বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

হাসিনা-মোদি সম্পর্কের উষ্ণতায় অস্বস্তি কংগ্রেসে

Hasina-Modi-AFPভারতে প্রথমবারের মতো এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ‘অন্যরকম’ উচ্চতায় যাওয়ার ইঙ্গিতে এরইমধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হয়েছে। নয়াদিল্লি ও কলকাতার একাধিক সূত্র উল্লেখ করে ভারতের আসামের প্রভাবশালী বাংলা পত্রিকা ‘দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ’ মঙ্গলবার এই সংবাদ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশে মোদির সফর উপলক্ষ্যে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের নতুন গতিপ্রবাহ দেখে কংগ্রেসের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট নেতারা এরইমধ্যে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন এবং অপেক্ষা করছেন এই সম্পর্ক আরও কতদূর যায় তা দেখার জন্য। স্থলসীমান্ত চুক্তি কংগ্রেসের আমলে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও যে বিজেপির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, তারাই এখন এটি বাস্তবায়নে একেবারে অগ্রণী হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃশ্যপটও পাল্টে গেছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যভিত্তিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধীতাতেও কংগ্রেসের সর্বশেষ বিরোধীতাতেও কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ লবির নেতাদের প্রচ্ছন্ন মদদ রয়েছে এমনও মনে করা হচ্ছে।

সাময়িক প্রসঙ্গ জানায়, এখন কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার সম্পর্ক ছাপিয়ে মোদি ও হাসিনার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। কংগ্রেসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রাখার মতো নেতা ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সববিষয়ে সবসময় যোগাযোগও রাখতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের মধ্যে আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার মতো নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। এই সুযোগে মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ায় সর্বভারতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে কংগ্রেসের পাশাপাশি বিজেপিরও একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। আর এখানেই কংগ্রেসের অস্বস্তি বাড়ছে।

নয়াদিল্লি থেকে ভারতের কূটনীতি বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন একজন সাবেক রাষ্ট্রদূতের বরাত দিয়ে সাময়িক প্রসঙ্গ উল্লেখ করে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ৬ জুন দু’দিনের সফরকে সফল করতে নয়াদিল্লির তরফ থেকে ব্যাপক আগ্রহ দেখানো হয়েছে। দুইদেশের মধ্যকার চলমান বিষয়গুলো ছাড়াও নতুন নতুন কিছু বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হওয়ার কথা চলছে। সবমিলিয়ে প্রায় ত্রিশটির মতো সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে কাজ চলছে। যদিও ২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া ৫২ দফার যৌথ ইশতেহারের ছায়াতেই মোদির সফরের প্রস্তাবিত চুক্তিগুলোও রয়েছে। ওই যৌথ ইশতেহারের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবেই ‘আপত বৈরি’ দুই দেশ নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের নতুন আলোর সন্ধান পাচ্ছে। আর এখানেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অস্বস্তি শুরু হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত বিজেপি সরকার গঠনের আগেও বাংলাদেশ ও মুসলিমদের নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছে। এমনটি বিজেপি নেতা তোঘরিয়া তো বাংলাদেশের একটি অংশ দখল করেই নেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বিজেপি এখন বাংলাদেশ বিরোধীতা ভুলে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ককে সবচেয়ে গতিশীল করার দিকে যাচ্ছে। এখানেই হয়তো কংগ্রেসের কিছুটা অস্বস্তি হওয়ার কারণ; কংগ্রেস এটা চাইতেই পারে, যে সম্পর্কের রূপরেখা তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে করেছিল, তা এখন মোদির হাত দিয়ে চূড়ান্ত হতে চলেছে।

এই প্রসঙ্গে ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি সাময়িক প্রসঙ্গকে বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের সম্পর্কের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি একাই সামলেছেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের পট পরিবর্তনের পরও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধি। এরপর ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার সময় ভারতে কংগ্রেসে একক সরকার ছিল না। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার সময় কংগ্রেস নেতৃত্বের জোট সরকার নয়াদিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। তাই আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো সম্পর্ক আরও ঝালাই করার সুযোগ তৈরি হয়। বীণা সিক্রি বলেন, এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার আগ্রহ যেমন ছিল, তেমনি কংগ্রেসের মধ্যেও বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে এমন কয়েকজন জাতীয় নেতার আগ্রহও ছিল ব্যাপক। সবমিলিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সুসম্পর্ক গড়তে সময় নেয়নি। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীতায় এই সম্পর্কের সবগুলো দিক বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

মোদির ঢাকা সফরের মাধ্যমে বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সহজ করার চেষ্টা হচ্ছে বলে নয়াদিল্লির অপর একটি সূত্রের কথা উল্লেখ করে সাময়িক প্রসঙ্গ। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আগ্রহও বেশি রয়েছে। কারণ, মোদির সরকার গঠনের আগে বাংলাদেশে ধারণা করা হচ্ছিল, কংগ্রেসের বিরোধী হিসেবে বিজেপির সঙ্গে হয়তো খালেদা জিয়ার দল বিএনপির সম্পর্ক ভালো হতে পারে। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব চিন্তা চেতনার কারণেই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক মজবুত করার নীতি গ্রহণ করা হয়। এই কারণেই নরেন্দ্র মোদি স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিস্তা নিয়েও তিনি কাজ করছেন। নয়াদিল্লির সূত্রটি জানায়, কংগ্রেস আমলে ২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায় ঢাকা যেতে অস্বীকার করলে আসলে কংগ্রেসের জাতীয় পর্যায় থেকে তা সমাধানের জোরালো চেষ্টা করা হয়নি। বরং, মমতা না যাওয়ার কারণে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রী এস কে বনসালও ঢাকা যাননি। কিন্তু এবার মমতা না যাওয়ার আগ্রহ দেখানোর পর নরেন্দ্র মোদি নিজেই বিষয়টির তাৎক্ষণিক সমাধান করেছেন। এখন দুই দেশের পরবর্তী বিষয়গুলো আসবে আলোচনায়।

কলকাতা ব্যুরো
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *