মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রকেরা

প্রভাষ আমিন: গণমাধ্যম কারা নিয়ন্ত্রণ করে? আপনার সবাই নিশ্চয়ই সরকার বা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের সুবিধামতো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। আংশিকভাবে হয়তো করে। তবে গণমাধ্যমের মূল নিয়ন্ত্রক কিন্তু আপনাদের অদেখা। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক এক-দুজন নয়, অনেক। মূল নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞাপনদাতাদের হাতে। এ ছাড়া প্রিন্ট মিডিয়া জিম্মি এজেন্ট আর হকারদের হাতে। আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া জিম্মি ক্যাবল অপারেটর আর টিআরপি প্রণেতাদের হাতে। images
বিজ্ঞাপনের ওপর গণমাধ্যমের নির্ভরতাটা বোধগম্য। তাই আজ অন্য নিয়ন্ত্রকদের নিয়ে কথা বলব। বিজ্ঞাপনের গল্প পরে আরেক দিন। প্রিন্ট মিডিয়ার মূল বস হকাররা। আপনি যত ভালো পত্রিকাই প্রকাশ করুন না কেন, তা বিক্রি করার জন্য পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে হকারদের ওপর। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়Ñ যা-ই হোক, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা তাজা পত্রিকা পেয়ে যাই হকারদের কল্যাণে। একজন পাঠক হিসেবে হকাররা আমার অতি প্রিয়। কোনো কারণে সকালে ঘুম থেকে ওঠে পত্রিকা না পেলে আমার দিনটাই শুরু হতে চায় না। হকাররা রাত জেগে কাজ করে আমাদের দিনের শুরুটা আনন্দময় করে তোলার জন্য। কিন্তু এই হকারদের কাছেই জিম্মি পত্রিকার প্রকাশকেরা। হকারদের ব্যবসার কোনো পুঁজি নেই। হকারদের চাহিদামতো দেশের যেকোনো প্রান্তে নিজ খরচে তাদের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দিতে হয়। বিক্রির পর হকাররা তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা এবং অবিক্রীত পত্রিকা ফেরত দেন। তবে ঢাকার বাইরের অনেক হকারের কাছ থেকে টাকা এবং অবিক্রীত পত্রিকা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো হকাররা শুধু বলে দেন, এত কপি বিক্রি হয়েছে। আসলেই কত কপি বিক্রি হয়েছে, তা জানার সুযোগ থাকে না, হকারদের কথার ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়। বড় পত্রিকাগুলো হয়তো নিয়মিত ঢাকার বাইরের হকারদের কাছ থেকে টাকা পান। কিন্তু ছোট ছোট পত্রিকাকে টাকার জন্য দিনের পর দিন ধরনা দিতে হয়। অনেক সময় পাওয়াই যায় না। কোনো কারণে পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে হকারদের লাভ ষোলো আনাই। নব্বই দশকের শুরুতে আমি একাধিক সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেছি। যেগুলো পরে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই পত্রিকার পাওনা টাকা আর কখনোই আদায় করা যায়নি। হকাররা চাইলে একটি পত্রিকাকে পুরোপুরি ভাসাতে না পারলেও ডুবাতে পারেন। কমিশন বেশি পেলেই হকাররা কম চালু পত্রিকাও সামনে রাখে এবং পাঠকদের সেই পত্রিকা কেনার জন্য অনুরোধ করে। আর কোনো কারণে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হলে সেই পত্রিকাটি আড়ালে রাখা হয়। পাঠকেরা কিনতে চাইলে বলে, নেই বা শেষ হয়ে গেছে। আর দিন শেষে পত্রিকার প্রকাশকদের বলে, ধুর মিয়া, কী পত্রিকা বাইর করছেন, চলে না। অনেকে অনেকবার হকারদের নেটওয়ার্কের বাইরে গিয়ে পত্রিকা বিক্রি চেষ্টা করেছেন এবং অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছেন। জনকণ্ঠের যখন রমরমা অবস্থা, তখন একবার হকারদের সঙ্গে ঝামেলা করে জনকণ্ঠ বিকল্প ব্যবস্থায় পত্রিকা বিক্রি শুরু করে। সেই থেকে জনকণ্ঠের পতন শুরু। এটা সবাই জানেন বলেই পত্রিকা অফিসে হকাররা ভিআইপি মর্যাদা পান। হকারদের বড় নেতা অফিসে এলে স্বয়ং সম্পাদক তাকে আপ্যায়িত করেন। প্রায়শই পত্রিকা কর্তৃপক্ষ হকারদের নানা গিফট দেন। ঢাকায় এনে আপ্যায়ন করেন। টিভি এবং অনলাইনের এই দাপটের সময়েও ছাপার পত্রিকা বছরে ৩৬৫ দিন প্রকাশ করা যায় না হকারদের জন্য। নির্ধারিত ছুটির দিনে পত্রিকা প্রকাশ করা হলে হকাররা তা বিক্রি করবেন না। আর বিক্রি না হলে পত্রিকা প্রকাশ করে লাভ কী। তাই ছুটির দিনে অধিকাংশ পত্রিকার অনলাইন ভার্সন চালু থাকলেও, কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা থাকলেও হকারদের আপত্তির কারণে পত্রিকা প্রকাশ করা যায় না। হকারদের যেকোনো অনুরোধ রাখে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ।
ড়হসফযড়শধৎবৎমধধহ২প্রিন্ট মিডিয়ার যেমন হকার, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তেমনি ক্যাবল অপারেটর। হকারদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ক্যাবল অপারেটররা। হকাররা তবু পত্রিকা বিক্রি করে টাকা দেয়। কিন্তু ক্যাবল অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিলেও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে কোনো টাকা দেন না। টাকা তো দেনই না, উল্টো গোপনে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ক্যাবল অপারেটরদের উৎকোচ দেন। নিয়মিত গিফট, ঢাকায় ডেকে আপ্যায়ন, যেকোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণÑ সবকিছুতেই অপারেটররা অগ্রাধিকার পান। পত্রিকা অফিসে হকাররা ভিআইপি, আর টিভি অফিসে ক্যাবল অপারেটরা ভিভিআইপি। নিয়মিত তাদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়। মাঝে মাঝেই আবদার আসে অমুক জেলায় ক্যাবল অপারেটরদের অফিসে টেলিভিশন বা সোফা সেট কিনে দিতে হবে। এখন যেহেতু দেশে প্রায় ২৬টি টিভি। তাই দেশের যেকোনো প্রান্তে ক্যাবল অপারেটররা কিছু করলেই টিভি স্টেশনগুলো প্রতিযোগিতা করে তাদের পাশে দাঁড়ায়। ক্যাবল অপারেটররা সন্তুষ্ট থাকলেই টিভির উন্নতি। মোটামুটি মানের অনুষ্ঠান আর ক্যাবল অপারেটরদের বদৌলতে প্রাইম ব্যান্ড মানে ১ থেকে ১৫-এর মধ্যে থাকতে পারলেই টিভির উন্নতি অবধারিত। কারণ, পাঠক যদি গিয়ে কোনো একটি পত্রিকা কিনতে চায়, সামনে রাখুক আর পিছনে রাখুক, হকারদের শেষ পর্যন্ত তা বিক্রি করতেই হয়। কিন্তু ক্যাবল অপারেটররা চাইলে একটি টিভি স্টেশনকে অনায়াসে ডুবিয়ে দিতে পারেন। কোনো টিভি স্টেশন টাকা না দিলে বা কোনো বিষয়ে বনিবনা না হলে ক্যাবল অপারেটররা সেই স্টেশনকে ৮৯ নম্বরে দিয়ে দেন। ব্যস, সেই টিভিকে ধ্বংস করার জন্য আর কিছুই লাগে না। টিভিতে যত ভালো অনুষ্ঠানই থাকুক, কোনো দর্শকই ৮৯ নম্বরে খুঁজে তা দেখবে না। ৮৯ পর্যন্ত যেতে যেতে আরও অনেক ভালো অনুষ্ঠানে আটকে যান দর্শকেরা। ঝামেলা বেশি হলে কখনো কখনো একেবারেই অফ করে দেন অপারেটররা। যার পণ্য বিক্রি করে আপনি ব্যবসা করছেন, তার কাছেই আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো। টেলিভিশন মালিকদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর আরেকটি কায়দা আছেÑ টিআরপি। ‘সিরিয়াস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে টেলিভিশন স্টেশনগুলোর দর্শকপ্রিয়তা যাচাই করে। প্রতি সপ্তাহে টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট-টিআরপি প্রকাশ করে। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এবং বিজ্ঞাপনদাতারা অনেক টাকা দিয়ে এই টিআরপির রিপোর্ট কেনে। কিন্তু সাধারণ দর্শকেরা এই টিআরপি রিপোর্ট দেখার সুযোগ পান না। বিজ্ঞাপনদাতারা এই টিআরপি রিপোর্ট দেখেই বিজ্ঞাপন দেন। তাই এই টিআরপি রিপোর্ট টিভি স্টেশনগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই মহাগুরুত্বপূর্ণ টিআরপি রিপোর্ট কীভাবে তৈরি হয়, শুনলে আপনারা হাসতে হাসতে মরে যাবেন। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র ২৬০টি বাসার দর্শকদের পছন্দ মনিটর করেই তৈরি হয় এই টিআরপি। তাও কোন ২৬০টি বাসা, তা ‘সিরিয়াস’ ছাড়া আর কেউ জানে না। ভুতুড়ে সেই ২৬০ জন দর্শকই নির্ধারণ করেন টিভি স্টেশনের ভাগ্য। এবং এই ২৬০ জনের সবাই ঢাকার। তার মানে ঢাকার বাইরের মানুষ টিভি দেখল কি দেখল না, তাতে টিভি স্টেশনের মালিকদের কিছুই যায় আসে না। হাস্যকর বললাম এ কারণে যে, প্রতি সপ্তাহেই টিআরপি রিপোর্ট দেখার সুযোগ হয় আমার। এমন অনেক টিভি টিআরপি এগিয়ে থাকে, যা আপনারা হয়তো কখনোই দেখেননি। অভিযোগ আছে সিরিয়াস প্রায়শই এই টিআরপি রিপোর্ট ম্যানিপুলেট করেন। সিরিয়াসকে সন্তুষ্ট করতে পারলে দর্শক দেখুন আর না দেখুক, যেকোনো টিভি টিআরপিতে এগিয়ে থাকতে পারে।
প্রিয় পাঠক, এই হলো বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যমের চিত্র। হা হা হা। হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটা অনেক আনন্দের। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা সেই আনন্দ উপভোগ করছি প্রতিদিন। আর দিন গুনছি, কবে সত্যি সত্যি সত্যিকারের স্বাধীন গণমাধ্যম পাব।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *