মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

কৃষিতে বিপ্লব ঘটলেও কৃষকের সংকট কাটে না

সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, দেশে কৃষি খাতে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। কৃষি পণ্যের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। এক সমীক্ষায় প্রকাশ, ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। তখন দেশে মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি এবং ওই উৎপাদন পর্যাপ্ত ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের পর ইতোমধ্যে আমরা চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করে এসেছি। এই সময়ে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই সময়ের মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণও অনেক কমেছে অথচ খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। এখন কৃষক আর শুধু ধান উৎপাদনেই মনোযোগী থাকছেন না, আলু, টমেটো, নানা রকম সবজি এবং ভুট্টাসহ অনেক ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং তাদের সফলতার চিত্র অত্যন্ত উজ্জ্বল। অবশ্যই বলতে হবে এক্ষেত্রে বিগত মহাজোট ও বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি অনেক বেশি সুফল বয়ে এনেছে। কিন্তু কৃষি খাতে এত সাফল্যের পরও কৃষকের সংকট কাটেনি; বরং কৃষক দিন দিন অধিকতর সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কৃষক অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তারপরও তারা আগ্রহ হারাননি কৃষি কাজে। কিন্তু এভাবে কতদিন তারা নিজেদের টেনে নিতে পারবেনÑএই জিজ্ঞাসা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।agrii
মাসের পর মাস ঝড়-বৃষ্টি-বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সন্তানের মতো আগলে রেখে ক্ষেতের ফসল ঘরে তোলার উপযোগী করে তোলেন কৃষক। একদিকে অমানুষিক কায়িক পরিশ্রম, অন্যদিকে গাঁটের সব পয়সা খরচ করে ফসল ঘরে তোলার উপযোগী করে তোলেন তারা। এরপর কৃষক চোখভরে তা দেখেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন শুধু যেন এটুকুই তার বা তাদের সান্ত¡না। এরপর ফসল নিয়ে শুরু হয় বিড়ম্বনা। লাভ তো দূরের কথা, বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। কৃষকের ভাগ্যের এই চিত্র আমরা নতুন দেখছি না। ফি বছর এই ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণেই অনেক কৃষক পরিণত হচ্ছেন রিকশাচালকে অথচ এই পরিণতির জন্য কৃষক নন বরং দায়ী বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। তাই কৃষকরা আর চুপ থাকতে না পেরে অন্য রকম প্রতিবাদ জানিয়েছেন নিকট-অতীতেও বহুবার দেশের বিভিন্ন স্থানে। যে টমেটো, কফি, আলু ইত্যাদি ক্ষেত থেকে তুলে বাজারে সরবরাহ করার কথা তা রাস্তায় ঢেলে দিয়েছেন তারা। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেনÑ ‘রক্তঝরা পরিশ্রমের মূল্য চাই।’ সঠিক প্রতিবাদ সন্দেহ নেই। ধানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষক উৎপাদন খরচ ওঠাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহলে কৃষক বাঁচবে কি করে? খাবে কি কৃষক? দেনার টাকাই বা পরিশোধ করবে কি দিয়ে? ধান যেন এখন কৃষকের গলার কাঁটা। অথচ চাল এখন আমদানি করতে হয় না। পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকা, বাজার ব্যবস্থায় ফড়িয়াদের দাপট, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাÑ সর্বোপরি স্থানীয় কাঁচাবাজারের প্রতি সরকারের দক্ষ দৃষ্টি না থাকায় প্রতি বছর কৃষককে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। অধিকাংশ সবজি ঋতুকালীন এবং সহজে পচনশীল। স্বভাবতই এই সবজি সংরক্ষণের যথেষ্ট ব্যবস্থা কৃষকের নেই। আলুর ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতি নিকট অতীতেও পরিলক্ষিত হয়েছে। বাজারে দাম নেই; তাই কৃষক চান তার পণ্য হিমাগারে রাখতে। কিন্তু দেশব্যাপী হিমাগার অপর্যাপ্ত হওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। কিছুকাল ধরেই দেশের কৃষিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা হিমাগারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। কিন্তু না হয়েছে পর্যাপ্ত হিমাগারের ব্যবস্থা, না হয়েছে কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা। অন্যদিকে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবং যা আগেই বলেছি তা হলো কৃষক তার ফসলের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। কিন্তু শহরবাসীকে তিনগুণ দামে ঋতুকালীন শাক-সবজি কিনতে হচ্ছে। বাজারে কোনো নিয়ম-নীতি না থাকার ফলেই এই অরাজকতা দেখা যায় বলে বিশিষ্টজনরা মনে করেন। এভাবে চলতে পারে না। দেশে কৃষির পাশাপাশি শুরু হয়েছে শিল্পশ্রম। কৃষকের ভাগ্য এভাবে বঞ্চিত হতে থাকলে কৃষক পরিণত হবেন শিল্পশ্রমিকে। এর ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে আমাদের। তাই সময় থাকতেই পর্যাপ্ত সংরক্ষণের সুবিধা প্রদান করে কৃষককে তার কৃষিপণ্যের মূল্য তুলতে দিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার প্রতি বছর উৎপাদিত ফল-সবজির ওপর যৌক্তিক বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিন্তু ধানের ক্ষেত্রে যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তা আরো ভয়াবহ। এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে ধান উৎপাদনে বিঘœ ঘটবে। যদি এমন পরিস্থিতির অবসান ঘটানো না যায় তাহলে ফল হবে ভয়াবহ বিরূপ। মোট কথা, কৃষক যেন বেঁচে থাকতে পারে, কৃষক যেন তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পায়, সেই ব্যবস্থা করার প্রধান দায়িত্বটি বর্তায় সরকারের ওপরই। ধান চাষে কৃষক বিমুখ হলে আমাদের কপালে দুর্ভোগ নেমে আসবে।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *