মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব

মহিউদ্দিন আহমদ: সরকারের সরাসরি মালিকানাধীন বিটিভি ছাড়াও বাংলাদেশে এখন তিরিশটির মতো প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আছে। দু-চারটি চ্যানেল ছাড়া বাকি চ্যানেলগুলোর আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়, মজবুত নয় শুনি। কিন্তু তার পরও ব্যক্তি খাতে আরও কতগুলো চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং আরও অনেকেই নতুন প্রাইভেট চ্যানেলের মালিক হওয়ার আগ্রহে বিভিন্ন মহলে ছোটাছুটি করছেন, এমন খবরও পত্রপত্রিকায় নিয়মিতই দেখছি। download
টিভি চ্যানেল লাভজনক নয়। অনেকগুলো চ্যানেল ‘প্রোগ্রাম প্রডিউসার’দের কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করছেন না; যেমন করছেন না অনেক পত্রিকার মালিক পত্রিকার সাংবাদিক এবং প্রেস কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ। তার পরও জেনেশুনেই টিভি চ্যানেলের মালিক হওয়ার এমন তীব্র আগ্রহ অবশ্যই আমোদজনক। তাহলে, এখন ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকার সম্পাদক কবি আবু হাসান শাহরিয়ার তার ‘অর্ধসত্য’ বইটির ৩২ পৃষ্ঠায় হালজামানায় বাংলাদেশে পত্রপত্রিকার মালিকদের সম্পর্কে এ মন্তব্যটি করেছেন, ‘সম্পদ পাহারায় বড়লোকেরা আগে কুকুর পুষতো; এখন পোষে দৈনিক। একুশ শতকের দৈনিক হচ্ছে বড়লোকের পোষা কুকুর। মাঝে-মধ্যে যে কুকুরকে তার প্রভু এদিক-সেদিক লেলিয়েও দেয়। জমি-দখলে, ব্যবসা-দখলে দৈনিককে ব্যবহার করে।’ তাহলে এই মন্তব্যটি কি টিভি মালিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? ‘পোষা কুকুর’ হিসেবে ব্যবহারের জন্যই কি কিছু মানুষের টিভি চ্যানেল এবং পত্রিকার মালিক হওয়ার এমন তীব্র আগ্রহ?
টিভি চ্যানেল জনমত সৃষ্টিতে কেমন প্রবল ভূমিকা রেখেছে, প্রায় ৫০ বছর আগে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমরা তা দেখেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা দুনিয়ার মানুষ তখন ভিয়েতনামে আমেরিকার অন্যায় অবৈধ যুদ্ধের প্রতিবাদে যেমন বিক্ষোভ করেছে, তাতে ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও দুনিয়ার টিভি চ্যানেলগুলো প্রবল ভূমিকা রেখেছে। আর অতি সম্প্রতি কায়রোর তাহরির স্কয়ার এবং বাংলাদেশের শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চসহ এত সব আন্দোলনে টেলিভিশনের ভূমিকা অপরিসীম।
তবে এই কথাও তো ঠিক, পত্রপত্রিকার অপব্যবহার আমরা যেমন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লক্ষ করেছি, তেমন অপব্যবহার আমরা লক্ষ করেছি আমাদের কয়েকটি টিভি চ্যানেলেও। গত বছরের মে মাসে হেফাজতি তান্ডবের সময়, তখন কয়েকটি চ্যানেল যেমন উল্লাস উৎসবের সঙ্গে অপপ্রচার চালিয়েছে, তাতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কতটুকু, সেই প্রশ্নগুলোও এখন গুরুতর হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমাদের দেশের সম্পাদক, সাংবাদিকেরা স্বীকার করতে চান না যে, গণতন্ত্রের ধারক-বাহক পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতেও হাল আমলে দেশের নিরাপত্তা, সমাজের নিরাপত্তার সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংঘর্ষিক কি না, সেই প্রশ্নগুলোও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের এই আলোচনা বিতর্ক প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অনুপস্থিত। আমাদের গণমাধ্যমগুলোর কিছুসংখ্যক মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিকের মধ্যেও ধান্দাবাজি, ব্যবসায়িক রাজনৈতিক স্বার্থ প্রবলভাবেই প্রকট, তারও কোনো আলোচনা, সমালোচনা নেই আমাদের কোনো গণমাধ্যমে।
দুই
আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নেই। আমাদের বর্তমান সরকার এই নিয়মনীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে উদ্যোগী হয়েছে, একটি খসড়া সম্প্রচার নীতিমালা তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রচার করা হচ্ছে, তার তারিফ করি। তবে এই খসড়া সম্প্রচার নীতিমালা দেখার জন্য কয়জনের কাছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট আছে, তাও একটি যথার্থ প্রশ্ন। এই খসড়া নীতিমালা কি কোনো পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে? নিচে দেওয়া আমার প্রস্তাবগুলো মূলত একজন টিভি দর্শক হিসেবে, কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ নয়।
বাংলাদেশে যা কিছু গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আছে, তার অনেকটুকুই আমাদের গণমাধ্যমের সজাগ, সতর্ক ভূমিকার কারণে আছে বলে আমি মনে করি। তবে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের আরও প্রশিক্ষিত, দায়িত্বশীল এবং স্বচ্ছ হওয়াও জরুরি বলে মনে করি। বাংলাদেশে আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় মন্ত্রীদের সবারই বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধা সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু আমাদের সম্পাদক, সাংবাদিকদের কার কী বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, কার কী ব্যবসা-বাণিজ্য, কোথায় কী স্বার্থÑ দেশের মানুষ তার কিছুুই জানে না।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আকার অনেক বড়, তবে বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো ‘প্রফেশনাল মিডিয়া মনিটর’ প্রতিষ্ঠান বা এনজিও নেই। পশ্চিমা দেশগুলোতে এমন গণমাধ্যমের তৎপরতা-অপতৎপরতা পর্যবেক্ষণ করার জন্য এমন ভূরি ভূরি সংগঠন আছে। আল-জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতি শনিবার বেলা আড়াইটায় এবং পরদিন রোববার সন্ধে সাড়ে আটটায় ‘লিসেনিং পোস্ট’ নামের আধঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে। এই প্রোগ্রামে দুনিয়ায় কোন দেশের সংবাদমাধ্যমের কোন বিশেষ ইস্যুর ওপর নিরপেক্ষ বা পক্ষপাতিত্ব থাকে, তা পর্যালোচনা করা হয়।
তিন
দেশে ও বিদেশে আমার কর্মজীবনে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রকমের মিডিয়া দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার সেই সব অভিজ্ঞতার আলোকে আমি খসড়া সম্প্রচার নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নিচে বর্ণিত আমার কয়েকটি প্রস্তাব-
বর্তমানে চালু টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যেমন বিজ্ঞাপন-সন্ত্রাস চলছে, দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার অভাব যেমন দেখছি ব্যক্তিস্বার্থে, পরিবারের কোনো কোনো সদস্যের স্বার্থে এর মালিকানার অপব্যবহার যেমন কোনো কোনো চ্যানেলে চলছে, তার প্রতিরোধে ও প্রতিকারে আমার এই প্রস্তাবগুলো।
এ প্রসঙ্গে আমি মনে করি, এই খসড়া নীতিমালাটির ওপর একটি ‘রাউন্ড টেবিল’ আলোচনা প্রয়োজন। আমাদের মিডিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষজন তখন খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত পেশ করতে পারেন। তাতে এই খসড়া নীতিমালা সমৃদ্ধ হবে এবং পরিপূর্ণতাও পাবে।
১। ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হতে পারবেন না। যারা মালিক আছেন, তাদের কেউ যদি পরে এমন দন্ডে দন্ডিত হন, তাহলে তিনি দন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৫ (পাঁচ) বছর ওই টিভি চ্যানেলের পরিচালনার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত/জড়িত হতে পারবেন না।
এমন কোনো দন্ডে দন্ডিত হলে আমাদের জাতীয় সংসদে বা উপজেলা, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে কেউ প্রার্থী হতে পারেন না। টিভির মালিকেরা তো কখনো কখনো জাতীয় সংসদের সদস্যদের চেয়েও আরও বেশি ক্ষমতাবান, তারা কেন তাহলে মালিক হতে পারবেন? তারপর মানবতার বিরুদ্ধে দন্ডিত অপরাধীদের কি কোনো গণমাধ্যমের মালিক হতে দেওয়া সঙ্গত বা উচিত? দুনিয়ার একজন মিডিয়াসম্রাট রুপার্ট মারডকের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের মালিকানার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর তাকে ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ‘বিস্কাইবি’র শেয়ার কিনতে দেওয়া হয়নি দুই বছর আগে।
২। প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকেরা ক্যালেন্ডার বছরের শুরুর প্রথম সপ্তাহে তাদের টিভি চ্যানেলে প্রাইম টাইমে, সন্ধ্যা ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে, পর পর অন্তত দুই দিন তাদের কার কত শেয়ার, তার বিবরণ প্রচার করবেন।
টিভি চ্যানেলের মালিকেরা আর কোনো ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে থাকলে, তার পরিমাণ শতকরা হিসাবে ওপরে বর্ণিত বিবরণীর সঙ্গে তারও উল্লেখ করবেন।
কোনো টিভি মালিক কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে থাকলে তার ঘোষণাও এই বিবরণীতে থাকতে হবে।
টিভি চ্যানেলের মালিকদের স্বচ্ছতা থাকা দরকার, যেমন অবশ্যই থাকা দরকার মন্ত্রী, রাজনীতিকদের।
৩। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রাইম টাইমে ঘণ্টায় ছয় মিনিটের এবং অন্য সময়ে ঘণ্টায় আট মিনিটের বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। চলমান বিজ্ঞাপনটি কখন, কত মিনিট, কত সেকেন্ডে শেষ হবে, তা টিভির পর্দার ওপরের দিকে কোথাও দেখাতে হবে।
৪। খবরের নিয়মিত বুলেটিনে অন্তত পাঁচ মিনিটের আগে বিজ্ঞাপন বিরতিতে যাওয়া যাবে না। প্রতি পাঁচ মিনিটে শুধু একবার, শুধু একটি পণ্য বা সেবার ‘ব্র্যান্ডিং’ করা যাবে।
এখন বিভিন্ন চ্যানেলে যেমন বিজ্ঞাপন-সন্ত্রাস চলছে, তা দেশের সব মানুষের দেশি টিভি চ্যানেল বর্জনের এবং বিদেশি টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয়তার একটি কারণ বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু আমাদের টিভি মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, যাদের দেশের মানুষ ‘দেশের বিবেক’ বলে কখনো কখনো অভিহিত করে থাকে, সেই ‘বিবেক’রা এই ‘বিজ্ঞাপন-সন্ত্রাস’ সম্পর্কে সামান্যতমও অবহিত বলে মনে হয় না। অন্তত তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারে দেশের মানুষের পছন্দ-অপছন্দের সামান্যতমও প্রতিফলন ঘটছে বলে মনে হয় না। তার পরও কি তারা ‘সমাজের, দেশের বিবেক’ হিসেবে অভিহিত হতে পারেন?
৫। প্রাইভেট চ্যানেলের মালিক এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যদি কোনো খবর থাকে, তা কোনোভাবেই প্রাইম টাইমের খবরে এক মিনিট সময়কালের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। একাধিক মালিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খবরের দৈর্ঘ্য প্রাইম টাইমে দুই মিনিটের বেশি হবে না। এমন খবর ২৪ ঘণ্টায় দুইবারের বেশি প্রচার করা যাবে না।
আমাদের কোনো কোনো টিভি মালিক, তাদের স্ত্রী, মা, ভাই, বোন, বোনজামাই ইতোমধ্যেই ‘ফিল্মের তারকা’ বনে গেছেন শুধু টিভির মালিকানার অপব্যবহার করে। কোনো রকমের বিশেষ যোগ্যতা ছাড়া টিভির এই মালিক/মালিকদের গুরুত্বহীন বক্তৃতা, বিবৃতির খবরের দৈর্ঘ্য কখনো কখনো জাতীয় নেতা-নেত্রীদের খবরের দৈর্ঘ্যকেও ছাড়িয়ে যায়। শুধু মালিক বলেই যা করবেন, যা বলবেন, তা খবর হবে, এমন তো হতে পারে না। রুপার্ট মারডকের দুনিয়াব্যাপী এতগুলো টিভি চ্যানেল, কিন্তু তিনি কদাচিৎ খবর হয়ে থাকেন। হ্যাঁ, হয়ে থাকেন তখন, যখন তিনি মালিকানার অপব্যবহার করেন। যেমন হয়েছিলেন দুই বছর আগে। তখন সারা দুনিয়ার পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া তাকে নিয়ে মাসের পর মাস খবর করেছে।
৬। আগেই যেমন বলেছি, জাতি গঠন এবং দেশের উন্নয়নে প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর ভূমিকাও অপরিসীম এবং অনস্বীকার্য। এই ভূমিকা পালনে প্রতিটি প্রাইভেট চ্যানেল প্রতি ২৪ ঘণ্টায় সকাল ৭টা থেকে ৯টা বা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১০টায় অন্তত দুই মিনিট জনস্বার্থে, যেমন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও উদ্দেশ্য প্রচারে, আইন মেনে সুনাগরিক হিসেবে জীবনযাপনে মানুষজনকে উদ্বুদ্ধ করতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে, বাসাবাড়ি বা কলকারখানায় শিশুশ্রমিকদের নির্যাতন বন্ধে, গাছপালা লাগানো ও পরিচর্যায় এবং পরিবেশ রক্ষায় মানুষজনকে উৎসাহিত করতে বার্তা প্রচার করবে।
৭। ক্যাবল অপারেটররা প্রথমে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, তারপর বিদেশি চ্যানেলগুলোকে সাজিয়ে প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষার চ্যানেলগুলো আগে আসবে।
৮। ৩০০-এর বেশি গ্রাহকসম্পন্ন ক্যাবল অপারেটররা গ্রাহকদের সেবা প্রদানের জন্য সার্বক্ষণিক ভিত্তিতে যোগ্য টেকনিশিয়ান রাখবেন। কোনো গ্রাহক সেবাসংক্রান্ত কোনো যথার্থ অভিযোগ জানালে, সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে সেই ত্র“টি সারানোর ব্যবস্থা করবেন।
চার
আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের একটি সংগঠন আছে, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (এ্যাটকো)। বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর দাপটের বিরুদ্ধে তারা যথার্থই সোচ্চার। কিন্তু দেশের দর্শকেরা কেন বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলের ‘সিরিয়াল’গুলোর প্রতি এমন আগ্রহী, আকৃষ্ট; তা কি কোনো দিন এতটুকু খোঁজ নেওয়া হয়েছে? প্রতিটি টিভি চ্যানেলের মালিক গত কয়েক বছরে এত বিত্তশালী, সম্পদশালী হয়ে উঠেছেন, কোনো দিন কি কিছু টাকা খরচ করে তারা প্রফেশনাল কোনো জরিপকারী প্রতিষ্ঠান দিয়ে দর্শক জরিপ করে দর্শকদের মতামত যাচাই করতে চেয়েছেন?
আমার জানতে খুব ইচ্ছে, এখন বন্ধ দিগন্ত টিভির মালিক মানবতার বিরুদ্ধে অভিযুক্ত এবং বিচারাধীন মীর কাসেম আলীও কি এই মালিকদের সংগঠন ‘এ্যাটকো’র একজন সদস্য? কেউ কি দয়া করে আমাকে জানাবেন?
আমাদের টিভিগুলোতে এত সব ‘টক শো’ হয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান হাল-হকিকত, এতসব গণমাধ্যম থেকে দেশের মানুষের কী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, তা নিয়ে কি কোনো চ্যানেল কোনো ‘টক শো’র আয়োজন করেছে বা কোনো ‘রাউন্ড টেবিল’?
আশা করি, ‘এ্যাটকো’ এই খসড়া সম্প্রচার নীতিমালার ওপর দ্রুত একটি রাউন্ড টেবিলের আয়োজন করবে। এই রাউন্ড টেবিলে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে প্রধান অতিথি করে সংশ্লিষ্ট সকলকে দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো নিয়ে দেশের মানুষের অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে আছে। তারপর টিভির সম্পাদক-সাংবাদিকেরাই একপক্ষীয় প্রশ্ন করে আসছেন রাজনীতিবিদ, নেতা-মন্ত্রীদের। এইবার সাধারণ মানুষকেও সম্পাদক, সাংবাদিকদের তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতার ওপর কিছু প্রশ্ন করার একটু সুযোগ দেওয়া জরুরি। টিভি চ্যানেলগুলোর জবাবদিহিও দরকার।
গত বছর রমজানের এক ইফতারে আমাদের ‘প্রেস্টিজিয়াস’ একটি দৈনিকের সম্পাদকের সঙ্গে একই টেবিলে বসার সুযোগ হয়েছিল। টেবিলে অন্য সব বিশিষ্টজনের মধ্যে ছিলেন: বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর শরীফ এনামুল কবীর। এই সুযোগে ‘প্রেস্টিজিয়াস’ সম্পাদককে বলেছিলাম, দুনিয়ার এত সব বিষয়ের ওপর আপনারা এত এত ‘রাউন্ড টেবিল’ করেন; বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর, কয়েকটি না হোক অন্তত একটি তো করতে পারেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের একটি অংশের অপতৎপরতা, অপকর্মের কারণে যখন ওই দেশে তোলপাড় চলছে, পৌনে দুই শ বছরের পুরোনো পত্রিকা ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’কে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিক রুপার্ট মারডক। সম্পাদক সাহেব এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু তারপর? গত বছরের ৫২ সপ্তাহে অন্তত ৩০টি বিষয়ের ওপর ওই পত্রিকা রাউন্ড টেবিল করেছে। কিন্তু করেনি গণমাধ্যমের ওপর একটিও রাউন্ড টেবিলও।
আসলে আমাদের গণমাধ্যমের মালিকেরা অন্যের ধান্দাবাজি, দুর্নীতি, অসততা বের করতে যেমন আগ্রহী, তারা তার শতভাগের এক ভাগও আগ্রহী নন নিজেদের সেক্টরের ব্যর্থতা, ধান্দাবাজি, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক এজেন্ডা উšে§াচন করতে। অথচ তারা যথার্থই দাবি করেন তারা রাষ্ট্রের ‘ফোর্থ এস্টেট’ চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু অন্য তিন স্তম্ভের মতো তাদের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা কোথায়? কার কাছে? প্রেস কাউন্সিল? তওবা। এই প্রেস কাউন্সিল তো অনেক বছর আগে মরে গেছে এবং এখন দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।
তার বিপরীতে দেখতে পাচ্ছি, রুপার্ট মারডকের অপকর্ম, খবর সংগ্রহে পুলিশকে ঘুষ, অবৈধ কাজ, ‘ফোন হ্যাকিং’ সবই বের করে এনেছে লন্ডনের, তথা সারা দুনিয়ার একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। রুপার্ট মারডক এবং তার গণমাধ্যম সাম্রাজ্যের অপকর্ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গার্ডিয়ান পত্রিকার তৎপরতার কারণে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড পত্রিকার সাবেক এক সম্পাদক এন্ডি কুল্সন জুরির বিচারে দেড় বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন পনেরো দিন আগে; আর কয়েকজন সাংবাদিকেরও জেল দন্ড হয়েছে। এই এন্ডি কুল্সন নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সম্পাদকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের মিডিয়া প্রধান হিসেবেও কয়েক বছর কাজ করেছেন। তাকে চাকরি দেওয়ার কারণে ক্যামেরনও বিভিন্ন মহল থেকে এখন আক্রান্ত।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের এমন ভূমিকা কখন দেখব?

লেখক : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, কলাম লেখক, শৌখিন গণমাধ্যম মনিটর।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *