ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন/বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ রোধে গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছিল ‘খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণ নিরোধ অভিযান’। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অভিযান শুরুর দেড় মাসের মাথায় এ সংক্রান্ত পরিপত্র স্থগিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তখন ওই আদেশে বলা হয়েছিল ‘শিগগিরই পরিপত্রটি সংশোধন করে জারি করা হবে’। কিন্তু এর প্রায় ৭ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত সংশোধিত পরিপত্র জারি করা হয়নি। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের তদবিরে এতোদিন ওই পরিপত্রের দোহাই দিয়ে ভেজাল বিরোধী অভিযান বন্ধ রয়েছে। একই কারণে এই পরিপত্র সংশোধন করাও হচ্ছে না। অথচ স্থগিতের পরিপত্রতেই বলা হয়েছিল খুব শিগগির এটির সংশোধন করে অভিযান শুরু হবে।
এর মধ্যে শুরু হয়েছে মৌসুমি ফলের মাস জ্যৈষ্ঠ। রাজধানীসহ সারা দেশের হাট-বাজারে সয়লাব মৌসুমি ফলে। আর এসব ফলে রয়েছে অসহনীয় মাত্রায় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। বিষাক্ত জেনেও এসব ফলই দেদারসে কিনে খাচ্ছে নিরীহ মানুষ। অথচ এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের নেই মাথাব্যথা। এ অবস্থায় নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরের মাধ্যমে বিষমুক্ত ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
সংশোধিত পরিপত্রের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ওই পরিপত্র ছাড়াও তো মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভেজালবিরোধী কার্যক্রম চলছে। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আমরা শিগগিরই বসে সিদ্ধান্ত নেব।
জানা গেছে, গত বছরের ৭ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সচিবসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবদের উদ্দেশে বলেন, ‘খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর হরমোন ও ফরমালিনের ব্যবহার প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।’ এর কিছুদিন পর গত বছরের ১১ জুন ফলমূলে বিষাক্ত ফরমালিনের বিষয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। রাজধানীর বাজারগুলোর জামে ১০০ ভাগ, লিচুতে ৯৫ ভাগ এবং আমে ৬৬ ভাগ ফরমালিন রয়েছে। এছাড়া অন্য ফলেও অসহনীয় মাত্রায় বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন সংগঠনটির নেতা আবদুস সোবহান। ওই সময় গণমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে বসে প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের ২১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘আইনশৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণ নিরোধ অভিযান’ শুরু হবে। এ কারণে গত ৮ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরিপত্রে জেলা প্রশাসককে প্রধান করে জেলা কমিটি, ইউএনওকে প্রধান করে উপজেলা কমিটি এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে সভাপতি করে মেট্রোপলিটন এলাকায় কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কমিটির উপদেষ্টা পদে রাখা হয়। জেলা ও উপজেলা কমিটি নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও বিপত্তি বাধে ‘মেট্রোপলিটন কমিটি’র গঠন ও এখতিয়ার নিয়ে।
মাঠ প্রশাসন থেকে অভিযোগ উঠে পরিপত্র জারির ক্ষেত্রে আইনশৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এবং পিআরবি, ১৯৪৩ এর রেগুলেশনের লংঘন হয়েছে। কম-বেশি ৩০ জন জেলা প্রশাসক পরিপত্র সংশোধন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেন। তাতে বলা হয়, ‘পুলিশ কমিশনারকে পরিপত্রের মাধ্যমে উল্লেখিত দায়িত্ব দেয়া ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ধারা ১০ এর লংঘন। পরিপত্রে ১৪(ক) কার্যপরিধিতে পুলিশ কমিশনারকে অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত ও কার্যক্রম মনিটর করতে বলা হয়েছে। এসব মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর ৫, ৬, ১১ ও ১২ ধারা প্রদত্ত কার্যক্রম, যা পুলিশ কমিশনারের এখতিয়ারভুক্ত নয়। পরিপত্র অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে তা পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন সমতুল্য হবে, যা পিআরবিসহ দেশের সব প্রচলিত আইনের পরিপন্থী হবে।’ ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ বিশেষ অভিযান সফল হলেও মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে দেখা দেয় সমন্বয়হীনতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র স্থগিত করে অফিস আদেশ জারি করা হয়। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় এ অভিযান।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply