সিমেন্ট তৈরির মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হওয়া ক্লিংকারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমতে কমতে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি টন তৈরিকৃত সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬০ ডলার বা ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। অথচ বাংলাদেশের সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ৮ হাজার টাকার মতো দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে। এ হিসাবে বাংলাদেশে সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে ৬০-৬৫ শতাংশ বেশি দামে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সিমেন্টের বাজারের এই চিত্রই দেখা গেছে।
একে তো আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের দাম কমার পর দেশে না কমায়নি উৎপাদকরা। উপরন্তু নিজেদের লাভের অংশ আরো বাড়াতে আসন্ন বাজেটে শুল্ক কমানোর দাবি তুলেছেন উৎপাদকরা। টনপ্রতি ৫০০ টাকার স্থলে ৩০০ টাকা শুল্ক নির্ধারণের দাবি করেছেন তারা।
এদেশের কোম্পানিগুলো উৎপাদিত সিমেন্ট আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ৬০-৬৫ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি করছে। আর নিজেদের উৎপাদন খরচের চেয়ে দাম বেশি রাখছে ৪০ শতাংশ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ৫০ কেজি ওজনের প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ টাকায়। হাইডেলবার্গের স্ক্যান সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৮৫ টাকায়, লাফার্জের সুপারক্রিট ৪৫৫, হোলসিম ৫০০-৫১০ ও আকিজ সিমেন্ট ৪৬০ টাকায়।
বিশ্ববাজারে সিমেন্টের অন্যতম কাঁচামাল ক্লিংকারের প্রধান সরবরাহকারী চীন। দেশটি থেকে মানভেদে প্রতি টন ক্লিংকার আমদানিতে খরচ পড়ে ৩০-৪০ ডলার। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দেশে সিমেন্ট উৎপাদনে টনপ্রতি ব্যয় হয় সর্বোচ্চ ৭০ ডলার বা ৫ হাজার ৬০০ টাকা। ক্লিংকারের দাম কমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিমেন্টের দাম কমেছে। চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় এখন প্রতি টন সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশে গড়ে ১০০ ডলার করে বিক্রি হচ্ছে। ফলে এদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যা যাচ্ছে মানুষের ঘাড়েই।
বেশি দামে সিমেন্ট বিক্রির কথা স্বীকার করেন উৎপাদকরাও। তবে গত কয়েক মাসে ব্যাগপ্রতি ১০/২০ টাকা কমানোর দাবি করেন তারা। তাদের দাবি, সিমেন্টে লাভের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বিতরণকারীদের পকেটে। আর বিতরণকারী ডিলাররা বলছেন, মালিকরাই বাড়তি মুনাফা করছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে সিমেন্ট শিল্পের বাজার ১৭৪ কোটি ডলারের। এর ৮৫ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ ১০ কোম্পানি। এদের মধ্যে আবার শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির হাতে রয়েছে মোট বাজারের ৪৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ দশমিক ৯১ শতাংশ দখল করে আছে শাহ সিমেন্ট। ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাজার দখল নিয়ে এর পরই রয়েছে হাইডেলবার্গ। অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেঘনা সিমেন্টের দখলে রয়েছে এ বাজারের ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, হোলসিমের ৭ দশমিক ৪ ও লাফার্জের ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
যোগাযোগ করা হলে আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আকিজ সিমেন্টের দাম কমানো হয়েছে। বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। একই কথা জানান কনফিডেন্স সিমেন্টের নির্বাহী পরিচালক নেওয়াজ মোহাম্মদ ইকবাল ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা সিমেন্টের দাম কমিয়েছি। এ বিষয়ে ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। তবে খুচরা পর্যায়ে দাম না কমলে আমাদের কিছু করার নেই।’
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেয়ার কারণে সিমেন্টের মূল্য সুবিধা গ্রাহকরা পান না। এক ব্যাগ সিমেন্টের দাম ৫০০ টাকা হলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন এবং পরিবহনে ব্যয় হয় ১০০ টাকা। এ কারণে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বেশি পড়ে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টন। এর বিপরীতে খাতটির উৎপাদন সক্ষমতা ৩ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ টন।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডিবিডি ডট কম।


