বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

পুলিশে নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধ

bangladesh-police-sub-inspector-2012-result-download-www-police-gov-bd* প্রতি মাসে অপরাধে জড়াচ্ছেন ১২৫০ জন * কমিটমেন্ট ও রিসোর্সের ঘাটতি বাহিনীর আমূল পরিবর্তন দরকার
সাখাওয়াত কাওসার: অপরাধ দমনে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ নিজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ীই সারা দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১২৫০ জন পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, অপরাধে জড়াচ্ছে এমন পুলিশের প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় কিছু পুলিশ সদস্যের ভূমিকা এবং এসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ঐহিত্যবাহী এই শৃঙ্খলা বাহিনীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন, সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু পুলিশ সদস্য একের পর এক অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় পুলিশের অন্য সদস্যদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পুলিশ বাহিনীর আমূল পরিবর্তন দরকার। এ বাহিনীতে বর্তমানে কমিটমেন্ট এবং রিসোর্সের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (প্রশাসন) বিনয় কৃষ্ণ বালা জানান, পুলিশের অপরাধ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে কর্তৃপক্ষ। কোনো ব্যক্তির জন্য পুরো বাহিনী দায়দায়িত্ব নেবে না। পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত হয়। তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ আসে। কিন্তু সব অভিযোগই যে সত্য এটা সঠিক নয়। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে অর্ধ লক্ষাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেল এবং ডিসিপ্লিন বিভাগে। ২০১৪ সালে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে। নানা অপরাধে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত দুর্নীতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ নানা অপরাধে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ৩৪ হাজার ১২৯ জন পুলিশ সদস্য শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে বড় ধরনের অপরাধে গুরুদণ্ড হয়েছে ২ হাজার ৪০০ পুলিশ সদস্যের। লঘুদণ্ড পেয়েছেন ৩১ হাজার ৭২৯ পুলিশ সদস্য।

ঘটনা-১ : রাজধানীর কাফরুল এলাকার ১৭ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক এবং ওই কিশোরীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার শেখ রাজীবুল হাসানের বিরুদ্ধে। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় গোয়েন্দারা রাজীবের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। অপহৃত হওয়ার আগে ও পরে ওই কিশোরীর সঙ্গে মুঠোফোনের কথোপকথনের রেকর্ডেও রাজীবের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেছে।

ঘটনা-২ : রাজধানীর মগবাজার নয়াটোলা এলাকার ডিশ ব্যবসায়ী আমীর হোসেন বাবু। ওয়ার্ড বিএনপির নেতা বাবু একাধিক মামলার আসামি। ভাইজি জামাই পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নেসার উদ্দীন আহমেদ। তাই বাবুকে পুলিশ খুঁজে পায় না। গত ৬ মাস আগে রমনা থানার এক উপ-পরিদর্শকের ওপর হাত তুলেও তিনি বহাল তবিয়তে। শুধু তাই নয়, বাবু নিজে (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৫-৫৬৮০) এবং তার ভাই আমজাদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তাদের ব্যক্তিগত গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-গ-২৭-৮৭৩০) পুলিশ লেখা প্লেট ব্যবহার করে আসছেন। গত ১৭ এপ্রিল বিপুল অর্থব্যয়ে সেনাকুঞ্জে নেসার তার দ্বিতীয় বিয়ের বৌভাত অনুষ্ঠান করে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন তার সহকর্মীদের মধ্যে। এ-সংক্রান্ত প্রমাণাদি বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে রয়েছে।

ঘটনা-৩ : দাবিকৃত মুক্তিপণ না পাওয়ায় মো. নাহিদ নামে এক যুবককে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক তৌহিদুল আরেফিন ও সহকারী উপ-পরিদর্শক সুব্রত রায় হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভাগীয় তদন্তে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুঁজে না পাওয়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন তারা। নাহিদের স্বজনরা বলছেন, দুই পুলিশ জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। সর্বশেষ ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এ ঘটনায় সিআর মামলা নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা এরই মধ্যে দুই দফা সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন। গত পয়লা বৈশাখে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কয়েকজন নারী শ্লীলতাহানির শিকার হন। ঢাকা মহানগর পুলিশের তদন্ত কমিটি ওই ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি খুঁজে পায়নি। এর কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের সামনে বিজ্ঞান মনস্ক ব্লগার অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। ওই ঘটনায়ও পুলিশের কোনো অবহেলা খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। গত বছরের অক্টোবর মাসে রাজধানীর ভাটারা থানার দুই এ এস আই ও এক কনস্টেবল মিলে এক নারীকে দিয়ে ফাঁদ পেতে বেসরকারি এক চাকরিজীবীকে আটকে রাখে। পরে তারা ওই চাকরিজীবীর পরিবারের কাছে ফোন করে ২ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি র‌্যাব সদস্যদের জানালে টাকা নেওয়ার সময় র‌্যাব তাদের হাতেনাতে আটক করে। এ ছাড়া নিরীহ মানুষকে ধরে গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারভিশনের অভাবেই অধস্তনরা সাধারণ বা ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি বন্ধ করতে হলে অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে অন্য কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস না পায়।

পুলিশ সদর দফতরের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত ১১৪ জন ইন্সপেক্টরকে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০৯ জন লঘুদণ্ড এবং পাঁচজন ইন্সপেক্টর গুরুদণ্ড পান। এর মধ্যে ২০১২ সালে ৪৬ ইন্সপেক্টর, ২০১৩ সালে ৩৯ ইন্সপেক্টর এবং চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২৯ জন ইন্সপেক্টরকে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ওই সময়ের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার থেকে তদূর্ধ্ব ৩০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
সুত্র…বাংলাদেশ প্রাতিদিন

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *