গত বছর বিশ্বকাপ ট্রফিটার নিশ্বাস দূরত্বে গিয়েও ছুঁয়ে দেখা হয়নি। বিশ্বকাপের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হচ্ছে লাতিন আমেরিকার সব থেকে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট। শতবর্ষী এই টুর্নামেন্টে ১৪ বার শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেসব এখন ধূসর অতীত। ২০০৪ এবং ২০০৭—এর দুই আসরে ফাইনালে উঠলেও দুবারই হারতে হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের কাছে। গত বছর নিজেদের মাঠে টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেও কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের ছিটকে দেয় উরুগুয়ে।
দীর্ঘ সময়ের শিরোপা খরা ঘোচাতেই চিলিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টের জন্য শক্তিশালী দল ঘোষণা করেছেন কোচ জেরার্ডো মার্টিনো। বরাবরের মতোই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের প্রাধান্য দিয়েছেন সাবেক বার্সা কোচ। গোলপোস্টে বিশ্বকাপে অসাধারণ খেলা সার্জিও রোমেরোই। বিকল্প গোলপ্রহরী হিসেবে থাকছেন নাহুয়েল গুজম্যান এবং মারিয়ানো আন্দুজার।
আর্জেন্টিনার বেহুলার বাসর তাদের রক্ষণ। হাভিয়ের জানেত্তি মাপের ডিফেন্ডার আর আসেনি। আর্জেন্টিনার রক্তে মিশে আছে ‘রক্ষণ দুর্বলতা’। কিন্তু কোপার ২৩ সদস্যের দলের ডিফেন্ডারদের নিয়ে আশা করাই যায়। দলে থাকা ৭ ডিফেন্ডারের প্রায় সবাই ক্লাব ফুটবলে এই মৌসুমে ছিলেন ফর্মের তুঙ্গে।
ভ্যালেন্সিয়ার নিকোলাস ওটামেন্ডি তো এবারের লা লিগার মৌসুম সেরা একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন। ওটামেন্ডির সঙ্গে রয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির দুই ডিফেন্ডার পাবলো জাবালেতা এবং মার্টিন ডেমিচেলিস। রাইটব্যাক জাবালেতা মধ্যে আছে জানেত্তির ছায়া। গত বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে ফন গালের নজর কেড়ে ইউনাইটেডে নাম লেখানো মার্কস রোহো আছেন। জেনিথের হয়ে রাশিয়ান লিগ জেতা এজেকুয়েল গ্যারেও আছেন।
মিডফিল্ড আর্জেন্টিনার নির্ভরতার প্রতীক। হাভিয়ের মাসচেরানো সেই নির্ভরতার কেন্দ্রে। প্রায় সব আক্রমণের ভিত গড়ে দেন এই মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে না পারা ডি মারিয়াও মাঝমাঠে থাকবেন। রিয়ালকে লা দেসিমা জিতিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া ডি মারিয়া ফাইনালে খেললে ফলটা নাকি অন্য রকম হতো। সেটা হয়তো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের নিখাদ আক্ষেপ। বিশ্বকাপ-পরবর্তী প্রীতি ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারানো ম্যাচে অবিশ্বাস্য খেলে ডি মারিয়া সেই আক্ষেপটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
ডি মারিয়ার সঙ্গে আছেন টটেনহামে খেলা আরেক উদীয়মান মিডফিল্ডার এরিক লামেলা। ইউরোপা লিগজয়ী সেভিয়ার মাঝমাঠের কান্ডারি এভার বানেগা, পিএসজির সাফল্যবিধৌত মৌসুম কাটিয়ে আসছেন মিডফিল্ডার হাভিয়ের পাস্তোরেও। জুভেন্টাসের হয়ে ট্রেবল জয়ের সামনে থাকা আরেক উদীয়মান রবার্তো পেরেইরা এবং ইতালিরই আরেক দল লাৎসিওর লুকাস বিলিয়াও জায়গা পেয়েছেন দলে।
তবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে শক্তির জায়গা তাদের আক্রমণ। বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগ তাদের। পঞ্চমবারের মতো ব্যালন ডি’অরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনেল মেসি আছেন। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইংলিশ লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন সার্জিও এগুয়েরো। বিশ্বকাপে উপেক্ষিত থাকলেও জুভদের অসাধারণ সাফল্যের কান্ডারি কার্লোস তেভেজ জায়গা করে নিয়েছেন লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল করে। গঞ্জালো হিগুয়েন ১৬ গোল করে হয়েছেন ইতালিয়ান লিগের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপের ফাইনালে দুর্দান্ত খেলা এজেকুয়েল লাভেজ্জিকেও দলে রেখেছেন কোচ।
আর্জেন্টিনা সাধারণত ৪-৩-৩ কিংবা ৪-২-৩-১ ফরমেশনেই বেশি খেলে। কোপাতে এই ছকেই খেলবে তারা। এবারের আর্জেন্টিনা দল অন্য যেকোনবারের থেকে শক্তিশালী। কোপার সবচেয়ে ফেবারিট তারাই। কিন্তু ওই যে, কী যেন একটা ঘটে যায়! সেই অপচ্ছায়া দূর করে মেসিরা পারবেন সমর্থকদের মুখে হাসির ঝলমলে রোদ্দুর এনে দিতে?
কারণ, সর্বশেষ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোপায় সাফল্য এসেছিল ১৯৯৩ সালে, লিওনেল মেসির বয়স যখন মাত্র ছয় বছর। এর পর থেকে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার অপেক্ষার ছবিটা এতটুকু বদলায়নি। একের পর এক তারকার জন্ম দিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে গত ২২ বছরে কিছু জেতেনি আর্জেন্টিনা!
সর্বশেষ বিশ্বকাপ শিরোপা ১৯৮৬ সালে। এর পর সাতটি বিশ্বকাপ গেছে। সর্বশেষ কোপা আমেরিকা শিরোপা ১৯৯৩ সালে। এর পর গেছে সাতটি কোপাও। আর্জেন্টিনার সবেধন নীলমণি বলতে অলিম্পিক ফুটবলে দুটো সোনা, যেটি ঠিক জাতীয় দলের অর্জন নয়।
স্পোর্টস ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply