বাংলাদেশের রাজনীতির চেনা পথ থেকে সরে এসে বিএনপি নতুন কৌশলে চলতে শুরু করেছে। বড় এ দলটি ভারত ‘বিরোধিতার’ নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। দেশী-বিদেশী চাপের মুখে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। রাজনীতিতে হঠাৎ করে বিএনপির এ অবস্থান পরিবর্তনকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে নিলেও ক্ষুব্ধ তাদের শরিক দলগুলো। বিশেষ করে ভারত ‘বিরোধিতার’ রাজনীতি থেকে সরে আসায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক বেশিরভাগ দলই হতাশ। তাদের মতে, ভারতের বিরোধিতা না করলে বিএনপি জোটের রাজনীতিই থাকে না।
শরিক দলগুলোর নেতাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগসহ তাদের শরিকরা বরাবরই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই চলে আসছে। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের শরিকরা ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত। বিএনপি জোট গোপনে যাই করুক প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী রাজনীতি করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভোটের রাজনীতিতে বিএনপিসহ তাদের শরিকরা ভারত বিরোধিতার সুফল ঘরে তুলেছে। কিন্তু হঠাৎ করে এ পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিএনপির ভোটের রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিএনপি আগামীতে ভারতবিরোধী একটি বড় অংশের জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দলটির নীতিতে পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে, যার প্রতিফলন পড়ছে নেতাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে। তারা অতীতে ভারত বিরোধিতার খোলস থেকে বেরিয়ে দেশটির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক উন্নয়নে নজর দিয়েছে। পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে তারা এ ধরনের চিন্তা করছেন বলে জানা গেছে। তারা বলেন, ভারতের মনমোহন সিং সরকার ঐতিহ্যগতভাবেই একটি দলকে সমর্থন জুগিয়ে গেছে। বর্তমানে ভারতের ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন দলটির নীতির সঙ্গে বিএনপির বেশ কিছু বিষয়ে মিল আছে। মূলত এ লক্ষ্যেই তারা কূটনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে। এ লক্ষ্যে দলের দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা কাজ করে যাচ্ছেন। কাজ শেষ হওয়ার আগে দলটি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র তৈরি করছে। বিগত সময় সীমান্ত চুক্তিকে গোলামির চুক্তি বলে সমালোচনা করেছে। কিন্তু ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরির অংশ হিসেবে বর্তমানে বিএনপি এই প্রথম সীমান্ত চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হোক আর সমঝোতা স্মারকই হোক বিএনপি তার চরম বিরোধিতা করবে এটা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এবারের চিত্র পুরো উল্টো। এই অঞ্চলের কানেকটিভিটিকে স্বাগত জানিয়েছে তারা। অন্যান্য চুক্তির বিরোধিতা না করে সেগুলো যাতে দেশের স্বার্থে হয় সেদিকে সরকারকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে নেতারা।
যদিও বিশ দলীয় জোটের কেউ কেউ এ মতের বিরোধিতাও করছেন। তাদের মতে, বিএনপির সঙ্গেই তারা জোট বেঁধেছে। মূল দল যদি তাদের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনে, তা শরিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। বিএনপির অবস্থান পরিবর্তন মানে এ মুহূর্তে জোটের অবস্থান পরিবর্তন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে জোটের সব দলের সম্মতি নাও থাকতে পারে। কাজেই এ ধরনের ঘোষণা দেয়ার আগে অবশ্যই জোটের বৈঠকে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল বলে তারা মনে করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের একাধিক নেতা বলেন, এক সময় তারা ভারতের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। এখন অবস্থান পরিবর্তন করায় তারা কি বলবেন। হঠাৎ করে তারা ভারতের প্রশংসা শুরু করলে জনগণ তাদের কিভাবে গ্রহণ করবে। ভোটের রাজনীতিতে এর কি প্রভাব পড়বে এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন ছিল বলে তারা মনে করেন। তবে নাম উদ্ধৃত করে কেউ কিছু বলতে অস্বীকার করেন। জোট নেতাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে অবশ্যই নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে তারা একা নয়। সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেয়া উচিত। তাদের মতে, বিএনপি হুটহাট সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার প্রয়োজন মনে করে না তারা। শরিক দলের নেতাদের মতে, ‘ভারত বিরোধিতা’ থেকে সরে এলে বিএনপির রাজনীতিই থাকে না।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একাংশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লিংকন শুক্রবার বলেন, বিএনপির সঙ্গে ভারতের কোনো শত্র“তা নেই। কখনও ছিলও না। তবে বিএনপি ভারতের অনেক অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। এ কারণে হয়তো অনেকে বিএনপিকে ভারতবিরোধী ভাবে। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিএনপির এ ভূমিকাকে সব সময় সাদরে গ্রহণ করেছে। আশা করি, ভবিষ্যতেও বিএনপি জাতীয় স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।
২০ দলীয় জোটের আরেক শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আগেও যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখনও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের বৈঠক এটাই প্রমাণ করে। তবে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে তাদের আরও সুসংগঠিত হতে হবে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি সঠিক পথেই চলছে।
জাতীয় পার্টি- বিজেপি সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আমরা ভারতবিরোধী নই। আমরা চাই, ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে আমরা। তবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমরা। জামায়াত দাবি করে তারা ইসলামিক দল। আগের মতো এসব ইসলামি দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান নেই। বিএনপি যদি জামায়াতকে ছেড়ে দেয়, সে ক্ষেত্রে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ ২০ দলের সবারই জোট হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। এখানে যদি জামায়াতকে জোট থেকে বিএনপি বের করে দেয়; তাহলে ১৯ দলীয় জোট হবে। কারণ ২০০১ সালের রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট আর বর্তমান এক নয়। জনপ্রিয়তা থাকলেই হবে না; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থনসহ আরও বেশকিছু উপাদান থাকতে হবে।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, বিএনপি যেমন তাদের নিজেদের রাজনীতি করে; তেমনি ২০ দলের অন্য দলসমূহ তাদের মতো রাজনীতি করে। বিএনপি জামায়াত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তারা কি করবে সে সম্পর্কে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে। জামায়াত ছাড়া ঠিক হবে কিনা- জানতে চাইলে নেজামী বলেন, রাজনীতিতে ঠিক-বেঠিক বলে কিছু নেই। এখানে শেষ বলেও কোনো কথা নেই। সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে বলেন, এ চুক্তি-তো নতুন নয়। ভারত শুধু আদালতের রায় মেনেছে। তারা শুধু দায় পরিশোধ করেছে।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আমরা ভারতবিরোধী নই; আমরা ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। আমরা চাই, ভারত আমাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে। পাশাপাশি আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। যেভাবে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply