দিন দিনই বেড়ে চলেছে তার অপকর্মের ফিরিস্তি। তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাটের পাগলা ঘোড়া লাগাম টেনেও থামানো যাচ্ছে না। কয়েকশ’ কোটি টাকা লুটপাটের একাধিক বিষয় নিয়ে দুদক এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু কোনো কিছুকে পাত্তা দিচ্ছে না তাকসিম সিন্ডিকেট। অতিসম্প্রতি মাত্র দুটি প্রকল্পের নামেই সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকা হরিলুট করে নিয়েছে চক্রটি। অভিযোগ উঠেছে এভাবে বছরের পর বছর ব্যক্তিকেন্দ্রিক লুটেরার কাছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা ওয়াসা জিম্মি হয়ে থাকলেও সরকার নীরব ভূমিকা পালন করছে। এসব নিয়ে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
কয়েকদিন আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ওয়াসা’র এমডি কার্যালয়ে সমবেত হওয়া বিক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের হৈচৈ, গুঞ্জন দুই হাত প্রসারিত করে থামিয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান জোরালো গলায় তার নিজের পরিচয় সবাইকে জানাতে থাকেন। তিনি বলতে থাকেন, ‘আরে মিয়া থামেন থামেন, আগে কথা শোনেন। দলের বাহাদুরি আমাকে দেখাবেন না। দলের যে মালিক সেই পরিবারের বড় আত্মীয় আমি। রেস্তা সম্পর্ক (পারিবারিক আত্মীয়তার বিবরণ) কিছুই জানেন না, এখন শুনে রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে শ্রদ্ধার বড় বোন ছিলেন মরহুমা ফাতেমা বেগম। তারই আদরের নাতি হলো আমার মেয়ে জামাতা। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার বেয়াইন।’ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দমিয়ে দিতে তিনি বলেন, ‘এবার আসেন আরেক দিকে। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রথম কাতারে স্থান ছিল সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম ইলিয়াস চৌধুরীর। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আপন ফুফাতো ভাই। ইলিয়াস আর আমার বন্ধুত্ব এতটাই গভীর ছিল যে, শেখ হাসিনা যে কারও কাছে আজও আমাকে ফুফাতো ভাই হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেন। সব যোগ-বিয়োগ করে এবার বুঝে নেন। খালি নামের আগে-পিছে শেখ লাগালেই হলো? শেখ লাগানো ছাড়াই তাকসিম খান সরাসরি শেখ হাসিনার লোক।’ এভাবেই সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে আত্মীয়তার পরিচিতিকে আরও ঘন করে দোর্দণ্ড দাপট দেখিয়ে চলছেন ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। এই সব অভিযোগের ব্যাপারে তার মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তার দফতরের মাধ্যমে এই প্রতিবেদককে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘স্যার সাংবাদিকদের সঙ্গে এসব মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে কোনো কথা বলবেন না। যা লেখার তা আপনারা লিখে দিতে পারেন।’ এবার জেনে নেওয়া যাক তাকসিমের কিছু অনিয়ম, দুর্নীতির নমুনা। 
তাকসিমের স্বেচ্ছাচারিতা : স্ত্রী ও ছেলে থাকেন আমেরিকায়। তিনিও এক পা বাড়িয়ে রেখেছেন। প্রায়ই ঘনিষ্ঠদের বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলেই তিনি স্ত্রী-ছেলের কাছে চলে যাবেন। তাকসিম এ খানের ব্যাপারে ওয়াসারই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছরের ২৪ অক্টোবর মহাজোট সরকারের মেয়াদ শেষে কঠিন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল বিএনপি। বিষয়টিকে হালকাভাবে নেননি ওয়াসার এমডি। তিনি ভেবেছিলেন দেশে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। এ আশঙ্কায় ২৪ অক্টোবর আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তাকসিম এ খান। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় ২০-২২ দিন পর ফিরে এলেন তিনি।’ ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর ওয়াসার এমডি পদে প্রথম নিয়োগ পান তাকসিম এ খান। ওই সময়ই অভিযোগ উঠেছিল, শর্ত ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাকে। কারণ পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল, আবেদনকারীর অবশ্যই পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কাজে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং একই ধরনের সংস্থায় তৃতীয় গ্রেডে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া এ খাতে অন্তত ২০ বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতাও চাওয়া হয়েছিল। প্রশাসন ব্যবস্থাপনায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। এসবের কোনোটাই ছিল না তাকসিম এ খানের। তিনি তখন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ইউকে ২০০১ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ নিয়োগ পরীক্ষায় তাকেই প্রথম দেখানো হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় পরবর্তী নিয়োগের ক্ষেত্রে ওয়াসার এমডিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই তাকসিমের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে স্বেচ্ছাচারী আচরণের নানা অভিযোগ। একপর্যায়ে ওয়াসা চেয়ারম্যান মো. রহমতুল্লাহর সঙ্গেও তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। এর অংশ হিসেবে চার মাস ধরে চেয়ারম্যানের মাসিক সম্মানী ও গাড়ি সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সংস্থাটির কর্মীরা বিস্মিত। এমডি তার কাজকর্মে সব সময় সায় না দেওয়ায় চেয়ারম্যানের ওপর ক্ষুব্ধ। তাই চেয়ারম্যানকে শায়েস্তা করার চেষ্টা চালিয়ে যান তাকসিম। এর অংশ হিসেবে নিয়ম লঙ্ঘন করে চার মাস ধরে চেয়ারম্যান মো. রহমতুল্লাহর মাসিক সম্মানী বন্ধ করে দেন তিনি। চেয়ারম্যানের ব্যবহারের জন্য গাড়িটিও সরবরাহ না করতে নির্দেশ দেন। এমনকি ওয়াসায় গেলে তাকে হেনস্তা করার হুমকিও দেওয়া হয়। তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে অজস । বিদেশি অর্থায়নে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নে আছে ব্যর্থতার অভিযোগও। লাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়াসাকে পড়তে হয়েছে দায়-দেনার মুখে। আর এ পরিস্থিতির জন্য তাকসিমকেই দায়ী করছেন ওয়াসা বোর্ডের সদস্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমডি আসার আগে ওয়াসা লাভজনক ছিল। কিন্তু এখন দিন দিন অনেক টাকা দেনার বোঝা মাথায় চেপেছে। বিদেশি ঋণ ও অনুদান নিয়ে যেসব প্রকল্প করা হয়েছে তার প্রায় সবই ব্যর্থ হতে বসেছে। এমডি ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বেহাত করেছেন।’
নজিরবিহীন : তাকসিম এ খান সিন্ডিকেটের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়েছে ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের (ফেজ-১) নিয়ে। প্রকল্পের অনুমোদন হয়নি অথচ তার আগেই পছন্দমাফিক ঠিকাদারের সঙ্গে কাজের চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, কোনো রকম ভেটিং পর্যন্ত করা হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ওই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে চড়া সুদের টাকায় নিুমানের পাইপ আমদানিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মা (জশলদিয়া) প্রকল্প থেকেই ৫০০ কোটি টাকা লুটপাটের ফন্দিফিকির চূড়ান্ত হয়েছে। দুর্নীতি-লুটপাটের সবকিছু ঠিকঠাক রাখার স্বার্থে প্রকল্পের পরিচালকের পদ থেকে প্রকৌশলী এম এ রশিদ সিদ্দিকীকে পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে নিয়োগপ্রাপ্ত তাকসিম এ খান ওয়াসাকে রীতিমতো লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিভ্রান্তিমূলক ফাইল পাঠিয়ে দুই দফা চাকরির মেয়াদও বাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। টানা পাঁচ বছর ধরে অবৈধভাবে এমডি পদ আঁকড়ে থাকা তাকসিম এ খান অন্তত ১০টি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃতীয় দফায় চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর পরপরই তিনি তিনটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নেন। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে শুধু পরিকল্পনা আর উদ্যোগ নিয়েই কোটি কোটি টাকা হাতানোর নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত রয়েছে ঢাকা ওয়াসায়। এমডি পদে তাকসিম যোগদানের পর ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত নেওয়া ওয়াসার একটি প্রকল্প ছাড়া আর কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। পানি সমস্যা সমাধানের নামে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই হয়েছে তাকসিম সিন্ডিকেটের কাজ।
তদন্ত হয় শুধু : দোর্দণ্ড দাপুটে ওয়াসা এমডি তাকসিম এ খানের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, একের পর এক দুর্নীতি, লুটপাটের অভিযোগ আছে বেশুমার। এসব নিয়ে মাঝেমধ্যেই তদন্ত হয়। অনুসন্ধান আর তদন্ত চালিয়ে থাকে দুর্নীতি দমন কমিশনও। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হয় না তাকসিমের। পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক শেখ আবদুস সালামকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা এবং উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্প (ফেজ-১) ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর একনেকের অনুমোদন পায়। এর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। মু?ন্সীগঞ্জে পদ্মার জশলদিয়া পয়েন্টে এ শোধনাগারটি স্থাপন করা হবে। এখান থেকে পরিশোধিত পানি কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বসানো হবে পাইপ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশ দিয়ে এ পাইপ নেওয়া হবে।৫০ কোটি টাকার লুটপাট প্রকল্প : ঢাকা ওয়াসা ঢাকঢোল পিটিয়ে গুলশান লেককে দূষণমুক্ত করার যে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল তাও লুটপাট প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ও হয়ে গেছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অসংখ্য নালা-নর্দমার সংযোগপথে প্রবাহিত পয়ঃবর্জ্যে গোটা লেকজুড়ে সীমাহীন দূষণ ঘটেই চলেছে। সেখানে উন্নয়নকাজ বলতে কী হয়েছে তা জানেন না আশপাশের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, কাগজপত্রে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ৫০ কোটি টাকা নয়ছয় হয়েছে মাত্র। রাজউকের লেক প্রকল্পের তথ্যমতে, গুলশান-বারিধারা লেকের বড় ১৮টি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন সরাসরি পয়ঃবর্জ্য মিশছে গুলশান লেকে। এর বাইরে মাঝারি ও ছোট আকারের আরও ৩৫টি পয়েন্ট থেকে তা মিশছে লেকে। বারিধারা ডিওএইচএস কালাচাঁদপুর, বনানী ১১৮ নম্বর রোড, ন্যাম ভিলার দক্ষিণে বনানী ২ নম্বর রোড, মহাখালী-গুলশান লিঙ্ক রোড, গুলশান-বাড্ডা লিঙ্ক রোড, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজের নিচ এবং কড়াইল লেকসংলগ্ন বস্তি এলাকায় অনেক নালার মাধ্যমে মানুষের মলমূত্রসহ বিভিন্ন আবর্জনা মিশছে লেকের পানিতে। কড়াইল বস্তি এলাকায় অনেক টয়লেটের সরাসরি সংযোগ রয়েছে লেকের সঙ্গে। এসব সংযোগ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ওয়াসা বরাবরই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


