বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকায় মোদির মোহিত করা ভাষণের পূর্ণ বিবরণ

modi-bongobondhu_Newsworldbdভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের শেষ দিনে রবিবার ৭ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতীয় হাইকমিশনের আয়োজনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত একঘণ্টার ভাষণ দেন। মোদি তার স্বভাবসুলভ বাগ্মী ভঙ্গিতে দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

‘জনবক্তৃতা’ নামের এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য ছাড়াও ঢাকায় দায়িত্বরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ঢাকায় বসবাসরত ভারতীয় নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা ছাড়ার আগে ‘জনবক্তৃতা’য় তিনি বলেছেন, আবার আসিব, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে, এই বাংলায়। বাংলাদেশ সফরের সময়টা খুব কম হয়েছে বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।

অলিখিত উপস্থিত বক্তৃতার আদলে দেওয়া মোদির ভাষণের লিখিত রূপ নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের পাঠকদের জন্য দেওয়া হল।

নরেন্দ্র মোদি তার ভাষণ শুরু করেন বাংলায়। ভাঙ্গা বাংলায় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভাই ও বোনেরা তোমরা কেমন আছো? আমরা তোমাদের সাথে আছি। আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে চলবো। আমার বাংলা কেমন?’ ভাষণের শেষেও মোদি জীবনানন্দ দাশের আবার আসিব ফিরে কবিতার প্রথম দুইটি লাইন ব্যবহার করেন। মোদি বলেন, আমার সফর আজ শেষ হচ্ছে। এটি আমার এই সফরের শেষ কর্মসূচী। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে আমি সফর শুরু করতে চলেছি।

বক্তৃতার শুরুতে মোদি বলেন, আমার এই দুই দিনের সফর আর বাংলাদেশের নাগরিকরা ও বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা যেভাবে আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন ও সম্মান জানিয়েছেন সেটা নরেন্দ্র মোদি নামের একজন ব্যক্তির নয়। সেটা সোয়া কোটি ভারত বাসীর। এই দু’দিনের সফরের পর শুধু মাত্র এশিয়া নয় সমগ্র বিশ্ব সুক্ষভাবে পোষ্ট মর্টেম করবে। ময়না তদন্ত করবে। কেউ হয়তো মাপ কাঠি নিয়ে খতিয়ে দেখবে কি হারালাম ও কি পেলাম। কিন্তু যদি একটি বাক্যে আমাকে বলতে হয় তাহলে আমি বলবো- মানুষ এতোদিন মনে করতেন আমরা একে অপরের পিছনে রয়েছে, কিন্তু এখন বিশ্বকে স্বীকার করতে হবে আমরা পাশাপাশি রয়েছি ও সাথেও রয়েছি।

তিনি বলেন, আমার বাংলাদেশের সাথে একটি আবেগ পূর্ণ যেগাযোগ রয়েছে। এই আবেগপূর্ণ যোগাযোগ হলো ও রাজনৈতিক জীবনে আমাদের যে পথ প্রদর্শক, সেই অটল বিহারী বাজপেয়ীজি, তাকে আজ বাংলাদেশ বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে এই সম্মাননা পেয়েছি, যেখানে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা। মোদি বলেন, আমার জীবনে সবচেয়ে প্রথম কোনও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে যখন আমি যুবক ছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন আমি খবরের কাগজে পড়তাম আর এখনকার রক্ত ঝরার কথা শুনে আমারও রক্ত গরম হয়ে যেত। অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ হতো সেই শব্দ আমাদেরকে উজ্জীবিত করতো। এই কারণে নয়াদিল্লিতে যে সত্যাগ্রহ চলছিল, আমি গুজরাটের গ্রাম থেকে গিয়ে সেখানে অংশ নিয়েছিলাম। সেটিই ছিল আমার জীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ। কিন্তু আমি তখন সামাজিক জীবনে ছিলাম। কিন্তু এরপর এই আমি এখন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছি।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, আমরা ভারতবর্ষ দরিদ্র দেশ হওয়ায় আমাদের প্রতি উন্নত বিশ্বের নজর কম। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জš§ নেওয়ার পরও নানা ধরনের সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। এত কম সময়ে এখানে বারবার রাজনৈতিক সংকট এসেছে। উচুঁ নীচু পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামের পর প্রাকৃতিক দুর্যোগও ছিল। এসব সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশ এক দুর্দান্ত ও কঠিন কাজ করছে তার গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে। মোদি বলেন, কিছুদিন আগে আমি চীনে গিয়েছিলাম। সেখানকার একটি পোশাক কারখানার একজন কর্মকর্তা আমাকে বললেন, শত কোটি মানুষের দেশ আপনারা কি করছেন? আমি জানতে চাই, কেন ভাই কি করেছি? ওই চীনা ভদ্রলোক বললেন, যেখানে বাংলাদেশে ১৭ কোটির দেশ তারা বিশ্বের পোশাক উৎপাদনের দিক থেকে দুই নম্বরে রয়েছে। আর তোমরা কি করছো? মোদি বলেন, ওই কথা শুনে আমার এতো আনন্দ হয়েছিল যে, আমারই এক প্রতিবেশি এভাবে ভালো করছে এটা আমারও গর্বের ব্যাপার।

বাংলাদেশের সাফল্য আমাকেও আনন্দিত করে। তিনি বলেন, সূর্য আগে এখানে উঠে। এরপর আমাদের দেশে কিরণ দেয়। এজন্য এখানে যে উন্নতি হোক সেটা আমাদের দেশেও একদিন ঠিকই পৌঁছাবে, এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি বলতে চাই, বাংলাদেশের অনেক অর্জন আমাদের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশের অনেক রাজ্যকে বাংলাদেশের থেকে পুষ্টির ব্যাপারে ও কন্যাদের শিক্ষার ব্যাপারে শিখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাম উঠলেই আমি গর্বিত হয়ে উঠি, কারণ এই দেশের জন্য ভারতীয়রা রক্ত দিয়েছেন। আমার দেশের সেনারা বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন এর চেয়ে গৌরবের আর কিছুই হতে পারে না।

বাংলাদেশের কথা প্রসঙ্গে মোদি আরও বলেন, আমি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ জানাই। তিনি একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন শুধু উন্নয়ন। আমার সঙ্গে তার মিল রয়েছে- আমিও চাই উন্নয়ন, তিনিও চান উন্নয়ন। মোদি বলেন, ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ জিডিপি রাখা সহজ কথা নয়; এটা কোন ছোট সাফল্য নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, তা একদিন সুফল বয়ে আনবে তা আপনাদের স্পস্ট করতে পারি। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও একটি বড় বিষয়ে মিল আছে। তা হলো এদেশের ৩৫ বছরের নিচের তরুণ জনগণ ৬৫ শতাংশ, ভারতেরও ৩৫ বছরের নিচের জনসংখ্যা ৬৫ শতাংশ। এই তরুণেরা স্বপ্ন দেখে পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার। মোদি বলেন, এদের সঠিকভাবে নির্দেশনা দিতে হবে। তিনি বলেন, এখন বলতে পারি বাংলাদেশের উন্নয়ন কখনো থমকে দাঁড়াবে না।

মোদি বলেন, আজ বিশ্ব বদলেছে। একটা সময় ছিল যখন কোনো দেশের পরিচিতি হতো প্রভাব দিয়ে, কিন্তু এখন সেই দিন নেই। এখন বিশ্বের মধ্যে পরিচিতি হয় উন্নয়নবাদ দিয়ে। তিনি বলেন, এটা সেই চিন্তধারা যে খুব কম লোক এটা বুঝতে পেরেছে যে স্থর সীমান্ত চুক্তি এটা কি কেবল জমি সংক্রান্ত সমাধান। এটা কিন্তু সেই সমঝোতা নয় এটা সেই চুক্তি যা মনকে যুক্ত করেছে।

বিশ্বে সমগ্র যুদ্ধ হয়েছে জমির জন্য। কিন্তু ভারত কখনই জমির জন্য যুদ্ধ করেনি। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে এই জমি নিয়েই বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় করল। আমরা দু’টি দেশ যারা জমিকে সম্পর্কের সেতু হিসাবে দাঁড় করিয়েছি। মোদি বলেন, আজ সকালে এখানকার একটি খবরের কাগজের হেডলাইন দেখছিলাম, জমি বিনিময় চুক্তিকে তারা বার্লিন দেওয়াল ভাঙ্গার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সে সাংবাদিক লিখেছেন, তিনি সঠিক কথাই লিখেছেন।

মোদি বলেন, আজ বাংলাদেশের পর্যটনমন্ত্রী আমার সঙ্গে দেখা করার সময় বলেছেন, বাংলাদেশে গৌতম বুদ্ধ নিয়ে পর্যটন ক্যাম্পেইন শুরু করবে। এটা খুবই গর্বের ব্যাপার, কারণ আমরাও তো বুদ্ধের দেশের মানুষ। বুদ্ধ যেখানে সেখানে যুদ্ধ হতে পারে না।

মোদি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা এক হয়ে চললে কেউই ভালো কিছু বলবে না, কারণ আমরা গরিব দেশের মানুষ। কিন্তু আমরা যদি এক হয়ে চলি তবে সারা দুনিয়া আমাদের দেখে হিংসা করতে শুরু করবে।

মোদি বলেন, এখানকার যুকদের স্বপ্ন রয়েছে। যুবকদের প্রশংসা করে বলেছেন, সময় বদলেছে। এটা আমাদের দায়িত্ব যুব সমাজকে বিকাশের জন্য আমাদেরকে সুযোগ করে দিতে হবে। আমি ঢাকা বিশ্ববদ্যিালয়ের এসেছি। বিজ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে ও মেধা দিয়ে ভড়িয়ে তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা ব্ল ইকোনোমির জন্য আমরা এক জোট হয়েছি। সার্কের পাঁচিট দেশ রেয়েছে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ তাহলে আমারা সামগ্রিক শক্তিতে পরিনত করতে পারলে উন্নতি অনেক দূর নিয়ে যাওয়া যাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রসঙ্গে মোদি বলেন, গত সার্ক সম্মেলনে আমরা এই ব্যাপারে একটি চুক্তি করতে গিয়েও করতে পারিনি। কিন্তু এখন ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান নিয়ে আমরা সরাসরি সড়ক যোগাযোগের চুক্তি করতে যাচ্ছি। ইউরোপের সব দেশ এই সড়ক যোগাযোগ দিয়েই অর্থনীতিকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে গেছে।
মোদি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা সমুদ্র যোগাযোগও স্থাপন করেছি। আগে কোনো পণ্য ভারত থেকে এখানে পাঠাতে যেতে হতো সিঙ্গাপুর। এখন সরাসরি আনা নেওয়া করা যাবে।

মোদি বলেন, ঢাকায় আমরা যে ২২টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, তাকে শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে দেখা যাবে না। এটি আসলে পরিবর্তনের শুরু।

মোদি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আকাশে তুলতে যাচ্ছেন। আমি বলেছি, ভারত ছাড়া বঙ্গবন্ধু হয় কী করে? ভারতকেও সঙ্গে নিন। আমাদের স্পেস নিয়ে অভিজ্ঞতা দিয়ে আপনাদের সহযোগিতা করবো।  মোদি বলেন, আমি সার্কের আওতায় একটি স্যাটেলাইট আকাশে তোলার প্রস্তাব দিয়েছি। যার অংশী হবে সার্কের দেশগুলো। এই এলাকার কৃষি, আবহাওয়ার পূর্বাভাসও এর মাধ্যমে পেলে সবারই উপকার হবে।

মোদি বলেন, স্যাটেলাইট থেকে যদি ভারতবর্ষের ওপরের ছবি নেওয়া যায়, তবে দেখা যায় অনেক এলাকাই অন্ধকার। বাংলাদেশেরও তাই। এই কারণে আমি চাই সবখানে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিতে। ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশের ভেতর দিলে মালামাল পরিবহনের কথা উল্লেখ করে মোদি বলেন, সেই সময় এই মাল সেখানে নেওয়াই যেত না যদি না বাংলাদেশ তার সমুদ্র, নদী ও সড়ক ব্যবহার করতে না দিত। আজ সেখানে বিদ্যুতের উৎপাদন হচ্ছে, যা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বাংলাদেশকে দেওয়া হবে। এছাড়া আরও ১০০০ মেগাওয়াট অন্যত্র থেকে দেওয়ার চুক্তি হয়েছে। মোদি বলেন, সৌর শক্তির মাধ্যমে আমরা আরও উপকৃত হতে পারি।

মোদি বলেন, বাংলাদেশ অনেক বিষয়ে উন্নয়ন করেছে, নারীদের ক্ষমতায়ন তারই একটি। এদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী নেত্রী, স্পিকার, সবাই মহিলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি এখানে আছেন, তিনিও মহিলা। এটা এমন একটি দেশ যেখানে মহিলার বারবার মহিলার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। এটা একটা বিশেষত্ব। তবে পুরুষরা আবার এটাকে হিংসা করবেন না।

মোদি বলেন, ঢাকায় একটি বড় বিলবোর্ড দেখলাম, যেখানে একজন মহিলার ছবি, তিনি বলছেন, মেড ইন বাংলাদেশ। ওই মহিলা সালমা খাতুন, বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন। সালমা খাতুন আসলে বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের একটি উদাহরণ। মোদি এছাড়া বাংলাদেশের এভারেস্ট জয়ী দুই নারী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজনীনের কথাও তুলে ধরেন। তারা গরীব পরিবারের মেয়ে তারা এভারেস্ট জয় করেছে।

ক্রিকেটার আল হাসানেরও প্রশংসা করেন মোদি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলছে নতুন, কিন্তু তারা ক্ষমতা দেখিয়ে দিয়ে বিশ্বের বড় দলগুলোর কাতারে চলে এসেছে। ভারতও এখন বাংলাদেশ দলকে আর খাটো করে দেখে না।

মোদি বলেন, ঢাকায় এই সফরে সব করে যাবো এটা বলা যায় না। বাংলাদেশের সাথে সাথে চলবো। আর বাংলাদেশে যখন এসেছি তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা হবেই। পাখি বাতাস আর পানি এদের ভিসা লাগে না। পানির জন্য কোনও রাজনীতি হতে পারে না। এটা মানবিক মূল্যবোধের উপর নির্ভর করবে। তিস্তার চুক্তি আমরা এক জোট হয়ে করবো। বিশ্বাস রাখুন, বিশ্বাস ভেঙ্গে গেলে চলবে না। আমি যেমন বাংলাদেশের পাশে থাকবো, তেমনি ভারতেরও অন্য রাজ্যগুলোকে আমার পাশে রেখে তো চলতে হবে।

সীমান্ত নিয়ে মোদি বলেন, কখনো নো সীমান্তে এমন ধরনের ঘটনা হয় যে কোন মৃত্যু সবার জন্য বেদনার। গুলি এখান থেকে চলুক বা যেখান থেকেই চলুক বিষয় তা নয়। আমাদের সীমান্তে এমন ঘটনা যেন না হয়। আমাদের মধ্যে যারা উত্তেজনা তৈরি করতে চায় তা করা যাবে না। এই জন্য আমরা মানবপাচার নিয়ে চুক্তি করেছি। কারণ, ভারতের অনেক এলাকায় অবৈধ বাংলাদেশিদের নিয়ে সমালোচনা আছে। এখন এটা আর হবে না।

বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লাইন অব ক্রেডিটে ২০০ কোটি ডলার চুক্তি করেছি। আমি চাই, ভারতের লোকেরা এখানে আসুক ব্যবসা করুক।  ভারতের পণ্যই শুধু বাংলাদেশে আসবে এটা ঠিক নয়, আমি চাই বাংলাদেশ থেকেও পণ্য ভারতে যাক।

জাতিসংঘের সমালোচনা করে মোদি বলেন, ৭০ বছর হতে চললেও জাতিসংঘ চলে পুরনো নিয়মে। এটা পাল্টাতে হবে। ভারত এতো বড় দেশ, এতো মানুষ, বিশ্বশান্তির জন্য এতো প্রাণ দিয়েছে ভারতীয়রা তবুও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পদ পাচ্ছে না। মোদি বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৭৫ হাজার ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৯০ হাজার ভারতীয় বিশ্বের অন্য দেশে শান্তি আনতে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু তবুও নাকি ভারত বিশ্বশান্তির জন্য কিছু করেনি। এছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের যে ৯০ হাজার সৈন্যকে আমরা আটক করেছিলাম, তাদের তো কিছু করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের ছেড়ে দিয়েছি। তাদের তো জিম্মি করে কিছু করিনি। এখন তো একটি প্লেন হাইজ্যাক করে কয়েকজনের জন্য কত কিছু আদায় করা হয়। কিন্তু সেই সময় ভারত তো কিছু করেনি; বিশ্বশান্তির জন্য এই পদক্ষেপের কারণেই তো ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদে সদস্য করা যায়।

সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে মোদি বলেন, সন্ত্রাসবাদ কি, কেন তারা এটা করে। কি লাভ হয় তাদের। বিশ্বে অনেক কিছু করা গেছে, কিন্তু এখনও সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করার সঠিক উপায় বের হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন মহিলা হয়েও বলেছেন তিনি সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখিয়েছেন। এটা আমি প্রশংসা করি। সন্ত্রাসবাদ মানবতার শত্র“। মোদি বলেন, আমরা কে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, কে করিনা, তা বিষয় নয়, বিষয় হলো আমরা মানবতায় বিশ্বাস করি। এই মানবতা ইস্যুতেই আমরা এক হতে পারি।

মোদি তার সরকার গঠনের সময়কার কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি শিশু যখন দোলনায় থাকে, তখনই তার ভবিষ্যত চলন বলন বোলা যায়। আমার সরকার তখনও গঠন হয়নি, কিন্তু আমি সার্ক দেশের সব রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে ডেকেছিলাম। এটার জন্য যে, আমরা ভবিষ্যতে সবাই এক হয়ে চলতে চাই।

মোদি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আমার ভাবনা একটি স্থানে একই। এটি হলো আমিও চাই উন্নয়ন, তিনিও চান উন্নয়ন। আমাদের মনের ইচ্ছাই হলো দেশের উন্নয়ন করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উন্নয়নের পথ চলায় আমরা পাশে থাকতে চাই।

বক্তব্যের এই পর্যায়ে মোদি বলেন, আমার এই যে সফর তাতে সময় একটু কম হয়েছে। কিন্তু আমার জন্য এই যাত্রা ও সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি যখন দেশে ফিরে যা.ি আমাকের অনেকেই বলেছে কয়েকদিন বেশিদিন থাকতেন। মোদি বলেন, আমি তো থাকতেই চাই। এদেশের একটি প্রতিষ্ঠান আছে, নাম আড়ং, সেখানে কতকিছু পাওয়া যায় বলে শুনেছি। আমার ইচ্ছা ওই আড়ংয়ে যাবো, এছাড়া গান্ধিজীর নোয়াখালী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িও যেতে ইচ্ছা করে। এছাড়া বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে নৌকায় বসে তরুণদের সঙ্গে আড্ডা দিতেও ইচ্ছা করে খুব। মোদি বলেন, গতকাল রাতে মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন বাংলাদেশের আথিতেয়তা অনেক বেশি; আমি দেখছি আসলেই তাই, তবে সময় খুব কম হয়ে গেল। এজর‌্য আমি চাই আবার বাংলাদেশে আসবো।

ভাষণের শেষে মোদি ভাঙা বাংলায় বলেন, ‘আবার আসিব, আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে, এই বাংলায়, আবার আসিব, আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে, এই বাংলায়।’

জয় বাংলা॥

জয় হিন্দ॥

আরও পড়ুন