জানুয়ারি থেকে এপ্রিল চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে বাংলাদেশে ১৫৮টি ধর্ষণের ঘটনার শিকার হয়েছেন ৬১ নারী ও ৯৩ শিশু। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন। তার মধ্যে আবার ৩৯ জনই শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২০ জনকে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে দুই নারী ও শিশু। এদের মধ্যে যানবাহনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ ৩ মাসে সারা দেশে ৭০৯টি ধর্ষণের মামলা হয়। এর এক বছর পরের চিত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে ৭৯৭টি ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। তবে প্রকৃত নারী-শিশু ধর্ষণের চিত্র এর চেয়ে অনেক বেশি।
পুলিশের সদর দপ্তরের হিসাবে ধর্ষণের মামলায় শীর্ষ ৫ জেলার মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে গাজীপুর। এরপর যথাক্রমে অবস্থান কক্সবাজার, লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পটুয়াখালীর।
গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে গাজীপুরে ৩২টি ধর্ষণের মামলা হয়। এর পরে কক্সবাজারে ২৮, লালমনিরহাটে ২১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২২ ও পটুয়াখালীতে ১৫টি মামলা করা হয়।
২০১৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরে গাজীপুরে ২০, কক্সবাজারে ১৬, লালমনিরহাটে ১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫ ও পটুয়াখালীতে ৮টি মামলা দায়ের করা হয়। এ হিসেবে গাজীপুরে ১৬০ শতাংশ, কক্সবাজারে ১৭৫ শতাংশ, লালমনিরহাটে ১৭৫ শতাংশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৪৬ শতাংশ এবং পটুয়াখালীতে ১৮৭ শতাংশ ধর্ষণ মামলা বেড়েছে।
অর্থাৎ জেলাগুলোয় ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েছে। গত বছরের শুরুর দিকে ঢাকা, রংপুর ও নেত্রকোনা জেলায় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা হয়। এই তিন জেলার পরই অবস্থান ছিল দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর এবং টাঙ্গাইলের।
নারী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন এমন বেশ কয়েকটি সংস্থা সূত্রে জানা যায়, নারী নীতি, যৌতুক নিরোধ আইন, গার্হস্থ্য শ্রমের স্বীকৃতি, গৃহশ্রমিকের অধিকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আইন ও নীতিমালা কার্যকর করার ঘাটতি আছে। তাদের অভিযোগ নারী ও মেয়েশিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা, নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ও আইন কার্যকর করতে সরকারি উদাসীনতা সীমাহীন।
২০১৩ সালে ১৯ হাজার ৬০১টি নারী-মেয়েশিশু নির্যাতনের মামলা হলেও বিচার শেষ হয়নি একটিরও। এরই মধ্যে ২০১৪ সালে নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে আরও ২১ হাজার ২৯১টি। গত বছর ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ২ হাজার ৯৫১টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বাধিক। কিন্তু এসব অভিযোগের একটিরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহনে এবং কর্মস্থলে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা চেয়ে একটি রিট (রিট পিটিশন নং ৫৯১৬/২০০৮) দায়ের করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট সব কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি অফিস এবং সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ১২টি দিকনির্দেশনা প্রদান করে। যার কোনোটিই এখনও পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিয়ম পালন করেননি।
ইউএন উইমেন প্রকাশিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ৭৬ শতাংশ ছাত্রীই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরও খারাপ। যেখানে যৌন হয়রানির হার ৮৭ শতাংশ। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ৭৬ শতাংশ, মেডিকেল কলেজগুলোতে ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার। জরিপ অনুযায়ী ৫৩ শতাংশ ছাত্রী যৌন হয়রানির কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক জরিপ থেকে জানা যায়, গত ৬ মাসে দেশে শুধু গণপরিবহনে ১৫ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জরিপে উল্লেখ করা হয়, ১১ মে রাতে রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁর আড়াইহাজারে চলন্ত বাসে এক নারী শ্রমিককে বাস ড্রাইভার ও সহকারীসহ চারজন মিলে গণধর্ষণ করে। ১৩ মে ময়মনসিংহের চুরখাই এলাকায় বাসের চালক ও সহকারী মিলে এক তরুণীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ৩ মে আশুলিয়ার বাস কাউন্টারে ট্রাংক থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ জানায়, ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর ট্রাংকের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ মে চট্টগ্রামে ঈগল পরিবহনের বাস থেকে লাগেজ ভর্তি তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ, ১৯ এপ্রিল ঢাকা থেকে জামালপুরগামী ট্রেনে এক নারী যাত্রীকে ২-৩ বখাটে শারীরিক নির্যাতন করে। ২৫ এপ্রিল রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় এক গৃহবধূকে মাইক্রোবাসে নির্যাতন চালিয়ে ওই মাইক্রোবাসেই চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ৩০ এপ্রিল দুপুরে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরে চলন্ত শ্যালো নৌকায় দু’বোনকে হাত-পা বেঁধে গণধর্ষণ করে নৌকার মাঝিসহ একদল বখাটে। ২১ মার্চ বাগেরহাটের রামপাল এলাকায় চলন্ত নৌকায় গণধর্ষণ করা হয় এক গৃহবধূকে। ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পরিত্যক্ত বগিতে এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকু- এলাকায় চলন্ত প্রাইভেট কার থামিয়ে দুই তরুণীকে গণধর্ষণ করে ছিনতাইকারীরা। ১ মার্চ গোপালগঞ্জ সদরের ভেন্নাবাড়ী এলাকায় এক মেয়েশিশুকে মাইক্রোবাসে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।
বাইরে কিংবা অন্দরমহলে নারী এমনকি মেয়েশিশুরাও এখন অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এখন আর কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। নতুন করে গণপরিবহনে নারী ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশ অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনারই আসামি ধরতে পারছে না। বাস্তবায়ন হচ্ছে না হাইকোর্টের নির্দেশনাও। সর্বক্ষেত্রেই অবহেলা ও উদাসীনতার একটি সুস্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। বৃহস্পতিবার রাতে খোদ রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে চলন্ত অবস্থায় গণধর্ষণ করা হয়। এমন অবস্থায় রাজধানীসহ সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসহ কর্মজীবী নারীদের মধ্যে নতুন করে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। মহিলারা এখন গণপরিবহনে উঠতেও ভয় পাচ্ছেন। এক ধরনের অজানা আতংক এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে সর্বত্র। এ প্রসঙ্গে নারী নেত্রীরা প্রচ- ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পুলিশের উদাসীনতা ক্ষমার অযোগ্য। রাষ্ট্রও এর দায়িত্ব এড়াতে পারে না। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা এখনও সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। সরকারকে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম



Leave a Reply