বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মানুষ কি সব সময়ই জিম্মি হয়ে থাকবে?

Sunil-Shubho-royসুনীল শুভ রায়॥

বিএনপি-জামায়াতের লাগাতার অবরোধ-হরতালে পেট্রলবোমা সন্ত্রাসে যারা পুড়ে মারা গেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন- বাস-ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপার। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে ঘুমন্ত ড্রাইভার-হেলপারকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এ ধরনের অজস্র ঘটনা ঘটানো হয়েছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে আন্দোলনের নামে এমন নারকীয়তার উদাহরণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন প্রতিটি মানুষ- সেই মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতিকে ধিক্কার জানিয়েছে- ঘৃণা করেছে- নিন্দা করেছে। সেই সব বীভৎস দৃশ্যের কথা মনে পড়লে- এখনও শিউরে উঠতে হয়। ওইসব পেট্রলবোমা সন্ত্রাস দমন করতে সক্ষম হলেও সরকার সেই সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত বিচার করে শাস্তি দিতে পারেনি। যা হোক, এটাই এখানে মূল আলোচ্য বিষয় নয়। একজন ড্রাইভার ও হেলপারকে ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার করার প্রতিবাদে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যে পরিবহন ধর্মঘট চলেছে তা নিয়েই কিছুটা আলোচনা করতে চাই।

এই আলোচনাটা যখন লিখছি- তখন দক্ষিণাঞ্চলে ছয় দিন পর ধর্মঘট প্রত্যাহৃত হয়েছে। আগেই ধারণা ছিল পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের দাবি সরকার মেনে নেয়ায় ধর্মঘট উঠে যাবে অথবা বিএনপি-জামায়াত মার্কা লাগাতার অবরোধের মতো অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলতেই থাকবে। এই ধর্মঘট থাকুক বা চলুক, যাই হোক না কেন কিছু কথা থেকেই যায়। দক্ষিণাঞ্চলের এই পরিবহন ধর্মঘটের কারণ হয়তো কারও অজানা নেই। মিডিয়ার মাধ্যমে সবাই জেনে গেছেন যে, একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটলে ডাকাত আক্রান্ত যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন- ওই ডাকাতের সঙ্গে বাসের ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও হেলপার জড়িত ছিল। যাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যে মামলা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ওই ড্রাইভার-হেলপারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখানে নিশ্চয় সরকারের কিছু করার নেই। দোষ যদি হয়ে থাকে, সেটা হল যাত্রীরা কেন বলল- ‘ড্রাইভার-হেলপার ওই ডাকাতির সঙ্গে জড়িত’ এই অভিযোগটি।

দেশে মাঝে-মধ্যেই বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটে থাকে। সব সময় সেই সব ডাকাতির সঙ্গে ড্রাইভার-হেলপার জড়িত থাকার অভিযোগ আসে না। ডাকাতরা যাত্রীবেশে বাসে ওঠে। তাদের সুবিধামতো সময়ে ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। যাত্রী আক্রান্ত হয়, ড্রাইভারও আক্রান্ত হয়। কিন্তু এইবার কেন যাত্রীরা ড্রাইভার-হেলপার-সুপারভাইজারদের জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করল। নিশ্চয় তাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ডাকাতদের সঙ্গে এদের যোগসাজশ ছিল। অথবা সন্দেহ অমূলকও হতে পারে। যাদের মাল খোয়া যায়, তাদের কিছুটা ঈমানেরও হানি ঘটে। তার জন্যও ডাকাত আক্রান্ত বাসের যাত্রীদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তারা নির্দোষ হলেও হতে পারে। আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে আসা যায় যদি, সেটাই কি এই পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের জন্য উত্তম ছিল না? জানি না পরিবহন ধর্মঘটের মুখে সরকার ডাকাতির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ড্রাইভার-হেলপারকে ছেড়ে দেবে কিনা। যদি দেয়া হয়, তাহলে নিশ্চয় তারা যখন জেল থেকে বেরিয়ে আসবে তখন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেল গেটে তাদের মাল্যভূষিত করা হবে। কিংবা সংবর্ধনারও আয়োজন করা হবে। আন্দোলনে বিজয় বলে কথা!

শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের উদ্দেশেই বলছি-আপনারাও এই দেশের মানুষ। চাপ প্রয়োগ করে বিচার ছাড়া আপনাদের দুই সদস্যকে মুক্ত করে আনলেও আনতে পারেন; কিন্তু একটি কথা থেকেই যাবে। যাদের আপনারা মুক্ত করবেন, তাদের ছবি যখন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হবে, কিংবা টিভিতে দেখা যাবে, তখন মানুষের কাছে এরা ডাকাত হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে- কারণ তারা তো নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্ত হবে না। এটা কি আপনাদের জন্য খুব মর্যাদার হবে? হয়তো তারা নির্দোষ কিংবা নয়। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক তাদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ এসেছে। তার জন্য তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনের মাধ্যমেই কি এদের মুক্ত করে আনা উচিত নয়? ডাকাতির মামলা, খুনের মামলায় যেখানে জামিন হয়, সেখানে ডাকাতির মামলায় জামিন পেতে যে খুব বেগ পেতে হতো, তাও তো নয়। আপনারা একেবারে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে চান? পরিবহন শ্রমিকরা কোনো অপরাধ করতে পারে না? করলে তাকে কি আইনের আওতায় আনা যাবে না? এটা মগের মুল্লুক, না অরাজক রাজ্য?
লেখার শুরুতে বলেছিলাম বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসের কথা। যখন বাস-ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপারদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে- তখন সেই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে এবারকার আন্দোলনকারীরা কী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন? যারা আগুন সন্ত্রাসের নিহত হয়েছেন তাদের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আজকের পরিবহন ধর্মঘটিরা কতটুকু সোচ্চার ছিলেন বা হয়েছেন- তা তো চোখে পড়ছে না। অথচ একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একজন ড্রাইভার এবং একজন হেলপারকে গ্রেফতার করায় গোটা দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষকে জিম্মি করা হয়েছে। এটা কি কোনো সুস্থ আন্দোলন, নাকি আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখানো।

এই প্রশ্নে সরকারের এতটুকু ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই। তাহলে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি কোনো ধরনের তোয়াক্কা না করার একটি খারাপ দৃষ্টান্ত থেকে যাবে। সব জায়গায় মাথানত করা যায় না। এই যে, অযৌক্তিক পরিবহন ধর্মঘট চলেছে- কিংবা চলতে থাকবে- তাতে শুধু যে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ে তা নয়। দেশের অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হচ্ছে। আমাদের পরিবহন শ্রমিক ভাইদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা আছে। নেতারা বাদে অধিকাংশ শ্রমিককে সারা দিন খেটে রাতের খাবার গোছাতে হয়। কী করে তাদের সংসার চলেছে, তা কি ধর্মঘট আহ্বানকারী নেতারা জানেন? কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকলেই হয়ে যাবে?

আমার ব্যক্তিজীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দরজা লাগানোর ব্যবস্থা হয়নি। সে সময় প্রায়ই শোনা যেত- অটোরিকশার যাত্রীরা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছে। আমাকেও সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সেটা ওই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শেষবারের ঘটনা। এর আগে পত্রিকায় চাকরি করাকালে রাতে ডিউটি সেরে বাসায় ফেরার সময় মোট ২২ বার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছি। তবে শারীরিকভাবে নিগৃহীত হইনি। ২৩তম বারের ঘটনা ছিল খুবই করুণ। ঘটনাটি ঘটে দিবালোকে। গুলশান থেকে মৌচাকের বাসায় ফিরতে হবে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম। চালকরা তাদের ইচ্ছামাফিক রুটে চলতে চায়। তার মধ্যে একটা অটো অনায়াসেই পেয়ে গেলাম। কোনো প্রকার বাক্যব্যয় ব্যতীত চালক তার বাহনে আমাকে তুলে নিল। চলতে চলতে তেজগাঁও বিজি প্রেসের সামনে পৌঁছতেই ড্রাইভার তার অটোরিকশাটি থামিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই চার যুবক অটোরিকশাটিতে উঠে আমার দুই পাশে ছুরি চেপে ধরল। আমি কোনো প্রকার শব্দ উচ্চারণ করার আগেই আমার সঙ্গে যা কিছু ছিল- যেমন নগদ হাজার তিনেক টাকা, মোবাইল, ঘড়ি ছিনিয়ে নিয়ে আমার চোখে এক প্রকার মলম আর মরিচের গুঁড়া এমনভাবে ঢুকিয়ে দিল যে, সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল- চোখ দুটোই গলে গেছে। তাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। এতটুকু অনুভব করলাম যে, আমাকে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়া হয়েছে। তারপর পথচারীরা আমাকে একটি ওষুধের দোকানে নিয়ে গেলেন। সেখানে একজন ডাক্তারও ছিলেন। যা হোক, সবার শুশ্রূষায় কোনো মতে সেরে উঠলাম। তারপর তেজগাঁও থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করলাম। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যদি ওই অটোরিকশার ড্রাইভারকে গ্রেফতার করা হতো বা গ্রেফতার করা যেত তাহলেও কি তখন তাদের সংগঠনকে তার মুক্তির দাবিতে ধর্মঘট ডাক দিতে হতো?

শ্রমিক সংগঠন তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম-ধর্মঘট করতেই পারে। তবে সেটা কি কোনো অভিযুক্তকে আইনের আওতায় না আনার দাবিতে হতে হবে? শেষ পর্যন্ত জানা গেল, দক্ষিণাঞ্চলের পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিনিময়ে মালিক-শ্রমিকদের দাবি প্রায় সবই আদায় হয়েছে। অতএব, ‘জেলের তালা ভেঙ্গেছি- অমুক ভাইকে এনেছি।’ এখন তাদের সংবর্ধনা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যিনি কার্যকরী সভাপতি, তিনি আবার বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও। তিনি তার পদের কারণে শ্রমিকদের পক্ষে থাকবেন এবং থেকেছেনও। তিনি এ ঘটনায় ফরিদপুরের এসপি সাহেবের ওপর ক্ষোভও ঝেড়েছেন বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকায় মন্ত্রী মহোদয়ের উদ্ধৃতি এভাবে প্রকাশিত হয়েছে- ‘মন্ত্রী হয়েও তিনি ফোন করে এসপিকে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এসপি চালক-মালিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। মানুষকে দিয়ে মানববন্ধন করিয়েছেন। এতে সমস্যা আরও বেড়েছে। মন্ত্রী মহোদয় এসপির উদ্দেশে বলেছেন, আপনার বিরুদ্ধেও তো মালিক-শ্রমিকরা মানববন্ধন করতে পারে। সারা দেশে মানববন্ধন করলে হাজার হাজার লোক হবে। তখন আপনি কী করবেন (প্রথম আলো ২৬ মে ২০১৫)? মন্ত্রী-কাম-শ্রমিক নেতার কথাটা ঠিক। তার শ্রমিকরা সারা দেশে মানববন্ধন করলে এসপি সাহেবরা যাবেন কোথায়? সেটা হয়তো পারাও যাবে। হতভাগ্য সাধারণ মানুষের তো কিছু করার নেই। সব সময় তাদেরই তো জিম্মিদশায় থাকতে হয়। তাদের কোনো উপায়ান্তর নেই। কথায় কথায় হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘটের ডাক আসবে- জিম্মি হবে সাধারণ মানুষ। ডাক্তাররা দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘট করবেন- মরবে রোগীরা। আইনজীবীরা ধর্মঘট করবেন- ভোগান্তিতে পড়বেন বিচার প্রার্থীরা। এমনিভাবে পেশাজীবীরা আন্দোলন করবেন, জিম্মি হবে জনগণ।

দক্ষিণাঞ্চলের পরিবহন ধর্মঘটের ঘটনায় মন্ত্রী ধমকালেন ফরিদপুরের এসপিকে; কিন্তু তার ড্রাইভার-হেলপারদের উদ্দেশে কি কিছু বলেছেন? একদা তো তিনি বলেছিলেন- চালকদের শিক্ষার কী দরকার! তারা গরু-ছাগল চিনলেই চলবে। সংশ্লিষ্ট চালক ডাকাতগুলোকে চিনতে পারলেন না? না পেরেছেন ভালো কথা- অন্তত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচন করে দোষীদের শাস্তি দেয়া হোক। আর দোষী যে বা যারাই হোক না কেন- লাখো মানুষকে কেন তুচ্ছ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জিম্মি করা হয়েছে- তার একটা কৈফিয়তও দেশের মানুষের শোনা দরকার। সাধারণ মানুষ কি সব সময় এভাবেই জিম্মি হতে থাকবে?

সুনীল শুভ রায় : লেখক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *