‘কে তুমি? আমার সম্পর্কে ধারণা আছে? আমাকে চেনো? আমার কী টাকা পয়সার অভাব আছে? আমার কতো সম্পত্তি আছে জানো? কত টাকা লাগবে তোমার?’ ‘না, স্যার, আমি আপনাকে ভালভাবেই চিনি। আপনি অনেক দাপটশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী ছিলেন। আপনার ভাই বঙ্গবীর।’ ‘তাহলে চিল্লাচ্ছো কেন? আমি কী টাকা না দিয়েই চলে যাব? আসলে আমার সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নাই। পরে আসো, টাকা পেয়ে যাবা, যাও।’ ‘স্যার, অনেক টাকা জমে গেছে, দিয়ে দেন তাড়াতাড়ি। আমাদের জবাবদিহিতা করতে হয়।’ ‘যাওতো, বড্ড সাহস হয়ে গেছে তোমার। বুঝলা, হাতি মরলেও লাখ টাকা, বাঁচলেও লাখ টাকা। আমি আবার মন্ত্রী হব, তখন তোমাদের খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
দল ও মন্ত্রীত্ব হারানো আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের একজন কর্মচারির মধ্যকার কথোপকথোন এসব। এখানের ভিআইপি ডিলাক্স কেবিনে ভর্তি লতিফ সিদ্দিকীর কাছে কিছুদিন আগে একজন কর্মচারি বকেয়া ভাড়া চাইতে গেলে এমন কথা শুনতে হয় তাকে। কারাবন্দি অবস্থায় গত বছরের ৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে এখানে ভর্তি করানো হয়। তখন তার হার্টে সমস্যা বেশি ছিল। ১৬২ দিন তিনি এখানেই ভর্তি রয়েছেন।
সরেজমিনে বিএসএমএমইউতে গেলে ওই কর্মচারি পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তিনি বেশ রাগত হয়ে বলেন, ‘এখনো উনার তেজ কমে নাই। এতো টাকা বাকি ফেলে রাখছে, উনি কীসের দাপটশালী আর সম্পদশালী? আর ব্যবহার এতো বাজে, ভাবাও যায় না। আমি উনার কাছে ভাড়া চাইব, এটাই স্বাভাবিক। উনি যদি মনে করেন এভাবে টাকা চাইলে উনার মানসম্মান যায়, তাহলে টাকা বকেয়া রাখেন কেন? তা-ও হাজার টাকা নয়। কয়েক লাখ টাকা।’ তিনি অবশ্য বিষয়টি বিএসএমএমইউ’র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।
জানা গেছে, ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ৫১২ নং ডিলাক্স কেবিনের ভাড়া পুরোটাই বকেয়া রয়েছে লতিফ সিদ্দিকীর। প্রতিদিন ৪ হাজার ২৫ টাকা হিসাবে এই ১৬২ দিনে বকেয়ার পরিমাণ ছয় লাখ ৫২ হাজার ৫০টাকা। টাকা আদায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও গরজ নেই।
এদিকে, সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের হƒদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জীর অধীনে তিনি ভর্তি আছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছেÑ তিনি লতিফ সিদ্দিকীকে ছাড়পত্র দিচ্ছেন না। এমনকি দেয়ার চেষ্টাও করছেন না। বরং কী কী পথ অবলম্বন করলে হাসপাতালে থাকা অবৈধ হবে নাÑ সেই পরামর্শও দেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের এই নেতা। এ বিষয়ে জানতে রোববার সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো চিকিৎসক বলছেনÑ লতিফ সিদ্দিকীকে হাসপাতালে রাখতে উপর মহল থেকে চাপ আছে। তাই তাকে ছাড়তে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
লতিফ সিদ্দিকীর চিকিৎসকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে লতিফ সিদ্দিকীর হার্টের সমস্যা ততটা প্রকট নয়। যতটুকুর কথা বলা হয়, তা সব হার্টের রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা, হার্টের রোগী সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কিন্তু এই অজুহাতে লতিফ সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কেউ যদি মনে করেন তিনি খুব গুরুতর, তাকে হাসপাতাল ছাড়তে দেয়া যাবে না, তাহলে ভুল হবে। এমন যুক্তি মানলে দেশের সমস্ত হার্টের রোগীদের ১২ মাসই হাসপাতালে থাকতে হবে। সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে লতিফ সিদ্দিকী বেশসুস্থ। ইদানিং তার দাঁতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার বাম মাড়ির একটি দাঁত ক্ষয় হয়ে গেছে। সেখানে স্থায়ী ফিলিং বসানো হয়েছে বিএসএমএমইউ’র ডেন্টাল অনুষদের কনজারভেটিভ ডেনটিসস্ট্রি অ্যান্ড এন্ডোডনটিকস বিভাগে। চিকিৎসক ছিলেন বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শামসুল আলম। তিনি নিজ হাতে ওই দাঁতে ফিলিং করেন।
কেবিনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ, ভিআইপি, ভিআইপি ডিলাক্স; যে কেবিনেই রোগী ভর্তি হোক না কেন, কমপক্ষে এক সপ্তাহের টাকা অগ্রিম নেয়া হয়। কেননা, দেখা গেছে, টাকা জমে পাহাড় হয়ে গেলে বিত্তশালীরাও হিমশিম খায়। আর মধ্য বা নি¤œবিত্তরা চোখে মুখে অন্ধকার দেখেন। কিন্তু সম্মানিত ব্যক্তি হওয়ায় লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছিল। এখন এতো টাকা আদায় করা যাবে কি-না, সেটাই দেখার বিষয়। তারা আরও বলেন, হাসপাতালে ভিআইপি ডিলাক্স কেবিন আছে মোট আটটি। এসব আগে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী বা এ গোছের কারও জন্য সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত থাকতো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সবার জন্য এসব উš§ুক্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বাড়াতে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের ১৮টি জেলায় ২২টি মামলা হয়। অন্তত সাতটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের চারটি পরোয়ানা রয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে পবিত্র হজ, তাবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে নানা মন্তব্য করেন লতিফ সিদ্দিকী। বিদেশে থাকা অবস্থায়ই মন্ত্রিসভা ও দল থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে গেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিএসএমএমইউর প্রিজন সেলের ভিআইপি ডিলাক্স কেবিনে ভর্তি করা হয় তাকে।
হাসপাতালেও লতিফের আস্ফালন
যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন।



Leave a Reply