বৃহস্পতিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বিশেষ নিউজ

পদ্মাবত নিয়ে কেন এই বিতর্ক: পেছনের কথা


NEWSWORLDBD.COM - January 27, 2018

বিনোদন ডেস্ক: সঞ্জয় লীলা বানসালির ছবি ‘পদ্মাবত’ চাপা উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে বৃহস্পতিবার ভারতজুড়ে মুক্তি পেয়েছে। নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে ছবিটি পর্দায় মুক্তি পেয়েছে। হয়েছে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এমনকি প্রাণহানিও। গুরগাঁও আর দিল্লির বেশ কয়েকটি স্কুলও আতঙ্কে বন্ধ ছিল। সিনেমা মুক্তির পর থেকেই বানসালি, দীপিকা পাডুকোনদের পোস্টার পুড়িয়ে গাড়ি জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছে করনি সেনারা। বিক্ষোভ ও হুমকির মধ্যে বানসালিকে খুনের হুমকিও আছে। এত সব খবরের মধ্যেই দীপিকা-বানসালিরা একটি সুখবর পেলেন। মুক্তির প্রথম দিনে দক্ষিণের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা প্রভাসের ‘বাহুবলী টু’র রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ‘পদ্মাবত’।

ভারতজুড়ে শ্রী রাজপুত করনি সেনার তুমুল বিরোধিতা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘পদ্মাবত’। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে ছিল ‘পেড প্রিভিউ’। হামলার ভয় থাকার পরও সেই প্রিভিউ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি রুপি আয় হয়েছে। বলিউডের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ছবি মুক্তির প্রথম দিনে বক্স অফিস থেকে প্রায় ২০ কোটি রুপি আয় করেছে। ১০ লক্ষাধিক দর্শক এরই মধ্যে ছবিটি দেখেছেন। আর ভারতে চার হাজারের বেশি স্ক্রিনে ছবিটা প্রদর্শন করা হচ্ছে। ‘পদ্মাবত’ কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই মুক্তি পেতে যাচ্ছে পাকিস্তানেও।

‘পদ্মাবত’-এর পরিচালকের মাথা কেটে আনতে পারলে ৫১ লাখ রুপি নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের মধ্যেই রেকর্ডও গড়ে ফেলল দীপিকার এই বহুল আলোচিত সিনেমা। মুক্তির প্রথম দিনই প্রভাসের ‘বাহুবলী টু’-এর রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ‘পদ্মাবত’। প্রথম দিন থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো ব্যবসা শুরু করেছে সিনেমাটি।

ভারতের ট্রেড অ্যানালিস্ট তরণ আদর্শের বরাত দিয়ে জি নিউজের খবরে বলা হয়েছে, প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়ায় ১ কোটি ৮৮ লাখের ব্যবসা করেছে ‘পদ্মাবত’। নিউজিল্যান্ডে করেছে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার রুপির ব্যবসা। এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য এ সিনেমা ব্যবসা করেছে ৮৮ রাখ ৮ হাজার ডলার। ‘বাহুবলী টু’ এবং আমির খানের ‘দঙ্গল’-এর তুলনায় প্রথম দিনে এ আয় অনেক বেশি। সবকিছু মিলিয়ে মুক্তির প্রথম দিন থেকে বক্স অফিসে দুর্দান্ত শুরু ‘পদ্মাবত’-এর।

১৯০ কোটি রুপি বাজেটের এই ছবি মুক্তি দেওয়ার ফলে দুর্বৃত্তদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ। ইতিহাস ও কল্পনার মিশেলে তৈরি এই ছবিতে দেখা যাবে দীপিকা পাড়ুকোন, শহীদ কাপুর, রণবীর সিং ও অদিতি রাও হায়দারিকে।

২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটের এ ছবির চরিত্র নির্বাচনের জন্য সঞ্জয় লীলা বানসালিকে বাহবা দিতে হয়। আলাউদ্দিনের মতো উন্মাদ এক সুলতানের চরিত্র রণবীর সিং ছাড়া আর কেউ করতে পারতেন বলে মনে হয় না। এরপর অবশ্যই বলতে হয় দীপিকা পাড়ুকোনের কথা। মেওয়ারের মহারানির আভিজাত্য, গাম্ভীর্য, হাঁটাচলা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এ অভিনেত্রী। ছবিতে তাঁর সংলাপ কম ছিল। একটা কথা বলতেই হয়, এই ছবি দীপিকার সেরা কাজ নয়।

শহীদ কাপুর রাজা রাওয়াল রতন সিংয়ের চরিত্রে একদম উপযুক্ত। রণবীরের দাপটের কাছে তাঁকে একটু ম্লান লাগতে পারে। কিন্তু এখানে কিছু করার ছিল না শহীদের। ছবির চিত্রনাট্য তাই। দীপিকা ও শহীদের পর্দার রসায়নও দুর্দান্ত। কোথাও কোথাও অদিতি রাও হায়দারির সৌন্দর্যের কাছে হার মানতে হয়েছে দীপিকাকে। অদিতি যে হায়দরাবাদের রাজঘরানার মেয়ে, সেটা ফুটে উঠেছে পর্দায়। জিম সর্বের অভিনয়ও যথাযথ।

সঞ্জয় লীলা বানসালির মতো করে এভাবে ঐতিহাসিক গল্পকে যথাযথ পর্দায় উপস্থাপনা করার ক্ষমতা এ মুহূর্তে বলিউডের আর কোনো পরিচালকের নেই বলা যায়।

বিতর্কের ইতিবৃত্ত:
চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিরোধ ও বিতর্কের শুরু ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে এ বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। ওই সময় রাজস্থানের জয়পুরে সঞ্জয় লীলা বানসালির নির্মীয়মাণ ‘পদ্মাবতী’ ছবির শুটিং বন্ধ করে দেয় স্থানীয় রাজপুত জাতির সংগঠন করণিসেনা। তারা অভিযোগ তুলে ছবিতে রানী পদ্মিনীর সঙ্গে মুসলিম সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির প্রেমের দৃশ্য রয়েছে, যা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। এ অভিযোগ তুলে তারা সিনেমার শুটিং লোকেশনে হামলা করে বসে। এর মধ্য দিয়ে বলিউডের কাছে তারা পরিষ্কার বার্তা পাঠায়- ‘বিনোদনের নামে ইতিহাস বদলে দিও না।’

প্রশ্ন হচ্ছে- আসলে বিতর্কের কারণ আর তা কতটুকু যৌক্তিক।

সিনেমায় একটি নাচের দৃশ্য ছাড়াও ছবিতে আছে একটি স্বপ্নের দৃশ্য। যেখানে চিতোর দুর্গ দখলকারী দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সঙ্গে রানী পদ্মাবতীর একটি ঘনিষ্ঠ ও রোমান্টিক দৃশ্য রয়েছে।

রাজস্থানের রক্ষণশীল রাজপুত সমাজ এতেই ক্ষুব্ধ। কারণ রাজপুত কুলপ্রথায় কোনো রাজা অন্যদের সামনে শরীর দেখিয়ে রানীকে নাচাবেন না। এ ছাড়া তিনি কোনো পুরুষ, বিশেষ করে কোনো মুসলিম পুরুষের সামনে তার রানীকে আনবেন, এ কথা ভাবাই যায় না।

কিন্তু পদ্মাবতীর গল্পটি আসলে কী?

রানী পদ্মিনী কিংবা তার স্বামী রাওয়াররানা রতন সিং অথবা তার কথিত রূপমুগ্ধ সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি আসলেই কতটা জায়গা দখল করেছে চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসে?

সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতী মূলত মালিক মুহম্মদ জায়সী রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পদুমাবৎ’-এর চরিত্র। জায়সী তার কাব্য রচনা করেন ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে। এতে তিনি পদ্মাবতীর পাশাপাশি চিতোরের রাজা রত্নসেন, দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি ও রাজা দেবপালের মতো চরিত্র নিয়ে রচিত কাল্পনিক কাহিনীর কাব্যরূপ দেন।

‘পদুমাবৎ’ অনুবাদ করে বাংলায় কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মাবতী’ রচনা করেন মহাকবি আলাওল। এটি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন।

জায়সীর রচনার প্রায় ১০০ বছর পর আরাকানের বৌদ্ধ রাজার অমাত্য মাগন ঠাকুরের নির্দেশে আলাওল ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে পদ্মাবতী রচনা করেন। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, কবি চিত্তের কল্পনাই জায়সী এবং আলাওল দুজনকে প্রভাবিত করেছিল।

কথিত আছে, পদ্মিনীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ আলাউদ্দিন খিলজি পাগলপারা হলেও যুদ্ধে স্বামীর মৃত্যুর পর রানী পদ্মিনী রাজপুত নারীদের ধর্ম মেনে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেছিলেন।

তবে ইতিহাসবিদরা বলছেন, ত্রয়োদশ শতকের ইতিহাসে পদ্মিনী বা পদ্মাবতী নামে কারও উল্লেখই কেউ কোনোদিন পায়নি।

ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইতিহাস আলাউদ্দিন খিলজির অস্তিত্ব স্বীকার করে; চিতোরের রাজা রতন সিংয়েরও। দুজনের মধ্যে যুদ্ধে রতন সিংয়ের পরাজয় ঘটেছিল। সেটাও ইতিহাস। কিন্তু রানী পদ্মিনীর কোনো অস্তিত্বই কোনো ইতিহাসে নেই।’

তার কথায়, ‘আলাউদ্দিন খিলজির রাজসভার কবি ছিলেন আমির খসরু। চিতোর আক্রমণের সাক্ষীও তিনি। অথচ তার কোনো লেখাতেও পদ্মিনীর কোনো উল্লেখ নেই!’

ইরফান হাবিব বলেছেন, ‘পদ্মিনীর প্রথম উল্লেখ ১৫৪০ সালে, সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর পদুমাবৎ কাব্যগ্রন্থে। সেখানে পদ্মিনী আবার শ্রীলংকার নারী; রাজপুত নন।’

ইতিহাসবিদ ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় এবং গৌতম ভদ্রও ইরফান হাবিবের সঙ্গে একমত। তাদের কথায়, ‘পুরোটাই লোকগাথা, কল্পনাশ্রয়ী একটি সৃষ্টি; ইতিহাস-সংশ্নিষ্ট নয়। বলা চলে, ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী।’

অর্থাৎ ঐতিহাসিক একটি কল্পকাহিনী চিত্রায়িত করতে গিয়েই ফেঁসে গেছেন বানসালী। আর খড়গহস্ত হয়েছেন করণিসেনারা।

তবে বিতর্কিত কোনো ফুটেজ বা দৃশ্য সিনেমায় নেই বলে দাবি করেছেন বানসালি। এক ভিডিওবার্তা পোস্ট করে তিনি বলেছেন, ‘ভুল বোঝাবুঝির প্রধান কারণ হলো তথাকথিত স্বপ্নদৃশ্য। অথচ আমি বারবার বলেছি, লিখিত প্রমাণও দিয়েছি যে এমন কোনও দৃশ্য ছবিতেই নেই। বিশ্বাস করুন, ছবিটা আমি খুব দায়িত্ববোধ নিয়ে বানিয়েছি, রাজপুতদের মান-মর্যাদার দিকে দৃষ্টিও দিয়েছি।’

যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজ 'লাইক' করতে পারেন (এই লাইনের নিচে দেখুন)...






-

Editor & Publisher: M. Arman Hossain

NEWSWORLDBD.COM
email: [email protected]
Phone: +8801787506342

©Titir Media Ltd.
News & Editorial: 39 Mymensingh Lane, Banglamotor
Dhaka-1205, Bangladesh.