বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ছাদে বাগান নিয়ে কলকাতায় চলছে ট্যাক্সি

Green-Taxi-Kolkataকলকাতায় প্রচণ্ড গরমে যারা কাজে বের হন আর ট্যাক্সিতে যাতায়াত করেন, তাঁদের অনেকেই এখন আশা করে থাকছেন যে একটি বিশেষ ট্যাক্সি তাঁর সামনে এসে হাজির হোক। অন্য প্রায় চল্লিশ হাজার ট্যাক্সির মতোই এটার রঙ-ও হলুদ, তবে কিছুদিন হল মাথায় একরাশ সবুজ নিয়ে চলছে ওই বিশেষ ট্যাক্সিটা, যার ভেতরেও সবুজের মেলা। ট্যাক্সিটির চালক গাড়ির নাম দিয়েছেন সবুজ রথ। ট্যাক্সির ছাদে তিনি বসিয়েছেন ঘাসের বাগিচা আর ভেতরে ছোট টবে অনেকগুলো গাছ।

ওই সবুজ রথে চেপে যেতে যেতে দেখা গেল পথচলতি মানুষ কেমন অবাক হয়ে দেখছেন একরাশ সবুজের চলে যাওয়া বাচ্চারা তাদের বাবা-মাকে ডেকে দেখাচ্ছে, আবার পাশ দিয়ে বাইকে চেপে যাওয়ার সময়ে কেউ অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছেন চালক ধনঞ্জয় চক্রবর্তীকে। আর প্রচণ্ড গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সির মতো না হলেও, ভেতরটা যে বেশ ঠাণ্ডা, অনুভব করা গেল।

চক্রবর্তী বলছিলেন, “ছোটবেলা থেকেই গাছ ভালবাসেন তিনি। সুযোগ পেলেই গাছ লাগান। কিন্তু আজকাল নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, অথচ নতুন গাছ কেউ লাগাচ্ছে না। যারা ট্যাক্সিতে চরবেন, তাঁদের তো সচেতন করে তুলতে পারব গাছ ভালবাসুন বলে।

আর আমি যদি ট্যাক্সির ভেতরে বাগান করতে পারে, যে কেউ নিজের বারান্দায়, ছাদেও বাগান করতে পারেন। সেই ভাবনা থেকেই ট্যাক্সিতেই গাছ লাগানোর পরিকল্পনা।“ ধনঞ্জয় চক্রবর্তী নিজে এই ট্যাক্সিটার মালিক নন, তিনি শুধুই চালক।

আর নিজের জমানো প্রায় তিরিশ হাজার টাকা খরচ করেছেন ট্যাক্সির ছাদে ঘাসের বাগান তৈরি করতে। তাঁর কথায়, “একটা পুরনো ট্যাক্সির ছাদ কিনে এনেছিলাম।

সেটাকে গ্যারেজে দিয়ে একটা ট্রে-র মতো বানাই। তারপর ভেতরে ফাইবার গ্লাসের একটা আস্তরণ দিই। তারপরে স্তরে স্তরে পাথরকুচি, সাদাবালি, জাল আর তার ওপরে মাটির আস্তরণ রয়েছে।

এর ওপরেই ঘাস লাগিয়েছি কয়েকদিন আগে।“ মি. চক্রবর্তীর সঙ্গী রাজু সাউ বলছিলেন ধনঞ্জয় চক্রবর্তীর সবুজ-রথ দেখে অনেক চালকই উৎসাহ পেয়েছে, কিন্তু সবার খরচ করার সামর্থ্য নেই।

ধনঞ্জয় চক্রবর্তীর সবুজ রথের নিয়মিত যাত্রী মি. গুপ্তর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেমন মনে হয় এই বিশেষ ট্যাক্সিতে উঠলে? মি. দত্ত বলছিলেন, “তিনটে অনুভূতি হয় এই ট্যাক্সিতে উঠলেই। প্রথমত:আমরা যারা ছোট ফ্ল্যাটে থাকি বলেই হয়ত প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করার একটা স্বভাব তৈরি হয়েছে। সেই অবজ্ঞার মনোভাবের জন্য লজ্জা পাই। দ্বিতীয়ত, উষ্ণায়নের যুগে প্রকৃতিকে যে ভালবাসতেই হবে, সেটা মনে হয়। আর তিন নম্বর হল, যেভাবে ধনঞ্জয় গাড়িটাকে সাজিয়ে তুলেছে, তা দেখে মনে হয় কোন মানুষের মধ্যে যে কীভাবে ক্রিয়েটিভিটি লুকিয়ে আছে, সেটা আমরা ধারণাও করতে পারি না।“

সবুজ রথের সারথি ধনঞ্জয় চক্রবর্তী যে শুধু গাছ ভালবাসেন তা নয়। নিজে কিছুটা অপটু হাতে ছবিও এঁকেছেন নিজের গাড়ীতেই আর সঙ্গে কিছুটা অ্যাক্টিভিসমও করেন।

যাত্রীদের পরিবেশ সচেতনতা আর সবুজ রথের বিবরণ নিয়ে তৈরি দুটো লিফলেট অবশ্যই দেন আর সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আরও কিছু চালককে সঙ্গে নিয়ে গোটা কুড়ি ট্যাক্সির একটা মিছিলও করেছেন – পরিবেশ আর গাছ নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে।

কলকাতার মানুষের ট্যাক্সি চালকদের সঙ্গে ঝগড়া লেগেই থাকে – চালকদের বেশী ভাড়া চাওয়া, গন্তব্যে না যেতে চাওয়া – এসব নিয়ে। কিন্তু সবুজ রথ এসবের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তিক্রম হয়ে উঠেছে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই।

অমিতাভ ভট্টশালী, কলকাতা

আরও পড়ুন