বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় পার্কে তিন বাঘের বাচ্চার মৃত্যু

74911_b1 copyনিউজ ডেস্ক: জন্মের চার দিনের মাথায় শনিবার বিকালে মারা গেলো আলোচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগার জুটি ‘জয়-যুথীর তিন বাচ্চা। জন্মের পর থেকে বাচ্চাগুলোর অসুস্থতা অনুমান করতে পারলেও চিকিৎসার জন্য ঠিক কিভাবে কি করা উচিত তা বুঝতে পারেনি সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ বলছে, এ অভিজ্ঞতা আগামী দিনে তারা কাজেলাগাবে। তবে এই বাচ্চাগুলোর চেয়েও করুণ কাহিনী ছিল তাদের মা-বাবার। প্রায় বছর তিনেক আগে তাদের বাবা-মা যখন মৃত্যু ঝুঁকিতে ছিল, তখন এক বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে তাদের সুস্থ করে তোলা হয়। ওই ব্যক্তির পরামর্শ নিতে পারলে এই তিন বাচ্চাকে হয়তো মরতে হতো না, এ মত সংশ্লিষ্টদের।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারাস্থ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাচ্চা তিনটি প্রসব করে যুথী। একটি মহিলা এবং অন্যরা পুরুষ। জন্মের পর থেকেই মহিলা বাচ্চাটি মায়ের দুধ কম খাচ্ছিল।
বন সংরক্ষক তপন কুমার বলেন, “জন্মের পর থেকে একটি বাচ্চা অসুস্থ ছিল। দুধ খাচ্ছিল না সে। বাচ্চাগুলোর প্রতি তাদের মায়ের অস্বাভাবিক আচরণও লক্ষ্য করা গেছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে মায়ের আঘাতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।’’
বিশেষজ্ঞদের মতে, “মা বাঘ থেকে বাচ্চাদের আলাদা করে ফিডারের মাধ্যমে দুধ পান করাতে পারলে হয়তো তাদের সুস্থ করা যেতো।’’
আলোচিত জয়, জুঁই ও যুথী:
২০১২ সালের জুন মাসে চোরাকারবারিদের হাত থেকে উদ্ধার হয়ে দেশজুড়ে আলোচিত হয় তিনটি বাঘের বাচ্চা। তাদেরই জুটি জয় ও যুথী। আরেকটি জুঁই, তাকে বর্তমানে রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে বলে জানান বন সংরক্ষক তপন কুমার দে।paka_1339409283_1-jibon-bg20120611143705 copy
চোরাকারবারিদের হাত থেকে নানা কৌশলে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে র‌্যাবের সহায়তায় বাচ্চা তিনটি উদ্ধার করেন বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার গবেষক ড. আবদুল ওয়াদুদ। পাচারকারীদের বিশ্বস্ততা অর্জনে মোটা অংকের টাকাও ঢালতে হয়েছে ড. ওয়াদুদকে। সে টাকা ফেরত না পেয়ে মোটেও নাখোশ নন তিনি। কারণ তিনি পশু-পাখির অন্ধ প্রেমিক। বাড়িতেই যিনি বানিয়েছেন মিনিচিড়িয়াখানা।
বাচ্চা তিনটি উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন র‌্যাব-২ এর মেজর আশিক ও রায়হান উদ্দিন খান। বাচ্চা তিনটি পাচারকারীদের মাধ্যমে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আনা হয়। দীর্ঘ পথভ্রমণ ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে বাচ্চাগুলো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়ে।
বনবিভাগ ও ঢাকা চিড়িয়াখানার মাধ্যমেও বাচ্চা তিনটির চিকিৎসার নিশ্চয়তা পায়নি র‌্যাব। পরে ড. ওয়াদুদের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর ২২/২ হাতিরপুলস্থ ফিকামলি সেন্টারের মিনিচিড়িয়াখানায় লালন পালনের আদেশ দেন। লিখিত আদেশ প্রদান করেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা। ড. ওয়াদুদ বাচ্চা তিনটির নাম দেন জয়, জুঁই ও যুথী। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জাত রক্ষায় বংশ পরম্পরায় তারা জ্যোতি ছড়াবে, এমন প্রত্যাশা ছিল তার।
আবেগাপ্লুত ড. ওয়াদুদ
শনিবার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে তিনটি বাচ্চা মারা যাওয়ার খবরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ড. ওয়াদুদ। তিনি বলেন, “এগুলোর বাবা-মা’র অবস্থা আরও করুণ ছিল। মা-হারা সন্তান যেভাবে ফিডারের মাধ্যমে দুধ পানে সুস্থ করা হয়, ঠিক সেভাবে আমি তাদের যত্ন করেছিলাম।”
কারো কাছ থেকে জয়-যুথীর বাচ্চাদের অসুস্থতার খবর না পেয়ে আক্ষেপ করে ড. ওয়াদুদ বলেন, “সুস্থ হওয়ার পর তাদের সরকার নিয়ে গেছে। আমি কিছুই পেলাম না। তাতে কোন আফসোস নেই। আমার হাতে লালন হওয়া বাচ্চাগুলো যে আবার মা হয়েছে, এটি আমার জন্য অনেক আনন্দের। কিন্তু কষ্ট লাগছে, তাদের বাচ্চাগুলো জন্মের চারদিনের মাথায় কিভাবে মারা গেল।
এ গবেষকের মতে, “জন্মের পর বাচ্চা তিনটিকে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল। দেখা দরকার ছিল তারা ঠিকমতো দুধ পান করতে পারছে কিনা। না পারলে মা বাঘ থেকে বাচ্চাদের আলাদা করে ফিডারের মাধ্যমে দুধ পান করানো ছিল খুবই জরুরি।”
তিনি বলেন, “দিন-রাত খাটাখাটনি করে না খেয়ে তাদের যত্ন করেছি। তাদের বাচ্চা তিনটির মৃত্যুর খবরে খুব কষ্ট লাগছে। যাদের অবহেলায় তারা মারা গেছে, সেসব কর্মকর্তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।” রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জাত রক্ষায় বংশ পরম্পরা বিস্তারে কাজ করতে চান ড. ওয়াদুদ। এ জন্য তিনি নিজের তত্ত্বাবধানে বাঘ লালনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা চান।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *