বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে মোটরযান চলাচল চুক্তি সই হচ্ছে সোমবার। এ চুক্তির ফলে চার দেশের মধ্যে বাধা ছাড়াই চলবে পণ্য ও যাত্রীবাহী মোটরযান। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িতেও দেশগুলো ভ্রমণ করা যাবে। এক্ষেত্রে বিদেশী যানবাহন স্থানীয় ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি তেল কিনতে পারবে না। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যেই নিতে হবে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল। চুক্তি সইয়ের পর দুই বা তিন দেশের মধ্যে পৃথক তিনটি প্রটোকল সই হবে। এর পর যান চলাচল শুরু হবে। তবে প্রটোকল চূড়ান্ত করার আগে রুট ও ট্রানজিট ফি চূড়ান্ত করবে দেশগুলো। এজন্য শিগগিরই কাজ শুরু হবে। আর গাড়ি চলাচল শুরু হতে পারে আগামী বছরের শুরুর দিকে।
১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্ফুতে ‘বিবিআইএন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট (এমভিএ)’ সই করবেন চার দেশের সড়ক পরিবহনমন্ত্রী। এর আগে দেশ চারটির সড়ক পরিবহন সচিব আজ চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসছেন। এজন্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল গতকাল থিম্ফুতে পৌঁছেছে।
বিবিআইএন এমভিএর আওতায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রবেশের জন্য প্রতিটি গাড়িকে পৃথক ট্রানজিট ফি দিতে হবে। পাশাপাশি পণ্যবাহী গাড়ির জন্য পৃথক কর ও শুল্ক দিতে হবে। প্রতিটি দেশ পৃথকভাবে ফি ও শুল্ক-কর নির্ধারণ করবে। তবে এতে কোনো পরিবর্তন হলে অন্য দেশগুলোকে জানাতে হবে। এছাড়া পণ্যবাহীর গাড়ির ট্রানজিটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে আর্থিক গ্যারান্টিও দিতে হবে। প্রতিটি দেশে গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে সে দেশের কাস্টমস নীতিমালা অনুসরণ করা হবে।
এক দেশের গাড়ি অন্য দেশে নির্ধারিত রুট ছাড়া অন্য কোনো সড়ক ব্যবহার করতে পারবে না। এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশে যাত্রী ওঠানামা করতে পারবে না। অন্য কোনো দেশ অতিক্রমের সময় জ্বালানি তেল প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে তা কিনতে হবে। স্থানীয় যানবাহনের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের ভর্তুকিমূল্যের জ্বালানি পাবে না বিদেশী যানবাহন।
চুক্তির আওতায় প্রতিটি যানকে অন্য দেশে চলাচলে রুট পারমিট নিতে হবে। নিয়মিত চলাচলকারী যানবাহনকে এক বছরের জন্য এ পারমিট দেয়া হবে। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিটি দেশ এ-সংক্রান্ত তালিকা বিনিময় করবে। কোনো দেশ চাইলে প্রতি বছর এ তালিকা পরিবর্তন করতে পারবে। যে দেশের ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে, সে দেশের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তা সার্চ ও ইন্সপেকশন করতে পারবে। এছাড়া যে দেশে যে পণ্য নিষিদ্ধ, সে দেশের ভেতর দিয়ে সেসব পণ্য বহন করা যাবে না।
তিন বছর পর পর এ চুক্তি নবায়ন হবে। তবে কোনো দেশ চাইলে ছয় মাসের নোটিস দিয়ে চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে পাররে। এছাড়া ভবিষ্যতে সার্কের অন্যান্য দেশ চাইলে এ চুক্তিতে যুক্ত হতে পারবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যাবে।
চুক্তির আওতায় মালদ্বীপ বা শ্রীলংকায় পণ্য রফতানি-আমদানিতে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের বিধানও রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে নির্ধারিত চার্জ পরিশোধসাপেক্ষে বন্দরে পণ্য খালাস বা লোডের অনুমতি দেয়া হবে। নিয়মিত যাত্রী ও অনিয়মিত যাত্রীদের জন্য পৃথক ছাড়পত্র অনুমোদন করবে সদস্য দেশগুলো। এজন্য চুক্তির সঙ্গে ফর্মের ছকও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, এক দেশের গাড়ি আরেক দেশে চলাচলে কারিগরি বিষয়গুলো চুক্তির আওতায় নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে গাড়ির ধরন, সর্বোচ্চ ওজন ও এক্সেল লোড, নির্গত গ্যাসে বায়ুদূষণের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় থাকবে। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য দুই দরজাবিশিষ্ট মোটরযান, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফাস্ট এইড বক্স ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। আরেক দেশে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয় নিশ্চিত ও তা যাচাই করতে হবে।
সদস্য দেশগুলো অতিক্রমের ক্ষেত্রে প্রতিটি পণ্যবাহী গাড়িকে ট্রানজিট কনসাইনমেন্টের জন্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ছাড়পত্র নিতে হবে। এছাড়া অন্য দেশে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে রিলিজ অর্ডার ইস্যু করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি দেশের জন্য প্রযোজ্য অন্য কোনো কাগজপত্রও প্রয়োজন অনুযায়ী সংগ্রহ করতে হবে। কাস্টমস ও অন্যান্য নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিধানও পালন করতে হবে।
পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে পথিমধ্যে মালপত্র চুরি বা নষ্ট হওয়ার নিরাপত্তা দেবে সংশ্লিষ্ট দেশ। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে আর্থিক গ্যারান্টি দিতে হবে। চুক্তির আওতায় প্রতিটি বিষয় দেখাশোনা ও যাচাই-বাছাইয়ে প্রতিটি দেশ জাতীয় স্থল পরিবহন সহায়তা কমিটি গঠন করবে।
চুক্তির আওতায় মোটরযানকে প্রতিটি দেশে চলাচল ও অবস্থানের ক্ষেত্রে ওই দেশের পরিবহন আইন মানতে হবে। দেশগুলোয় গাড়ি চালানোর জন্য চালকের বিশেষ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে, যা সমন্বয় কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করবে। এছাড়া দুর্ঘটনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গাড়ির আঞ্চলিক বীমার বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে।
দেশ ত্যাগের আগে এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, বিবিআইএন এমভিএ এরই মধ্যে প্রতিটি দেশের মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। তবে কিছু বিষয় পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন প্রয়োজন। এজন্য ১৪ জুন সচিব পর্যায়ে বৈঠকে চুক্তির বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হবে। আর ১৫ জুন চার দেশের পরিবহনমন্ত্রী চুক্তিটি সই করবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply