বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সিটি নির্বাচনের অনিয়ম তদন্ত না হওয়া লজ্জার: ঢাকার ব্রিটিশ দূত

UK-HC-Bibson-Dhaka-11-06-15ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এতোদিন পর নিজের অসন্তুষ্টির কথা আবারো বললেন ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। নির্বাচনী অনিয়মগুলো খতিয়ে না দেখাকেও ‘অত্যন্ত লজ্জা’র বলেও মন্তব্য তার।  বৃহস্পতিবার ১১ জুন তিনি ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রসঙ্গে ব্রিটিশ এই দূত বলেন, শুধু নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। প্রতিমাসে, প্রতিসপ্তাহে ও প্রতিদিন সরকারের জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রব্ধা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই গণতন্ত্র। তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচন বর্জন যেমন হতাশাজনক তেমনি তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে হওয়া অনিয়মগুলোর কোন তদন্ত না হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে কোনও আইনী চ্যালেঞ্জও নেওয়া হয়নি। তবে নির্বাচনের বিষয় যাই হোক, নবনির্বাচিত তিন মেয়র সিটি কর্পোরেশনগুলোকে সুখী ও সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করতে পারবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। পৃথক এক প্রসঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিরও প্রশংসা করেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিক্যাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের উৎসবমূখব পরিবেশের জন্য আমরা নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কত সুন্দরভাবে নির্বাচন হচ্ছে । কিন্তু দুপুরের পর সেই পরিবেশ আর থাকেনি। বিএনপিও দুঃখজনকভাবে নির্বাচন বর্জন করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনাটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছিল সেগুলোও খতিয়ে দেখা হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু সেটি হয়নি। আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত লজ্জার। অবশ্য কোনও পক্ষ থেকে আইনী চ্যালেঞ্জও করা হয়নি।

হাইকমিশনার বলেন, লন্ডনের মেয়র নির্বাচনের দিকে দেখুন। তারা লন্ডনকে পরিবর্তন করেছেন। আমি আশা করি, বাংলাদেশের তিন সিটি কর্পোরেশন মেয়রও লন্ডনের এই অনুপ্রেরণাকে ধারন করে জনগনের জন্য কাজ করবেন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামকে বসবাস শহরে পরিণত করতে সকলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উপস্থিতি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বৃটিশ হাইকমিশনার বলেন, শুধু নির্বাচনই গনতন্ত্র নয়। প্রতিমাসে, প্রতিসপ্তাহে ও প্রতিদিন সরকারের জবাবদিহিতা, গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রব্ধা  এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই গনতন্ত্র। আসলে গনতন্ত্রকে কোনভাবে সংগায়িত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, নির্বাচনগুলোতে বিএনপি অংশ না নেওয়া হতাশাজনক। আমি জানি না, তারা কিভাবে এর উপযোগিতা ব্যাখা করবেন। এতে কী লাভ হবে তাও শেষ পরিণতির আগে বোঝার কোন উপায় নেই।

হাইকমিশনার বলেন, সর্বশেষ দু’টি নির্বাচন অংগ্রহনমূলক হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। জনগন গনতন্ত্র চায়, তারা গণতান্ত্রিক দেশ দেখতে চায়। একারণেই বার বার হোঁচট খেয়েও বাংলাদেশের গণতন্ত্র উঠে দাড়ায় ও সঠিক পথে চলে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির প্রশংসা করে গিবসন বলেন, বাংলাদেশের জšে§র পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনও সঙ্গে বৈরীতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব শীর্ষক যে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে তা অতুলনীয়। মৃত্যুদণ্ড প্রথা সম্পর্কে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড দিতে দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র একটি ক্ষেত্রে এ ধরনের শাস্তি দিতে দেখা গেছে। এটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশ সরকারও ধীরে ধীরে মৃত্যুদণ্ড প্রথা রহিত করার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

ব্লগার হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমি ব্লগার হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই। কারণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। এছাড়া ব্লগার হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে তাদের বিচারে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না । মত প্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বৃটিশ হাইকমিশনার।

২০০২ সালে নিজে প্রথমবার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার কথা উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, এই ১৪ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে দায়িত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। বাংলাদেশকে কমনওয়েলথের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, যুক্তরাজ্য সারা বিশ্বে মানবাধিকার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। এজন্য কিছু নীতি অবশ্যই পালন করে চলতে হবে বলে মন করে। রাষ্ট্রীয় শক্তিতে স্বেচ্ছাচারীভাবে ব্যবহার করা যাবে না। রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সকলক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক উপায় মেনে চলতে হবে। সুশাসন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো কমনওয়েলথের চার্টারেও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে- নেতৃত্বকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। অসহনশীল ও শ্রব্ধাবোধ রাখতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা করতে হবে। জনগণকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তরুন প্রজš§কে এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ কমনওয়েলথের বৃহৎ সদস্য রাষ্ট্র। সেকারণে বাংলাদেশকে এই নীতিগুলো পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

হাইকমিশনার গিবসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। এগুলো হলো- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্যাতন প্রতিরোধ, মৃত্যুদণ্ড প্রথা রহিত, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পালনের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার  এবং ব্যবসা ও মানুষের অধিকার।

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অংশীদারিত্ব চলছে বলে উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, আমরা অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, দরিদ্রদের জন্য বাজার সৃষ্টি, ব্যবসার ব্যয় কমানো, আভ্যন্তরীন ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বনিয়ন্ত্রিত ক্লিয়ারিং হাউজ, ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নাম্বার ও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে সহযোগিতার বিষয়গুলো সহজেই চোখে পড়ে বলে উল্লেখ করে হাইকমিশনার গিবসন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চারঞ্চলের পরিবেশ উন্নয়নে ‘চর লাইভলিহুড প্রোজেক্ট’-এ যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের অনুদানের বিষয়টি অংশীদারিত্বেরই ধারণা তুলে ধরে।

গিবসন বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। সরকার বিদেশি বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে থাকা দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলোর সমাধান করবে। তাহলেই বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতি করবে। তিনি বলেন, সর্বশেষ বাজেটে ঘোষিত সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাংলাদেশের বানিজ্য ও বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ১০ শতাংশ হয়েছে যুক্তরাজ্যে এবং যুক্তরাজ্যে মোট আমদানির ১ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বানিজ্য হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্য কখনোই মানবিকতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। আমরা সবাই রানা প্লাজায় স্বচ্ছতা ও আইনের লঙ্ঘন দেখেছি। যুক্তরাজ্য এই সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে। গার্মেন্টস খাতের উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কমীদের অধিকার প্রতিষ্ঠান জন্য যুক্তরাজ্য ৭ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রেতাদেরকে তাদের দায়িত্ববোধ বাড়ানোর জন্য বার বার আহবান জানিয়েছে। হাইকমিশনার বলেন, আমরা জাতিসংঘের ব্যবসা ও মানাবাধিকার নীতি এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সকল পদক্ষেপকে সমর্থন করি।

অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার ছাড়াও বক্তব্য রাখেন ডিক্যাব সভাপতি মাসুদ করিম ও সাধারণ সম্পাদক বশির আহমেদ ।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *