বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুত খাতে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও সম্পন্ন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ঢাকা সফরে এই বিষয়ে ঘোষণা ও চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন একটি ঋণ চুক্তি করতে যাচ্ছে দুই দেশ।
ঢাকা ও দিল্লীর কূটনৈতিক সূত্রের, জানায়, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানী খাতে ভারতের বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছে। ভারত থেকে বিদ্যুত আমদানির ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে অংশীদারিত্ব। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বিদ্যুত কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও বাংলাদেশে রপ্তানির লক্ষ্যে ভারতে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করবে ভারতের বড় দু’টি বেসরকারি গ্রুপ। ইতিমধ্যেই সমঝোতা স্বারকের খসড়া প্রস্তুত।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জন্য মোট সাত হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২শ মেগাওয়াট আদানী পাওয়ার কোম্পানি লি: এবং ৪ হাজার ২শ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে রিলায়েন্স গ্রুপ। সমঝোতা স্বারকের খসড়া অনুযায়ী, আদানী গ্রুপ ভারতের কোনো একটি রাজ্যে ৮শ মেগাওয়াট করে দুই দফায় চারটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। ভারতের রাজ্য আইন অনুযায়ী, উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৮ শতাংশ সেই রাজ্যকে দিয়ে বাকিটা বাংলাদেশে রপ্তানি করা হবে। এজন্য প্রায় চার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।
এর বাইরে, রিলায়েন্স গ্রুপ বাংলাদেশে ৭৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার ৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি (তরলীকৃত গ্যাস) আমদানির টার্মিনাল স্থাপন করা হবে। এছাড়া ভারতের অরুনাচলের কারই-এ এক হাজার ২শ মেগাওয়াট ক্ষমতার জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে। এ বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে রিলায়েন্সের সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এ বিদ্যুতের প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশে রপ্তানি করা হবে।
ভারতের আরেক শিল্প গোষ্ঠী হিরান্দানি পশ্চিমবঙ্গের দীঘা উপকূলের কাছে যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করছে, সেখান থেকে খুলনা অঞ্চলের জন্য এ জায়গা থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির আলোচনা চলছে।
এছাড়া আসামের নুমালিগড় থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রতি বছর ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত। এখন পাইপ লাইন স্থাপনে জরিপের কাজ চলছে। মোদির সফরে এই দুই প্রকল্প নিয়েও সমঝোতা হতে পারে।
এছাড়া এ সফরে বহরমপুর(ভারত)-ভেড়ামারা (বাংলাদেশ) গ্রিড আন্ত:সংযোগ এর ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারত থেকে আরও ৫শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানী, ত্রিপুরা থেকে ১শ ও অনান্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা হবে।
জানা যায়, মোদির সফরে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানীর এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা হবে।
ঋণ চুক্তি: এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের পর একশো কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল দুই দেশ। তবে এবার মোদির সফরে এই ঋণের অর্থ দ্বিগুন হচ্ছে। চুক্তি হচ্ছে মোট ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে দেওয়া হতে পারে। অবশ্য বাড়তেও পারে দুই অংক। ঋণের অর্থ ব্যয় হবে বাংলাদেশের সড়ক, নৌ ও রেল পথের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে। অনুদানের অর্থ ব্যয় হতে পারে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে।
পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রনালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ’ (ইআরডি) একশ কোটি ডলারের ক্রেডিট লাইন স্বাক্ষর করেছিল। পরে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জি এর মধ্যে ২০ কোটি ডলারকে অনুদান হিসেবে ঘোষনা করে। সেই ঋণের অর্থে মোট ১৪টি প্রকল্পের ৭টি ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক সিনিয়র সচিব সুজাতা মেহতা গত এপ্রিল মাসে ঢাকা সফরে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিতকে নতুন ঋণের প্রস্তাব জানিয়ে যান। সড়ক, নৌ ও রেল পথে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রকল্প প্রস্তাব চায় ভারত। পরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ১৩টি প্রকল্পের একটি সম্ভাব্য তালিকা পাঠানো হয়। যদিও এতে প্রস্তাবিত কোন অর্থ উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্রমতে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত শুধু এ ঋণের প্রকল্পগুলো অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে সম্প্রসারিত করতে চেয়েছেন।
নয়াদিল্লীর কূটনৈতিক সূত্রের খবর, ভারত নতুন একশো কোটি মার্কিন ডলারের প্রস্তাব দিলেও পরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটি দ্বিগুন করার কথা বলা হয়। এর মধ্যে শিক্ষা ও খাতে ব্যয়ের জন্য ৫০ কোটি মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই। অর্থাৎ ২০০ কোটি ডলারের মধ্যে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ এবং ৫০ কোটি অনুদান। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply