ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা গত দেড় বছরে ১৫৮ শিশু, কিশোরী ও নারী ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি ঘটনারও বিচার সম্পন্ন হয়নি। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেও গুরুত্ব পান না তারা। এসব কারণে বেপরোয়া অপরাধীরা। বিপরীতে আরও নির্যাতন, হয়রানি ও হেনস্থা হওয়ার আশংকা, এমনকি প্রাণভয়ে অনেকে পরিবারকে পর্যন্ত বিষয়টি জানাতে চান না।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু, কিশোরী ও নারীদের ওপর একের পর এক বর্বর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও প্রতিরোধকারী সংস্থা তা রোধ করতে পারছে না। ধর্ষক বা অপরাধীদেরও আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। উল্টো আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমেও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ গোষ্ঠীর শিশু ও নারীরা। ফলে একের পর এক অপরাধ বাড়ছে। কখনও পেশি শক্তি আবার কখনও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কসহ নারী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা প্রায় ৩০টি সংগঠন সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ ও দলগত ধর্ষণের শিকার নারী ও মেয়ে শিশুদের মধ্যে ১২ শতাংশ ভিকটিম হচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর- যারা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.২ শতাংশ। অপর দিকে ৮৮ শতাংশই বাঙালি জনগোষ্ঠীর, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৮.৯ শতাংশ। এ তথ্য থেকে স্পষ্ট, জাতিগত ভিন্নতার কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি যৌন সহিংতার শিকার হয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক সংগঠনের তথ্য বলছে, ২০১৪ সালে দেশে ১২২ জন ও চলতি বছরের ২৫ মে পযর্ন্ত ৩৬ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিশোরী ও নারী ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যার কোনোটারই বিচার সম্পন্ন হয়নি।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যৌন ও শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছে ১২২ নারী ও মেয়ে শিশু। তাদের মধ্যে ধর্ষণের পর ৭ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
২০১৩ সালে এ গোষ্ঠীর ৬৭ জন নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৪ সালে যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ জন বেশি।
২০১২ সালে এ গোষ্ঠীর ৭৫ জন ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। রাজবাড়ী জেলায় পাংশায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মা এবং মেয়েকে গণধর্ষণ, রাঙ্গামাটির কাউখালীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ, দিনাজপুরের পাবর্তীপুরে ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে নারীদের ওপর নির্যাতন, খাগড়াছড়িতে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অপরাধীদের শাস্তি হয়নি।
আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা জানান, অপধারীরা ধরেই নিচ্ছে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিশোরী ও নারীদের ধর্ষণ-নির্যাতন করলে তাদের কিছু হয় না। এ জন্যই দিনের পর দিন তাদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে ধর্ষণের শিকার গারো তরুণী থানায় মামলা করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯ বছরের মারমা তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় মেডিকেল পরীক্ষার ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের চিকিৎসকদের মধ্যে নানা তালবাহানা পরিলক্ষিত হয়। এমনিভাবে প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনায় মেডিকেল করাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের। ১৫ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে সবিতা চাকমাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের নাম পরিকল্পিতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেনি পুলিশ।
ফোরাম সূত্রে জানা যায়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার ৫৭ শতাংশই শিশু, যাদের বয়স ৪ বছর থেকে ১৭ বছর। ৯১ শতাংশ ঘটনা সেটেলার বাঙালিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। ৪ শতাংশ ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে আইনশৃংখলা বাহিনী এবং অবশিষ্ট ঘটনা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হয়।
ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় ২০১৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শতাধিক মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়নি। কোনো কোনো মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হলেও অধিকাংশ কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে জেল থেকে বের হয়ে আসছে। জামিনে বের হওয়ার পর ভিকটিমদের মামলা তুলে নেয়ার হুমকি বা তুলে না নিলে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু ও নারীকে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার যেসব মামলা তার কোনোটিতে কোনো দোষী ব্যক্তি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে এমন কোনো নজির নেই। ফলে অপরাধীরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্তি পেয়ে যায়। তিনি বলেন, রাজধানীতে গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে কিনা তা নিয়েও আমরা শংকিত।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply