেই সঙ্গে সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা নয়, কিন্তু পদক্ষেপ তো নিতে হবে।

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Chief Editor & Publisher: Anwarul Karim

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
News & Editorial: 39 Mymensingh Lane, Banglamotor
Dhaka-1205, Bangladesh.