আদিবাসী তরুণী ধর্ষণের পর মামলায় ৫ জনের কথা উল্লেখ করেন। গণমাধ্যমগুলোতেও সেভাবে নিউজ আসতে থাকে। দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে সেখানে ‘দলবেঁধে’ ধর্ষণের কথা শোনা যায়। তবে হঠাৎ করেই ধর্ষকের সংখ্যা কমে গেল। এখন বলা হচ্ছে আসলে দুই জনই ধর্ষণ করেছে। পুরো তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এভাবে নিশ্চিত করে দুই জনই ধর্ষণ করেছে এটা বলা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। র্যাবের সামনে ধর্ষকরা যেভাবে সাদামাঠা বর্ণনা দিয়েছে তাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আটকের পর বুধবার তুষার যেভাবে সাংবাদিকদের সামনে বর্ণনা করেছে, মেয়েটির মামলার বিবরণে কিন্তু এত সহজভাবে বিবরণ নেই। ভুক্তভোগী যেখানে ৫ জনের কথা বলে মামলা করেছেন, সেখানে আসামীর প্রথম স্বীকারোক্তিকেই বিশ্বাস করে র্যাবও বলছে ধর্ষক ছিল ২ জন। প্রকৃত তদন্তের আগেই এভাবে কেন ধর্ষকের সংখ্যা কমে গেল তা নিয়ে সন্দিগ্ধ হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তুষার ও লাভলুকে ধরার পর তারা বলছে তারা দু’জনই ছিল। একজন গাড়ি চালাচ্ছিল অপর একজন ধর্ষণ করছিল। আবার পরে একজন নেমে গিয়ে অপর একজন গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে। সে আবার পেছনে আসে। এতই সহজ? কিভাবে? তখন মেয়েটি কোথায় ছিল? কেনই বা সে গাড়ি থেকে নামেনি? একজনের পক্ষে একটি গাড়ির ছিটে বসে কি এভাবে সম্ভব? এছাড়া যখন মেয়েটি নিজেই বলেছে, ধর্ষক ছিল ৫ জন। সেখানে কাকে বাঁচানোর চেষ্টা? প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
ধর্ষকের সংখ্যা নিয়ে র্যাবের কমান্ডার মাহমুদ খান দাবি করেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুজন জানিয়েছে, তখন গাড়িতে তারা দুজনই ছিল। মাইক্রোবাসে দুজনের বেশি আর কারও থাকার তথ্য তারা পাননি। প্রকৃত ধর্ষণকারীর সংখ্যা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ধর্ষণের চারদিন আগে থেকে তুষার এই ঘটনার পরিকল্পনা করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযুক্ত তুষার জানান, গত ১৭ মে তার বায়িং হাউজের দুইজন দক্ষিণ আফ্রিকার নারী নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে যমুনা ফিউচার পার্কে কেনাকাটায় যান। সাধারণত বায়িং হাউজের কোন বিদেশি বায়ার মার্কেটিংয়ে গেলে তাকে গাড়িচালকের পাশাপাশি গাইড হিসাবে কাজ করতে হয়।
যমুনা ফিউচার পার্কের দ্বিতীয় তলায় ‘টেক্সমার্ট ফ্যাশন হাউজে’ কেনাকাটার সময় ঐ গারো তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয়। গারো তরুণী ঐ দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসাবে চাকরি করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের কেনাকাটার এক পর্যায়ে সে গারো তরুণীর সঙ্গে কথোপকথনে খাতির জমিয়ে ফেলে। যাওয়ার সময় ঐ তরুণীর মোবাইল নম্বরটি নিয়ে নেয়। পরদিন সকালে ঐ তরুণীকে সে ফোন দেয়। এসময় চাকরি নিয়ে তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়। এক পর্যায়ে তার বায়িং হাউজে ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার পদে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐ গারো তরুণীর কাছ থেকে বায়োডাটা চায়। ঐ দিন তুষার তার অফিসের সামনে চায়ের দোকানে বসে বিষয়টি নিয়ে লাভলু, খোকন ও ফিরোজের সঙ্গে পরামর্শ করে। তরুণীকে ফাঁসানোর জন্য লাভলুর সঙ্গে তার পরিকল্পনা হয়।
তুষার ও লাভলু যমুনা ফিউচার পার্কে ঐ দোকানে গিয়ে গারো তরুণীর সঙ্গে দেখা করে আসে। তুষার দাবি করেন, ঐ দিন তরুণীকে সে ৮ হাজার টাকা ধার দেয়। ২০ মে তাদের মধ্যে চাকরি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আবারও ফোনে কথা হয়। তুষার তরুণীকে ২১ মে বৃহস্পতিবার সাড়ে আটটার সময় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দেখা করতে বলে।
২১ মে রাত পৌনে নয়টার সময় আশরাফ ও লাভলু যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে কুড়িল বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে অপেক্ষা করছিল। রাত সোয়া নয়টার সময় তরুণী তাদের কাছে আসলে তুষার বলে যে, সে উত্তরার দিকে যাবে। তরুণী তখন জানায় যে, তার বাসা উত্তরার জসীম উদ্দীন রোডে। সেখানে নামিয়ে দিলে চলবে। মেয়েটি গাড়িতে ওঠার পর তুষার সকল দরজা লক করে দেয়। এসময় তুষার জানায় যে, তাদের গাড়ির সামনে-পিছনে আরো গাড়ি আছে। সবাই ফলো করছে। তুষার তরুণীকে ধর্ষণ করার পর গাড়ির চালক লাভলু আসে। লাভলু ধর্ষণ করার পর উত্তরার জসীম উদ্দীন রোডে তরুণীটিকে নামিয়ে দিয়ে যায়।
আসলে তুষার যেভাবে সাংবাদিকদের সামনে বর্ণনা করেছে, মেয়েটির মামলার বিবরণে কিন্তু এত সহজভাবে বিবরণ নেই।
ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরের দিন ঐ তরুণী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) এর ৭/৯ (৩) ধারায় ৫ জনকে আসামি করে ভাটারা থানায় মামলা করেন। মামলাটি শক্তিশালী হওয়ার জন্যই তিনি অজ্ঞাত ৫ জনকে আসামি করেছিলেন বলে র্যাব জানিয়েছে।
কে এই দুই ধর্ষক:
র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান জানান, তুষারের বাবার নাম আব্দুল মান্নান খান। বরগুনার আমতলীর চুনখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে তুষার। ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ট্রলারের শ্রমিক হিসাবে কাজ নেয় সে। এরপর সে ড্রাইভিং শিখে ট্যাক্সিক্যাব চালানো শুরু করে। ৬ বছর আগে পূর্ব পরিচিত ফিরোজের মাধ্যমে সিগনেট বায়িং হাউজে গাড়ি চালক হিসেবে যোগ দেয়। তার স্ত্রী ও দুই বছরের এক সন্তান রয়েছে। অপর ধর্ষক লাভলুর বাবার নাম মোবারক আলী হাওলাদার। বাড়ি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া থানার তালতলা গ্রামে। গ্রামের মানিক চেয়ারম্যান বাড়ি মাদ্রাসা থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে। ২০০৭ সালে গাজীপুর বোর্ড বাজারে একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। পরে গুলশানের কড়াইল বস্তিতে তার ফুফুর বাসায় থেকে গাড়ি চালনা শেখে। গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাইডার নামে একটি পরিবহনে গাড়ি চালনার চাকরি নেয়। এক বছর আগে ফিরোজের মাধ্যমে সিগনেট বায়িং হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজির করিমের ব্যক্তিগত গাড়ি চালক হিসাবে চাকরি পান। পরে সে ঐ প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালক হিসাবে চাকরি পায়।



Leave a Reply