শুরুতেই জানিয়ে রাখি, সাহিত্য-সম্পাদনার একাল-সেকাল নিয়ে এ গদ্য লিখতে আমার স্মৃতিকে উস্কে দিয়েছেন অনুজ কবি অনন্ত সুজন।
হালের দৈনিকলগ্ন সাহিত্যপাতা বা সাময়িকীগুলোয় যা চলছে, তাতে না আছে বৈদগ্ধ, না আছে সাহিত্য। সাহিত্য-সম্পাদক সেজে বসে আছে কতগুলো নর্দমার কীট, আর তাদের ঘিরে আছে কিছু কীটাণুকীট– এই হচ্ছে একালের দৈনিকলগ্ন সাহিত্যের দশা।
নিজেও আমি ব্রডশিট ৮ পৃষ্ঠার সাহিত্য সাময়িকী ’খোলা জানালা’ সম্পাদনা করেছি, এক যুগেরও অাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আজও অনেক পাঠক যার জন্য আক্ষেপ করেন। ঐ সাময়িকীতে শামসুর রাহমান, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, রশীদ করীম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, যতীন সরকার, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন আজাদ, সেলিম আল দীন, মোহাম্মদ রফিক, সুস্মিতা ইসলাম, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, জয় গোস্বামীর মতো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান কবি-লেখকদের লেখা যেমন নিয়মিত ছাপা হত, পাশাপাশি সম্ভাবনাময় তরুণ ও নবীনতম কবি-লেখকের লেখাও। আমাদের তারুণ্যে কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে একটি লেখা ছাপা হলে যেমন কোনও তরুণের কাছে তা লেখকস্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হত, ’খোলাজানালা’ও তরুণদের কাছে ঠিক সেইরকম ছিল। এটা আমার কথা নয়, দুই বাংলার অনেকেই বলেন।
সম্পাদনার পাঠ আমি কবি আহসান হাবীবের কাছ থেকে নিয়েছিলাম। তার সান্নিধ্যই আমাকে শিখিয়েছিল, সাহিত্য সম্পাদককে সম্পর্কবিচারী হলে চলে না। হতে হয় গুণবিচারী। সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত কলকাতার ’দেশ’ পত্রিকা থেকেও শিখেছি অনেক কিছু। সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে কত কী মহার্ঘ্য পাঠই না আছে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোল যুগ’ বইটিতে। আমাদের তারুণ্যে সে-বই হাতে-হাতে ঘুরত। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় কবিতা ছাপা হওয়ায় শামসুর রাহমান তার তারুণ্যে কতটা প্রাণিত হয়েছিলেন, অজানা ছিল না সেকথাও। যে-পত্রিকার অনুসরণে বুদ্ধদেবের ‘কবিতা’, হ্যারিয়েট মনরো সম্পাদিত জগবিখ্যাত সেই ‘Poetry’ পত্রিকারও দু-চারটি সংখ্যা তারুণ্যেই ঘেঁটে ফেলেছি। স্বভাষা-বিভাষার অনেক মুনি-ঋষির কাছ থেকে পাঠ নিয়েই জেনেছি– একজন সাহিত্য সম্পাদকের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত– সম্ভাবনাময় নবীন লেখককে খুঁজে বের করে সারস্বত সমাজের সামনে তুলে ধরা এবং তরুণ লেখকদের চলার পথ মসৃণ ও প্রশস্থ করা। তার মানে এই নয়, অগ্রাহ্য করতে হবে প্রবীণ লেখকদের। চিন্তার তারুণ্য ক্ষয়প্রাপ্ত হয়নি, এমন বয়সী লেখকরাই পাঠককে আকৃষ্ট করেন বেশি। প্রোথিতযশা অগ্রজদের পাশে নিজের লেখা দেখে অমিত প্রাণনা পাওয়ার সুযোগ থাকে নবীন লেখকদেরও। ৮ পৃষ্ঠার ’খোলা জানালা ঠিক এরকমই একটি সাহিত্য সাময়িকী হয়ে উঠেছিল। ছোটকাগজের অনেক আত্মমর্যাদাশীল কবি-লেখকই- যারা তখন বড়কাগজে লিখতেন না- সাগ্রহে লেখা পাঠানো শুরু করেন এই সাময়িকীতে। ছোটকাগজ প্রসঙ্গ আসায় শিহরণ-তোলা একটি অভিজ্ঞতা কথা মনে পড়ে গেল।
বাংলা ভাষার একদা বিখ্যাত ছোটকাগজ ’কৃত্তিবাস’-এর সম্পাদক হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই অধিক পরিচিত। সুনীলের প্রবাসকালে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় কাগজটির একাধিক সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন। ’খোলা জানালা‘য় পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবি-লেখকের লেখা ছাপা হলেও শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তখনও আমার যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। একদিন ডাকযোগে তার একটি অভিমানী চিঠি পেলাম। সঙ্গে কবিতাও। অভিমানের কারণ, তার কাছে লেখা না-চাওয়া। আর সঙ্গের কবিতাটি ছিল আমার জন্য না চাইতেই পাওয়া এক অমূল্য রতন। ’খোলা জানালা’ প্রাসঙ্গিক এমন অজস্র গল্প আছে আমার স্মৃতিশালায়। তিক্ত স্মৃতিও আছে দুটি-একটি। ভালো কিছু করতে গেলে ঐরকম কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়।
এবার একটু শুরুর কথায় ফিরি। এই গদ্য লিখতে কেন প্রণোদিত হলাম? এর আগে ছোট্ট একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম কীট-কীটাণুকীট অধ্যুষিত হালের সাহিত্যসম্পাদনা নিয়ে। ‘যেখানে দেখিবে ছাই….’-এর অনুকরণে পদ্যের ঢঙে লিখেছিলাম– ”যেখানে দেখিবে কীট, সেখানেই করো ঢিট/হাতে নয়,শব্দশরে মারো/প্রতীকে বুঝিয়ে দাও, তুমিও অনেক কিছু পারো।” আমার ঐ স্ট্যাটাসের অনেকরকম পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। তাতে বোঝা গেছে, সবাই এই সব কীট-কীটাণুকীটের ওপর ক্ষিপ্ত। সবচেয়ে খ্যাপাটে পাঠ-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কবি অনন্ত সুজন– ”আমার কীট দেখলে প্রহার করতে ইচ্ছে করে।” ঐ প্রতিক্রিয়াই এই স্মৃতিগদ্যের বীজতলা।
আহসান হাবীব যখন দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক, শামসুর রাহমান তখন মূল দৈনিকের সম্পাদক। হাবীব ভাই বসতেন দৈনিক বাংলা ভবনের চতুর্থ তলে। শামসুর রাহমানের ঘর ছিল দোতলায়। হাবীব ভাইকে কবিতা দিতে হলে শামসুর রাহমান সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় উঠে আসতেন। বিনম্র শ্রদ্ধায় কবিতা তুলে দিতেন সাহিত্য সম্পাদকের হাতে। লেখকের অনুমতি ছাড়া লেখায় কোনও পরিবর্তন আনতেন না হাবীব ভাই। এ প্রসঙ্গে নিজের দুটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। একবার আমার একটি ছোটগল্প প্রকাশের আগে গল্পটির নাম নিয়ে হাবীব ভাই দ্বিধায় পড়েছিলেন। অামাকে ফোন করে দেখা করতে বললে আমি পরদিনই তার কাছে যাই। উল্লিখিত ছোটগল্পের নাম দিয়েছিলাম ’ছন্নছুট’। আমাকে দেখেই আহসান হাবীব বলেছিলেন– ”জানি, তোমার যৌগ-শব্দসৃষ্টির প্রতি ঝোঁক আছে। ’ছন্নছুট’ও তেমন। কিন্তু যেহেতু অভিধানে ‘ছন্নছাড়া’ শব্দটি আছে, সেটাই দেবে কিনা ভাবো।” আমার সবিনয় উত্তর ছিল– “হাবীব ভাই, ’দলছাড়া’কে যদি ’দলছুট’ বলা যায়, ’ছন্নছাড়া’কে কেন ’ছন্নছুট’ বলা যাবে না?” আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন তিনি। আর কিছু জানতে না-চেয়ে গল্পটি প্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটিও একটি শব্দ নিয়ে। অন্য এক বিখ্যাত দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক আমার এক ছোটগল্পের একটি শব্দে আপত্তি তুলেছিলেন। শব্দটি যৌগ নয়, মৌল; অভিধানেই আছে– ‘ব্যত্যয়’। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ’ব্যত্যয়’ মানে কী। বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলাম– ”ব্যত্যয় মানে ব্যতিক্রম।” তিনি সঙ্গে-সঙ্গে অভিধান খুলেছিলেন। শব্দটি পেয়েও গিয়েছিলেন সেখানে। এসময় আমার সমবয়সী এক কবিকে নিয়ে ঐ সাহিত্য সম্পাদকের ঘরে ঢোকেন অগ্রজ এক কবি। তারা ঢুকতেই সাহিত্য সম্পাদক তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তারা ব্যত্যয় শব্দের মানে জানেন কিনা। দুজনের কেউই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। ফলত সাহিত্য সম্পাদক ভাবগম্ভীর গলায় আমাকে বলেছিলেন– “এখানে আমরা চারজন মানুষ আছি; তিনজনের কাছেই ব্যত্যয় শব্দটা অপরিচিত। তোমার গল্পটা আমার পছন্দ হয়েছে; তুমি যদি ’ব্যত্যয়’ বদলে ’ব্যতিক্রম’ করে দাও, তাহলেই ছাপাতে পারি।” আমি রাজি হইনি। গল্পটা তার কাছ থেকে ফেরত নিতে-নিতে বলেছিলাম– ”ধরে নিন আপনাদের তিনজনের পকেটে হাজার টাকা আছে; আমার পকেটে মাত্র পঞ্চাশ। কিন্তু পাঁচ টাকার নোটটা আপনাদের কারও কাছেই নেই, যা আমার কাছে আছে। আমার গল্পের ‘ব্যত্যয়’ শব্দটা ঐ পাঁচ টাকার নোট।” তারপর সেখান থেকে সটান চলে এসেছিলাম দৈনিক বাংলায়। হাবীব ভাইয়ের হাতে গল্পটি তুলে দিয়ে একটু আগে ‘ব্যত্যয়’ নিয়ে আমার ব্যত্যয়ী অভিজ্ঞতার কথা বলতেই তিনি জিগ্যেস করেছিলেন– “কোন মূর্খ সম্পাদকের কাছে গিয়েছিলে তুমি?” পুরো ঘটনা খুলে বলতেই তিনি ঐ বৈঠকেই আমার ছোটগল্পটি তাকে পড়ে শোনাতে বলেন। ঠিক পরের সপ্তাহেই সেটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায়। এখানেই উল্লেখ করা ভালো– হাবীব ভাইয়ের হাত দিয়ে আমার প্রথম প্রকাশিত লেখাটি কবিতা হলেও তিনি আমার বেশ কয়েকটি ছোটগল্প ছাপিয়েছিলেন। আমার একমাত্র ছোটগল্পের বই ‘আসমানী সাবান’এর প্রায় সব গল্পেরই প্রথম প্রকাশ আহসান হাবীবের সম্পাদনায়। আমার ছোটগল্প তিনি পছন্দ করতেন। বলতেন– “কবি হতে এসেছ তুমি, কিন্তু ছোটগল্প লেখা ছেড়ো না।” কবিতার পাশাপাশির আমি যে কিছু গদ্যও লিখি, তার প্রাণনা হাবীব ভাইয়ের সেই অনুরোধ।
আমাদের তারুণ্যে সাহিত্য-সম্পাদনা ছিল বটতুল্য উচ্চতার একটি কাজ। ’ব্যত্যয়’ শব্দের মানে-না-জানা ‘মূর্খ’ সম্পাদকেরও অনেক পড়াশোনা ছিল। হালের কোনও দৈনিকে শামসুর রাহমানের মতো সম্পাদকও দুর্লভ, আহসান হাবীবের মতো সাহিত্য-সম্পাদকও বিরল। অনন্ত সুজনের মতো যারা সাহিত্যের অতীত সম্পর্কে কিছু খোঁজখবর রাখেন, কীট-সাহিত্য-সম্পাদকদের কথা শুনলে তাদের রক্ত গরম হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ভাষাচিত্রী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একবার শার্টের হাতা গোটাতে-গোটাতে প্যারিসফেরত বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন, বদমাশ পত্রিকাওয়ালাদের পেটাতে যাবেন বলে। আরেক কিংবদন্তী শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তো সন্তোষকুমার ঘোষকে পিটিয়েই আনন্দবাজার পত্রিকার চাকরি ছেড়েছিলেন।
কথা এই যে, একালের মিডিয়া-বদমাশগুলো কীট। কীটকে তো পেটানোর উপায় নেই। বড়জোর অনুরোধ করা যেতে পারে– ‘নর্দমার কীট, তুমি নর্দমায় বাঁচো। ডাঙায় ওঠার চেষ্টা কোরো না। তাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।” সেই সঙ্গে অগ্রসর লেখক-পাঠকদেরও একটু দৃষ্টি পাল্টে নেওয়ার দরকার আছে। বোঝার আছে– প্রচল গণমাধ্যম এখন আর সাহিত্যের বাগান নয়– বর্জ্য নিষ্কাশন নর্দমা মাত্র। তার বাইরেই দানা বাঁধছে নতুন যুগের নতুন সাহিত্য।
আবু হাসান শাহরিয়ার: কবি, সাংবাদিক।
(লেখাটি ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)




Leave a Reply