বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সুন্দরবন ভ্রমণের নিয়ম-কানুন কঠোর হচ্ছে

Sundarban-বিশ্ব ঐতিহ্য, বাঘের আবাসভূমি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা বিবেচনায় ভ্রমণের সুযোগ সীমিত করে ‘সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা’ অনুমোদন করছে বাংলাদেশ সরকার। এই নীতিমালায় পর্যটকের সংখ্যা, জলযান চলাচল, রাত্রী যাপন ও বেশি সময় অবস্থানের ওপর আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। নীতিমালায় বন বিভাগ, ট্যুর অপারেটর ও পর্যটকদের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, দিনের বেলায় কোনো একটি জলযানে সর্বোচ্চ ১৫০ জন পর্যটক বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবেন। রাতের বেলায় সুন্দরবনের সীমানার মধ্যে কোনো জলযান অবস্থান করতে চাইলে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যটক থাকতে পারবেন। এক্ষেত্রে বন বিভাগের পূর্বানুমতি নিতে হবে। বনের অভ্যন্তরে পর্যটকবাহী জলযান সর্বোচ্চ চার রাত পাঁচদিন অবস্থান করতে পারবে। গবেষণার জন্য হলে অনুমতি নিয়ে সময় বাড়ানো যাবে। ভ্রমণের তিনদিন আগেই আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে বন বিভাগ।

নীতিমালা অনুযায়ী, এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগর কর্মকর্তারা। উপপ্রধান বন সংরক্ষক (পরিকল্পনা) ও পরিচালক (জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকো ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প) মো. শামসুল আলম বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে কীভাবে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটানো যায়, সেদিকটি বিবেচনায় রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে নীতিমালা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে।

বন সংরক্ষক (খুলনা সার্কেল) ড. সুনীল কুমার কুণ্ডু জানান, নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি পর্যটক প্রবেশ করলে তা বনের জন্য ক্ষতিকর। সুন্দরবনে পর্যটকের ধারণক্ষমতা বিষয়ে একটি গবেষণা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই পর্যটকের পাশাপাশি কতটি জলযান সুন্দরবনে প্রবেশ করবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হবে।

তবে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, এটি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন ট্যুর অপারেটররা। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে একই জলযানে নীতিমালা অমান্য করে বেশি সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করছেন। নীতিমালায় উল্লিখিত সংখ্যার বেশি পর্যটককে যাতে ভ্রমণের অনুমতি না দেয়া হয়, সে বিষয়ে বন বিভাগকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সিলভার ওয়েভ ট্যুরস লিমিটেডের পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে যেতে হয়; তাই নীতিমালায় উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি পর্যটক যাতে না পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন শিল্পকে ধরে রাখতে হলে নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

নীতিমালায় নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের ফিটনেস সার্টিফিকেট ও বিআইডব্লিউটিএ থেকে চলাচলের অনুমতি ব্যতীত কোনো জলযানে পর্যটক বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদেশী পর্যটকদের জন্য জেলা প্রশাসক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার বিষয়টিও রাখা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেটসহ জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ট্যুর অপারেটরদের। যেকোনো ধরনের বিপদ মোকাবেলায় প্রতিটি জলযানে ছোট নৌকা, স্পিডবোট ও মূল জলযান থেকে ছোট নৌকা ও স্পিড বোটে ওঠানামার সহজ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শব্দদূষণ, নির্ধারিত রুটের বাইরে জলযান চালনা, যত্রযত্র নোঙর করার ওপরও রয়েছে বিধিনিষেধ।

তবে সুন্দরবনে ইকো ট্যুরিজমের বিকাশে প্রশিক্ষিত গাইড অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি জলযানে একজন প্রশিক্ষিত গাইড ও ৪০ জনের বেশি পর্যটক হলে দুজন গাইড রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুল হক বুলু বলেন, দেশে প্রশিক্ষিত গাইডের অভাব রয়েছে। আবার সারা বছর গাইডদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মতো অবস্থাও নেই। প্রতি ১৫ জনে একজন গাইড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটন বিকাশে প্রশিক্ষিত গাইড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা জানেন কীভাবে কম শব্দ করে বনে ভ্রমণ করতে হবে, কোথায় যাওয়া যাবে, কী করলে বনের ক্ষতি হবে না।

গত বছর জুলাইয়ে খসড়া চূড়ান্ত করার পর সম্প্রতি সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা অনুমোদন করে সরকার। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশে নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা অনুমোদনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নীতিমালায় ভ্রমণে দোতলার বেশি উচ্চতার জলযানের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে ধারালো হাতিয়ার, আগ্নেয়াস্ত্র, ফাঁদ, বিষ, বন্যপ্রাণী শিকার ও ধরার জন্য সরঞ্জাম বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বন বিভাগের কোনো ক্ষতি হলে সেজন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ট্যুর অপারেটরদের। শর্ত ভঙ্গ হলে জলযানের নিবন্ধন বাতিল ও জরিমানা আদায় করবে বন বিভাগ।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *