‘সারাদেশে শিল্প সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে দিতে আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও শেকড়ের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। আমি চাই শিল্প সংস্কৃতি হোক ১৬ কোটি মানুষের জন্য, শুধু বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর জন্য নয়।’ এই অনুভূতি থেকেই শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী তার কর্মপরিধি ও দায়িত্বের কথা জানালেন। এ প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে লিয়াকত আলী বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অতীত ও এর সংস্কৃতি, বিপ্লব-বিদ্রোহভিত্তিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ, বীরাঙ্গনা-বীরমাতাদের জীবনগাঁথা ও আমাদের লোকসংস্কৃতি নিয়ে নিজের চিন্তা-ভাবনাগুলো তুলে ধরেন। সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যেক উপজেলায় শিল্পকলা একোডেমি সম্প্রসারণ করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ৬৪টি জেলা থেকে ৪৮৯টি উপজেলায় সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ৪৪টি জেলা শিল্পকলা একাডেমি আধুনিকায়নের কাজ চলছে। নতুন করে ১৬টি জেলা নির্মাণকাজের মধ্যে ৮টির কাজ শুরু হয়েছে। ৩০টি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মাণের পাইলট প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি। এটি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

শিল্পকলায় তীব্র জনবল সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, যা কিছুই আমরা করি বা করতে চাই না কেনÑ দরকার লোকবল। ৩৫০ জন নেয়া হয়েছে। শিল্পকলার জন্য ৫ হাজার ৭০০ লোকবলের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছি। আশা করি হবে।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে ২০১১’র এপ্রিলে যোগদানের পর এ প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক ও সারাদেশে এর আলো ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন উল্লেখ করে লিয়াকত আলী লাকী বলেন, শিল্পকলা একাডেমির পরিত্যক্ত পুকুর সংস্কার করে অত্যাধুনিক নন্দনমঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। ১৫তম ও ১৬তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়েছে। সার্ক ফোক ডান্স ফেস্টিভ্যাল, ৬ষ্ঠ এশিয়ান আর্ট মিউজিয়াম ডিরেক্টরস ফোরাম, ঢাকা আর্ট সামিট আয়োজন, সার্ক হ্যান্ডিক্র্যাফ্ট ফেস্টিভ্যাল আয়োজন, সার্কভুক্ত ৮টি দেশের চিত্রশিল্পীদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে ‘সার্ক আর্টিস্ট ক্যাম্প-২০১৪।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাম্প্রতিক অর্জন প্রসঙ্গে:
মহাপরিচালক বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪০ বছর ও শিল্পের আলোয় মহান মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় নাটক, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, নৃত্য, চারুকলা, ফটোগ্রাফি, আবৃত্তিসহ শিল্পের বিভিন্ন শাখায় দেশের শিশু, কিশোর, যুব ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশাল শিল্পযজ্ঞের আয়োজন হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা ও গানের আলোকে দেশের ১০০ জন শিল্পীর মাধ্যমে ১০০টি চিত্রকর্ম নির্মাণ ও প্রদর্শনী, ‘বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশের প্রতীক’ শিরোনামে শাহজাহান আহমেদ বিকাশ-এর একক চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন, দেশজুড়ে শিশু, কিশোর, যুবদের অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে।
লিয়াকত আলী লাকী বলেন, আমি এখানে আসার আগে কখনো ‘শিল্পকলা পদক’ এবং ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা’ ছিল না। এটা বলতে পারেন আমিই উদ্যোগ নিই এবং তা প্রবর্তন করা হয়েছে। পদকপ্রাপ্তদের যোগ্যতা বিবেচনায় কমিটি করে দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে ৭ জন, ’১৪ সালে ৭ জনকে ‘শিল্পকলা পদক’ এবং ’১২ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জনকে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা’ দেয়া হচ্ছে।
বাঙালি জাতির সব বিপ্লব-বিদ্রোহভিত্তিক বিষয়বস্তু নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে লিয়াকত আলী জানান, ৬৪টি জেলায় ৬৪টি স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক নির্মাণ এবং ‘স্বপ্ন ও দ্রোহের জাতীয় নাট্যোৎসব’ আয়োজন, ৭৬টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নতুন নাটক নির্মাণ এবং ১০০টি মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্যোৎসব’ আয়োজন, নারী জাগরণের নাট্যোৎসব আয়োজন, ৬৪টি জেলা শিল্পকলা একাডেমির ৬৪টি নাটক নিয়ে ‘সাহিত্যনির্ভর নাট্য আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, অ্যাক্রোবেটিক ও নাটকবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্র্মশালা আয়োজন করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুদান দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শর্টফিল্ম করার জন্য আমরা ১৫ লাখ টাকা করে দিয়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প নিয়ে তৈরি ৫টি শর্টফিল্ম হচ্ছে ডাকঘর, রাজপুত্তুর, বীরপুরুষ, মাধো, বিশ্বম্ভর বাবুর দায়। চলচ্চিত্র শিল্পের পাশে রয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এবং বিষয়ভিত্তিক ২৫টি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন, নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র নির্মাণ কর্মশালা, চলচ্চিত্র বিষয়ক পাঠচক্র ও সেমিনার আয়োজন এবং মহানায়িকা সুচিত্রা সেন স্মরণে দেশজুড়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ‘ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল কালচারাল আর্কাইভ’ এ সুচিত্রা সেন গ্যালারি স্থাপন, পাবনায় সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণ প্রকল্পসহ বর্ষব্যাপী নানা আয়োজন করা হয়েছে।
যাত্রাশিল্পের প্রেক্ষাপট ও অতীত বা ঐতিহ্য উল্লেখ করে লিয়াকত আলী বলেন, ধ্বংসপ্রায় যাত্রাশিল্পের নতুন জীবন দান এবং যাত্রাশিল্পের নবযাত্রা; যাত্রাশিল্পের নতুন নীতিমালা তৈরি ও তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু, শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সব যাত্রাদলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু, যাত্রা প্রযোজনা, যাত্রা উৎসব ও দেশজুড়ে যাত্রা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
পাকিস্তানের দুঃশাসন, আমাদের বেরিয়ে আসা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে লিয়াকত আলী লাকী ‘ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গানের অডিও সিডির অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন নিজের উদ্যোগে। ‘দ্রোহ ও মুক্তির গান-১’ ও ‘দ্রোহ ও মুক্তির গান-২’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত গানের ২টি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ, ‘মুক্তিযুদ্ধের পঙ্ক্তিমালা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত কবিতার অডিও অ্যালবাম প্রকাশ, বীরমাতা বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণ, ‘বীরাঙ্গনা বীরমাতার জবানীতে একাত্তরের ভয়াল স্মৃতি’ শিরোনামে ২২ জন বীরমাতার সাক্ষাৎকারভিত্তিক পুস্তক মুদ্রণ করেছি। আমরা বীরাঙ্গনাদের জীবনগাঁথা উপজীব্য করে নাট্য প্রযোজনা, ‘আমার দেখা বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিল্পী ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি। ‘কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতা নিয়ে গ্রন্থ মুদ্রণ করেছি।



Leave a Reply