সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারে আমার বরাবরই অনীহা ছিল। অনেকের অনুরোধে এখানে আসার পর দেখলাম, নতুন প্রজন্ম লেখালেখি করছে। নিজের অজান্তেই সাহিত্যচর্চা করছে। নিজেদের কৃষ্টি কালচারের ঐতিহ্যে ফিরে যেতে চাচ্ছে। শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি ছাড়া শক্তিশালী জাতি গঠন সম্ভব নয়। আমি আশাবাদী প্রজন্মের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি। এ প্রজন্মকে সংগঠিত করতেই অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আমার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। আন্দোলনটা এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ুক দেশব্যাপী, বিশ্বব্যাপী। এটাই লক্ষ্য।
ফেসবুকে আপনাকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। একটি জাতীয় দৈনিকের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। কারণ কী?
আমি ভুল কিছু লিখিনি বা বলিনি। পত্রিকাটিতে অনিয়ম ভরা। অথচ মুখে তারা বদলে দেয়া ও বদলে যাওয়ার ভুয়া স্লোগান আওড়ায়। তাদের অনেক কাজ (বিভিন্ন অনুষ্ঠানে) ফ্রিতে করে দিতাম। অতঃপর একসময় চিন্তা করলাম, ওই অনুষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দেবে, টাকা গুনবে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, কলুর বলদের মতো ফ্রি গাইব আমরা, এটা কোন ধরনের সিস্টেম? আমি সরাসরি সম্পাদককে বলে ফেললাম, গান আমাদের পেশা, অনুষ্ঠানে এলে অন্তত ১০০ টাকা দিতেই হবে। তিনি অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। জিপিএ ফাইভ যারা পায় তাদের স্পন্সর নিয়ে সংবর্ধনা দেয়। অথচ শিল্পীদের টাকা দেয়া হয় না। এসব সিস্টেম নিয়ে আমি কথা বলেছি। সম্পাদককে বলেছি, আপনার পত্রিকার কিছু কর্মচারী পুরনো ব্যাটারি হয়ে গেছে। এগুলো এতটাই বাতিল যে, রিচার্জও করা যাবে না। অপদার্থদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে বাকি জীবন শান্তিতে বাঁচুন। লাইনে দাঁড়িয়ে অনলাইনে গান বিক্রি করছে শিল্পীরা, এ ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য প্রত্যাহার করুন। বাংলাদেশের শিল্পীদের টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করতে ওই পত্রিকাটি আসলেই অনবদ্য।
দেশের প্রতিষ্ঠিত মোবাইল ফোন কোম্পানির বিরুদ্ধে কিছু কিছু ব্যাপারে আপনি সক্রিয় প্রতিবাদ করছেন। এর কারণ কী?
প্রথমত বলি, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা কোথায়। ২০১০-এর শুরুতেই আমি পেশাদারি সঙ্গীত থেকে বিরতি নেই। ২০১৩ সালে এক্স-প্রেম অ্যালবাম নিয়ে আবার ফিরে আসি। অ্যালবামের খবর পেয়েই গ্রামীণফোনের ভাস ডিপার্টমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিল। গ্রামীণফোনের সঙ্গে আমার কোম্পানি আর্বের চুক্তি হল। অবশ্য তার আগেই লোপাট করেছে শত শত কোটি টাকা। আমি ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে শেখা শুরু করলাম। প্রায় পৌনে দুই বছর তাদের পর্যবেক্ষণ করলাম। গ্রামীণফোন একটি ওয়েলকাম টিউন ডাউনলোড করতে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয় ৩০ টাকা এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট, টিউনটির মূল্য ১৫ টাকা অর্থাৎ প্রথমবার নিচ্ছে ৪৯ টাকা। গীতিকার-সুরকার-শিল্পী-কোম্পানি মিলে পাবে এককালীন সাড়ে সাত টাকা, বাকিটা ওদের। প্রতিমাসে গ্রাহকদের ৩৪ টাকার পুরোটাই নিচ্ছে গ্রামীণফোন। অর্থাৎ গানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই বানরের পিঠাভাগের মতো বাধ্যতামূলক জিপির নিয়ম মেনে নিতে হচ্ছে। তার মধ্যে বিল দেবে এক বছরেরও পর। শত শত শিল্পী কোম্পানির টাকা আটকে রেখে তারা ইন্টারেস্ট খাচ্ছে। ভাস ডিপার্টমেন্টে ঘনঘন কর্মচারী বদল করে তারা একটা নাটক সাজিয়ে রাখে আমাদের হয়রানি করতে, যেটি এখনও অব্যাহত আছে। সাড়ে সাত টাকার জন্য শিল্পীরা গান তৈরি করবে, আর তারা সারা জীবন বসে বসে খাবেন। আমি সেই কর্মকর্তাকে বললাম, তোমরা তো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রত্যুত্তরে সে বলল, আরও খারাপ, গ্রামীণফোন (টেলিনর) নরওয়ের কোম্পানি, ভাইকিংস।
শুধু গ্রামীণ ফোনই কী এসব করছে?
প্রত্যেকটি ফোন কোম্পানিই এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। বাংলালিংক বাংলাদেশের প্রায় সব শিল্পীদের গান বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছে বিনা অনুমতিতে বেআইনিভাবে। তাদের প্রতিষ্ঠিত সিস্টার কনসার্ন মবিজোন। বাংলালিংকের টাকা লোপাটের মাধ্যম এ মবিজোন। শুধু আমার গানই ব্যবহার করেছে ৭৬৮টি। মজার বিষয় হচ্ছে গ্রামীণফোন (টেলিনর, নরওয়ে), এয়ারটেল (ইন্ডিয়া), রবি (আজিয়াটা, মালয়েশিয়া), টেলিটক (বাংলাদেশ)- এ চারটি কোম্পানির সঙ্গীত-সংক্রান্ত যে কোনো বিষয় দেখে ON MOBILE নামক একটি কোম্পানি। এটি ইন্ডিয়ার হায়দ্রাবাদের একটি লো প্রোফাইল হায় হায় কোম্পানি। গীতিকার, সুরকার, শিল্পী এবং অডিও কোম্পানিগুলোকে গান বাধ্যতামূলকভাবে অন মোবাইলকেই দিতে হবে। অন্যথায় গান বিপণন বন্ধ। AKTEL নাম পরিবর্তন করে রবি হয়েছে। ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে দেশ টিভিতে প্রচারিত ‘কে হতে চায় কোটিপতি’ অনুষ্ঠানটি নিয়ে। আর গানের টাকা তো মেরেছেই। এয়ারটেলের ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। বিদেশী কোম্পানিগুলো তাদের স্বার্থে অন মোবাইলকে একচ্ছত্র আধিপত্য দিয়ে বাংলাদেশে ব্যবসার জন্য এনেছে। এ রকম কোম্পানি বাংলাদেশে অনেক আছে, যাদের সামর্থ্য আছে কাজগুলো করার। কিন্তু তাদের বিতাড়িত করেই ভারতীয় কোম্পানি অন মোবাইলকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে টেলিটক তো আমাদের কোম্পানি। তাহলে অন্যান্য দেশী CP (Content provider)-কে কেন সুযোগ দেয়া হল না? কার স্বার্থে দেয়া হল না? এটার মধ্যে জালিয়াতির যোগসূত্র অবশ্যই উন্মোচিত হবে। ইন্টারনেট থেকে টাকা লুটপাটের অভিযোগ হরহামেশাই হচ্ছে। কিন্তু কেউ আদালতে যাচ্ছে না বলেই তারা চুরি অব্যাহত রেখেছে।
বিষয়টি নিয়ে কী জনস্বার্থে আপনি আদালতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করেছেন?
এর জন্য আমি বিশদ পরিকল্পনা করে রেখেছি। শুধু আমাদের টাকা মেরে দেয়ার বিষয় নয়। আরও অনেক চুরি এবং অপরাধ রয়েছে তাদের। নানা প্যাকেজ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের একটা অংশকে রাত জাগিয়ে রেখেছে। তৈরি করেছে একটি ঘুমন্ত প্রজন্ম। সারা দেশে অসংখ্য মোবাইল টাওয়ার তৈরি করে জনস্বাস্থ্যকে ফেলেছে হুমকির মুখে। এ মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান থাকার কথা জনবসতির অন্তত তিনশ’ মিটার দূরে। কিন্তু শোভা পাচ্ছে বাড়ির ছাদে। যা পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। গাছগাছালি মরে যাচ্ছে, শিশুর জন্ম হচ্ছে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে। এজেন্ডাধারী পরিবেশবাদীরা নিশ্চুপ। তবে আমি থেমে থাকব না। এদের সঙ্গে শিগগিরই দেখা হবে আদালতে। বিদেশী বেনিয়ারা এখন রাষ্ট্র দখল করতে আসেনি। এসেছে অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য খাওয়ার জন্য।
ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি এবার। এক সময় ক্রিকেট খেলোয়াড় ছিলেন আপনি। জাতীয় দলে না খেলার আফসোস কী তাড়া করেনি কখনও?
ক্রিকেট অনেক বেশি পছন্দ করতাম। মনে আছে, ১৯৯২ সালে অনূর্ধ্ব উনিশ জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপের জোনাল রাউন্ডের খেলা খেলতে গিয়েছিলাম সিলেটে। চাঁদপুর, টাঙ্গাইল জেলাকে হারিয়ে আমরা গেলাম ফাইনালে। সঙ্গীতশিল্পী এসডি রুবেল তখন চাঁদপুর জেলা দলে ছিলেন। ফাইনালের আগে তিন দিন খেলা নেই। আমার প্রেম তখন তুঙ্গে। ম্যানেজমেন্টকে বললাম আমার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা আছে। যেতেই হবে। পরীক্ষা ছিল, দেইনি। প্রেমিকা (বর্তমানে বউ) মিতুকে একটি ফুল দেয়ার জন্য ম্যাচ শেষে জালালাবাদ এক্সপ্রেস ধরে স্ট্যান্ডিং টিকিটে কুমিল্লা ছুটে আসি। গভীর রাতে নানা কাহিনী করে ফুলটা দিয়েই আবার সিলেটে ফেরত গিয়ে ফাইনাল ম্যাচ খেললাম। ক্রিকেটের সেই প্রেম ছেড়ে আমি এখন গানের জগতে। জাতীয় দলে না খেলতে পারার কথা মাঝে মধ্যে ভাবি এটা সত্যি। তবে আফসোস নেই।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আগে বলি টিমের ব্যবসায়িক অবস্থান কোথায়। দল ভালো খেলছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের যে কোনো দেশকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের কিছু অনিয়ম সত্যিই হতাশ করে। টপ অব মাইন্ড নামে একটা কোম্পানি পাকিস্তান-বাংলাদেশ সিরিজের স্পন্সর কিনে নিয়েছিল। পরবর্তীতে মুহূর্তের মধ্যে স্বত্ব বেছে দিল প্রাণ কোম্পানির কাছে। খাদ্যে ভেজালে শীর্ষ স্থানীয় প্রাণের ব্যাপারে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। আমেরিকায় তাদের মশলা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আগামী মাসে ভারত আসছে বাংলাদেশ সফরে। আবারও স্বত্ব কিনে নিল অখ্যাত কোম্পানি টপ অব মাউন্ড। ঠিক পরদিনই বেচে দিল আরেক মালয়েশিয়ান বেনিয়া মোবাইল কোম্পানি রবির কাছে। রবি অন্তত শিল্পীদের হাজার কোটি টাকা গলধকরণ করেছে আগেই, ডাকাত তাদের বলতেই পারি। রবি আগেই নজরুলমেলা, রবীন্দ্রমেলা করে টিভি চ্যানেলের মুখে স্কচটেপ মেরে দিয়েছে। টপ অব মাইন্ড কি এবং কারা? প্রাণ কিংবা রবি সরাসরি কোনো স্বত্ব কিনতে গেল না? এ প্রশ্ন থাকল ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে। তাদের ওপর এখনও ভরসা আছে। আবার দেখলাম ইমপ্রেস গ্রুপও তেত্রিশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এতসব কিছু দেশবাসীকে হতাশ করতে পারে।
রাজনীতিতে আবার কবে সক্রিয় হবেন?
আমি জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি করি। শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক আমি। রাজনীতিতে এখনও সক্রিয় আছি। শুধু পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। কর্মী হিসেবে এখনও সক্রিয়। দেশের প্রয়োজনে, দেশের উন্নয়নে বেগম জিয়ার ডাকে সাড়া দিতে আমি যে কোনো সময় প্রস্তুত।
ভক্ত-দেশবাসীর কাছে আপনার চাওয়া কী?
খুব বেশি কিছু নেই। যা কিছু পেয়েছি দেশবাসীর কাছ থেকেই পেয়েছি। প্রিয় ভক্ত ও দেশবাসীর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের অবিরাম ভালোবাসার কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ আমি। ক্ষণিকের এ জীবনে আর চাওয়ার পাওয়ার কিছু নেই আমার। এলোমেলো শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে মাঝে মাঝে মধ্যে বিরতিতে যেতে হয়েছে। আমাকে সঙ্গীত অনেক কিছু দিয়েছে। এখন আমি শুধু বাংলাদেশকে ভালোবেসে যেতে চাই। আর কখনোই কোনো কারণেই আপনাদের ছেড়ে সঙ্গীতের বাইরে যাব না। একটা কথা বলে শেষ করতে চাই, দল মত নির্বিশেষে সবাই দেশকে ভালোবাসুন। সুখে, দুঃখে দেশের সঙ্গেই থাকুন এবং বাংলা গান শুনুন।
(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এফ আই দীপু)
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply